বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় বিচারিক আদালতের বিচারে নানান অসঙ্গতি উঠে এসেছে মর্মে পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করেছেন হাইকোর্ট।
সোমবার (১৪ জুলাই) বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চের স্বাক্ষরের পর ৫২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, বিচারিক আদালতে দুই মাস চার দিনে ৪২ সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া এবং সাক্ষী শেষে আট দিনের মধ্যে রায় দেওয়ার এমন দ্রুতগতি ও সমাপ্তি ব্যাপকভাবে বিশ্বাস তৈরি করে যে, বিচার নিরপেক্ষভাবে হয়নি।
গত ২৮ মে এই রায় দিয়েছিলেন বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায়ে ডা. জুবাইদা রহমানকে তিন বছরের দণ্ড থেকে খালাস দিয়েছিলেন আদালত। আর এই রায়ের সুবিধা পেয়ে তারেক রহমান দুই ধারায় মোট ৯ বছর সাজা থেকে খালাস পেয়েছেন।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, নথি থেকে জানা যায় যে, ৪২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য দুই মাস চার দিনের মধ্যে রেকর্ড করা হয়েছিল এবং সাক্ষ্য নেওয়ার ৮ দিন পরে অবিলম্বে রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। এত দ্রুতগতিতে বিচারের অগ্রগতি ও সমাপ্তি ব্যাপক বিশ্বাস তৈরি করে যে এটি নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি।
দুদক আইনে ২৬ (১) ধারা অনুসারে নোটিশ দেওয়ার বিধান সম্পর্কে হাইকোর্ট বলেন, নোটিশ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। যেহেতু কোনও নোটিশ দেওয়া হয়নি তাই তাকে (জুবাইদা রহমানকে) দোষী সাব্যস্তকরণ এবং সাজা আইন অনুসারে টেকে না এবং এটা বাতিলযোগ্য।
এছাড়া আপিলকারীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল তা অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ছিল। ফৌজদারি কার্যবিধির ২২১ ধারার বিধানগুলো পালন করা হয়নি। অতএব, এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ও সাজা বহাল রাখা যায় না।
রায়ে তারেক রহমান নিয়ে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশর উচ্চ আদালতের নজির অনুসারে যেহেতু মামলায় নানান অসঙ্গতি রয়েছে সেহেতু পুরো রায়টি বাতিলযোগ্য। তাই এক্ষেত্রে তারেক রহমানও খালাসের সুবিধা পেয়েছেন।
আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আসিফ হাসান। আপিলের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, এস এম শাহজাহান, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও রুহুল কুদ্দুস কাজল, আইনজীবী কায়সার কামাল ও জাকির হোসেন ভূঁইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল করিম।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আমাদের দেওয়া যুক্তি আইনগতভাবে যে সঠিক ছিল সেটা হাইকোর্ট বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রমাণিত হলো। আমরা বলেছি, তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছিল। জাস্টিস হারিড জাস্টিস বারিড। দ্রুত শুধু সাক্ষী নেওয়াই শেষ নয়, এখানে মোমবাতি জ্বালিয়েও সাজা দেওয়ার জন্য দ্রুত বিচার কাজ চালিয়েছিল বিচারিক আদালত।
সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান, জুবাইদা রহমান ও তার মা সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর বিরুদ্ধে রাজধানীর কাফরুল থানায় মামলা করে দুদক।
এ মামলার বিচার শেষে ২০২৩ সালের ২ আগস্ট জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় তারেক রহমানকে দুটি অভিযোগে ৯ বছর ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক মো. আছাদুজ্জামান। রায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন ২০০৪- এর ২৬(২) ধারায় তারেক রহমানকে তিন বছর ও ২৭(১) ধারায় ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাকে তিন কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আর জোবাইদা রহমানকে ২৭(১) ধারায় তিন বছর কারাদণ্ড দেন। তাকেও জরিমানা করা হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা।
এদিকে ২০২৪ সালের শেষের দিকে এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জোবাইদা রহমানের সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করে সরকার। সেই গেজেটে বলা বলা হয়, ডা. জোবাইদা রহমানের সাজা স্থগিতের বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদন এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইন ও বিচার বিভাগের মতামতের আলোকে ২২ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন (১০ অক্টোবর, ২০২৪ ইং তারিখের বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত) সংশোধনপূর্বক আইনের ক্ষমতাবলে মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত, ঢাকা এর মেট্রো বিশেষ মামলা নং-৩৪১/২০২২ [কাফরুল থানার মামলা নং-৫২, তারিখ-২৬-০৯-২০০৭] -এ তার বিরুদ্ধে প্রদত্ত দণ্ডাদেশ আদালতে আপিল দায়েরের নিমিত্ত বিনাশর্তে এক বছরের জন্য স্থগিত করা হলো।
এরপর চলতি বছরের ৬ মে দেশে ফেরেন জোবাইদা রহমান।









