জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বাংলা একাডেমিতেও এসেছে পরিবর্তন। এবারের বইমেলাতেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। শুরুতে বইমেলার স্টল ও প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হলেও দ্রুতই সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছায় সব পক্ষ। তবে শেষ পর্যন্ত এবারের বইমেলায় বেশ কয়েকটি প্রকাশনী স্টল বরাদ্দ পায়নি। এরমধ্যে কয়েকজন আবার স্টল বা প্যাভিলিয়নের জন্য আবেদনই করেননি।
কী কারণে স্টল বরাদ্দ পাননি এবং আবেদন করেননি; এনিয়ে প্রকাশনীগুলোর ভেতর নানা ধরনের গুঞ্জন রয়েছে। কেউ বলছেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে এবারের বইমেলায় স্টলের জন্য আবেদন করেননি আবার কেউবা শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আবেদন করেননি। এছাড়াও রাজনৈতিক পরিচয় স্টল বরাদ্দ না পাওয়ার মুখ্য একটা কারণ হিসেবেও বিবেচনা করছেন অনেকে।
নিরাপত্তা বিবেচনায় এবারের বইমেলায় স্টলের জন্য আবেদন না করার মধ্যে অন্যতম শ্রাবণ প্রকাশনীর মালিক রবিন আহসান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশব্যাপী একটা মব হয়েছে। আমাদের নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের বই ছাপিয়েছি, বঙ্গবন্ধুর বই ছাপাই— এজন্য আমাদের বিভিন্ন ধরণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। সেই চিন্তা থেকেই আমরা বইমেলায় যাইনি।
বাংলা একাডেমি কিন্তু আমাদের আগেও দুইবার নিষিদ্ধ করেছে। আওয়ামী লীগের আমলেও আমরা দুইবার বইমেলায় যাইনি। সত্যি বলতে বইমেলায় যদি যাওয়ার পরিবেশ না থাকে অথবা আশেপাশের পরিবেশ ভালো না হয় তাহলে তো যাওয়ার দরকার নাই। বইমেলায় তো আমরা শুধু বই বিক্রি করতে যাই না, আমরা শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে শ্রাবণের জানালা বানাই। সেখানে লেখক-পাঠক বন্ধু-বান্ধব সবাই মিলে আড্ডা দেই।
নিরাপত্তার প্রশ্নে শ্রাবণ প্রকাশনীর মালিক বলেন, আমরা শতভাগ নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। চারদিকে যেভাবে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে, মানুষ খুন হচ্ছে, মারামারি হচ্ছে এজন্য আমরা স্টলের জন্য আবেদন করিনি। আমাদের কিন্তু প্রচুর বই বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। এছাড়াও প্রগতিশীল মানুষের, সমাজতন্ত্রের, নানান মতের নানান রকমের বই আছে। এগুলো বিক্রি করতে পারবো কিনা সেটাও একটা চিন্তা ছিল। আমাদের একটা বই গাড়ি ছিল, সেই গাড়িটাও ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। মূলত একধরনের আতঙ্কের কারণেই এবারের বইমেলায় আর যাওয়া হয়নি।
রবিন আহসান আরও বলেন, যদিও এবারের বইমেলায় আমাদের কোনও স্টল থাকবে না, তবে অনলাইনে আমাদের বই পাওয়া যাবে। ১ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টায় অনলাইনে ফেব্রুয়ারিবিডি.কম ঠিকানায় আমাদের সকল বই পাওয়া যাবে। এই অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার দৈনিক ‘খবরের কাগজ’ এবং ইভেন্ট পার্টনার হিসেবে থাকবে ‘মিরা’।
অন্যদিকে অসুস্থতার কারণে এবারের বইমেলায় স্টলের জন্য আবেদন করেনি বলে জানিয়েছেন জার্নিম্যান বুকস প্রকাশনীর পরিচালক কবি তারিক সুজাত। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখলাম আমাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাজনীতির কারণে আমাদের স্টল দেওয়া হয়নি। বিষয়টি একেবারেই মিথ্যা। আসল ঘটনা হচ্ছে এবার আমরা স্টলের জন্য আবেদনই করিনি। আমরা যদি স্টলের জন্য আবেদন করতাম তখন আমাদের স্টল দেওয়া না দেওয়ার বিষয় থাকতো। আমি ও আমার স্ত্রী দুইজনেই লেখক। আগে স্টলসহ মেলার সবকিছু দেখভাল করতাম। এবার তো অসুস্থতার কারণে মেলায় যেতে পারছি না।
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তারিক সুজাত বলেন, অনেকে বলছে আমি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, আমার প্রকাশনী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠান। এখন আওয়ামী লীগ করে এমন অনেক মানুষই তো আছে, যারা বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি চালায়, গার্মেন্টস চালায় তাই বলে তো এসব আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠান না। আমি তো ১৯৯০ সালে ডাকসুতে ইলেকশন করেছি এরশাদবিরোধী আন্দোলন করেছি। সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলাম। এখন একাডেমির কেউ যদি বলে তাহলে তারা যেনো জেনেশুনে বলে— এটা তাদের কাছে আমার প্রত্যাশা।
নতুন বই সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের যে প্রকাশনী সেটা কিন্তু শুধু মেলাকে কেন্দ্র করে বই বের করে না। সবসময় বই বের করে। বইমেলায় এবার আমাদের স্টল না থাকলেও "আমার পৃথিবী" নামে আমার একটি কবিতার বই বের হবে মেলার মাঝামাঝি সময়ে। এটার কাজ প্রায় তিন বছর ধরে করছি।
নিরাপত্তার শঙ্কা নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন লেখক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার সময় টিএসসির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে। এরপর অভিজিতের প্রকাশকদের ওপর হামলা ও জাগৃতির প্রকাশক ফয়সল আরেফীন দীপনকে হত্যা করা হয়। যেহেতু সরকারের পরিবর্তন হয়েছে তাই এনিয়ে কিছুটা শঙ্কা থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই মেলায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা উচিত।
বইমেলার নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে বাংলা ট্রিবিউনকে জানানো হয়, এবারের বইমেলায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মেলা প্রাঙ্গণে র্যাব-পুলিশ-ডিবির সমন্বয়ে এবার শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও মাঠে থাকবে আনসার, ভিডিপি, ফায়ার সার্ভিস ও সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা। বইমেলা প্রাঙ্গণের ভেতরে ও আশপাশের এলাকায় দুই শতাধিক ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো হবে। এগুলো মনিটর করার জন্য থাকবে কন্ট্রোল রুম। থাকবে অতিরিক্ত লাইটিং। প্রয়োজনে যে কোনও সড়কে যান চলাচল সীমিত কিংবা নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে ডিএমপি।
এদিকে, বিভিন্ন প্রকাশনীকে বইমেলায় স্টল না দেওয়ার কারণে স্টলে কাজ করা কর্মীদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্টলে কাজ করা একটি প্রকাশনীর কর্মী হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বইমেলায় স্টল দিলে বেচাকেনা ভালো হয় আমাদেরও বাড়তি আয় হয়। এবার সেই সুযোগ হারালাম। তাছাড়া গতবার যে ৮-১০ জন শিক্ষার্থী স্টলে কাজ করতো এবার তারা কাজ করার সুযোগ পায়নি।
রাজনৈতিক কারণে কাউকে বইমেলায় স্টল দেওয়া হয়নি এমন তথ্য ভুল বরং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন একটি নামকরা প্রকাশনীর পরিচালক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, প্রকাশনীর ক্ষেত্রে আসলে রাজনৈতিক বিবেচনা করলে ভুল হবে। অনেকে মনে করছে আওয়ামী লীগ করা কেউ এবার স্টল বা প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ পায়নি। এমন বেশ কয়েকজন আছে যারা আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা তারাও মেলায় স্টল পেয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার যদি প্রকাশনা খাতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে তাহলে কিন্তু বইমেলা সুন্দর হবে না, ওই প্রকাশনা ব্যবসা হুমকির মুখে পড়বে।








