নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে কচুরিপানা, ময়লা ও আবর্জনায় বেহাল রাজধানীর ধানমন্ডি লেক। সরকারের পটপরিবর্তনের পর থেকেই অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে এই লেক। দায়িত্বশীলদের গাফিলতিতে চুরি হচ্ছে লেকের রেলিং ও গ্রিল। লেকের বিভিন্ন স্পটে অবলীলায় চলছে মাদক সেবন।
সরেজমিন দেখা যায়, লেকজুড়ে যত্রতত্র পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। লেকের পানিতে ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, বস্তাসহ বিভিন্ন আবর্জনা। যতদূর চোখ যায়—লেকে ভেসে বেড়াচ্ছে শুধু কচুরিপানা। এসব কারণে আশপাশের এলাকায় বেড়েছে মশার উপদ্রব।
কলাবাগানের বাসিন্দা আয়েশা সিদ্দিকা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একটা সময় ধানমন্ডি লেক দিনে দুই তিনবারও পরিষ্কার করা হতো। এখন তার ছিটেফোঁটাও দেখছি না। মাসেও একবার পরিষ্কার করা হয় না। কর্তৃপক্ষের অযত্ন-অবহেলায় ময়লা ও আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে এই লেক।
ধানমন্ডির ১৫ নম্বরের বাসিন্দা মো. শাওন বলেন, লেকের কাছে ধূমপান নিষিদ্ধ। তারপরও অবলীলায় ধূমপানসহ গাঁজা বিক্রি ও সেবন চলছে সেখানে। স্থানীয় কমিশনার আগে সব কিছু দেখভাল করতেন। এখন দায়িত্বশীল কেউ না থাকায় যার যা ইচ্ছা তা-ই করছে। পরিবার নিয়ে যারা ঘুরতে আসেন, তারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন।
ধানমন্ডির বাসিন্দা সৈয়দ একরামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ধানমন্ডি লেকের ওপর একটু বিশেষ নজর রাখা হতো। ৫ আগস্টের পর লেকের অবস্থা বেহাল।
তবে এসব কিছুর মধ্যে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, এখানকার পরিবেশ আগের চেয়ে নিরাপদ। আবদুর রউফ কলেজের একদল শিক্ষার্থী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। তবে লেকের ভেতরে দোকান বেড়েছে। ফুটপাতের মতো এখানে অসংখ্য দোকান গড়ে উঠেছে।
ধানমন্ডি লেক ঘিরেই গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি সংগঠন। তার মধ্যে মৎস্য শিকার অন্যতম। এই সংগঠনের একজন ফাহমিদুল ইসলাম। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, লেকে এখন মাছ ধরতে গেলে পলিথিন উঠে আসে। সিটি করপোরেশনের কাউকে বললে যে বিষয়টির সমাধান হবে, সেরকম কেউ নেই। শুনেছি ডিসেম্বরে নতুন ইজারা হবে। তারপর লেক পরিষ্কারের কাজে হাত দেওয়া হবে। এর আগে পর্যন্ত এরকম থাকবে।
ফাহমিদুল আরও বলেন, লেকের বেহাল অবস্থার মধ্যেও সুন্দর দৃশ্য হলো বিভিন্ন জায়গায় গাছে গাছে ঝুলে থাকা ছোট ছোট বইয়ের বাক্স। বিষয়টি ব্যতিক্রম এবং বেশ চমৎকার। লেক ঘুরে এমন ৮-১০টি বাক্স পাওয়া গেছে। মানুষ সেখানে বই পড়ছেন।
লেকের পাড়ে জগিং করতে আসা চাকরিজীবী কবির হোসেন বলেন, এখানে কলাবাগানের পাশজুড়ে কচুরিপানায় ভরে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপও জমেছে। দায়িত্বশীলরা এখন আর আগের মতো ঝাড়ু দেন না।
ধানমন্ডি সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবী নাফিস আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই লেক রাজধানীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান। প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থী আসেন। আশপাশে আমরা যারা থাকি প্রতিদিন যাই। দায়িত্বশীলদের লেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
স্থানীয় আবদুল হক মৃধা বলেন, কচুরিপানার কারণে লেকজুড়ে প্রচুর মশা। সন্ধ্যা হলেই মশা বেড়ে যায়। মশার কারণে এক জায়গায় দুই মিনিট বসা যায় না। মশক নিধনে ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
আগে ধানমন্ডি লেক পরিষ্কার করার জন্য বুধবার বন্ধ থাকতো। সরকার পরিবর্তনের পর এই নিয়ম ভেঙে পড়েছে। আগে এখানে ভিক্ষুক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। টং দোকান এত বেশি ছিল না। এখন ভিক্ষুক ও টং দোকান বেড়েছে- বলেন আবদুল হক।
ধানমন্ডি লেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে থাকা এক কর্মী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই লেকটি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ ইজারাদার করতো। সরকার পরিবর্তনের পর ইজারাদার পালিয়েছে। এখন নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ইজারাদার চলে যাওয়ায় লেকের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় ব্যাঘাত ঘটেছে। চলতি মাসেই আবার ইজারাদার নিয়োগ দেওয়া হবে। জানুয়ারিতে লেক পরিষ্কার করা হবে।
লেকের এই দশার কারণ জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাছিম আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার ফোন-কল ও এসএমএস দিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।








