বাংলাদেশে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় তিন জন (২৮ দশমিক ৯ শতাংশ) বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে, যা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি (২১ দশমিক ৪৪ শতাংশ)। এর ফলে শিশুরা দারিদ্র্যের বহুবিধ চ্যালেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (এমপিআই)’ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ইউনিসেফ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহযোগিতায় এই সূচক তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মানসহ শিশুদের বহুবিধ বঞ্চনার বিষয়গুলো তুলে ধরে এগুলো দ্রুত মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (এমপিআই) একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে দারিদ্র্য পরিমাপ করে, যেখানে শুধু আয় নয়, বরং পুষ্টিহীনতা, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া, নিরাপদ বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক সেবার অভাব—এই উপাদানগুলোর ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। অন্তত দুটি সূচকে পিছিয়ে থাকলেই কাউকে ‘বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। যদিও অর্থনৈতিক দারিদ্র্য ও খর্বকায় শিশুর হার কমেছে, তবে শিশুদের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য এখনও একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ। কারণ, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের এই দারিদ্র্যে পড়ার সম্ভাবনা প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি।
গ্রামীণ এলাকার শিশুরা শহরের তুলনায় বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছে আরও বেশি হারে। এমপিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের দারিদ্র্যের প্রধান চালক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে শিক্ষা-সংক্রান্ত বঞ্চনা। বিশেষ করে, স্কুলে অনুপস্থিতি বা শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে বড় প্রভাবক।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘যখন দারিদ্র্যের একাধিক মাত্রাকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়, তখন শিশুদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি শুরু হয় শিশুদের বঞ্চনার প্রতিটি ক্ষেত্র সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের মধ্য দিয়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমপিআই আমাদের একটি কার্যকর টুল দিয়েছে, যা ব্যবহার করে আমরা বুঝতে পারি শিশুদারিদ্র্য কোথায়, কীভাবে ও কেন ঘটছে। এর ভিত্তিতে আমরা ভবিষ্যতে অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে পারবো।’
রানা ফ্লাওয়ার্স আরও বলেন, ‘যখন প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে তিনজনই দারিদ্র্যের শিকার, তখন মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের মাধ্যমে জিইডি গৃহীত এই উদ্যোগ নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরবে। যা তাদের নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সামাজিক খাতে আরও সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর বিনিয়োগ এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে। এ বছর আবারও মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে পরিচালিত হবে।’
প্রতিবেদনে অঞ্চলভিত্তিক দারিদ্র্য বৈষম্যের চিত্রও উঠে এসেছে। দেশের পাঁচটি জেলায়—বান্দরবান, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ, রাঙামাটি ও ভোলা—৪০ শতাংশের বেশি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ হার বান্দরবানে (৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ)।
এছাড়া দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সিলেট বিভাগে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি—৩৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ, রাঙামাটি ও ভোলায় বিদ্যমান দারিদ্র্য পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলে একটি দারিদ্র্য-ক্লাস্টারের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। শিশুদারিদ্র্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বেশি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক দারিদ্র্য বেশি উত্তরাঞ্চলে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের এমপিআই বোঝা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর অন্তর্নিহিত কারণ উদঘাটন করাও জরুরি। আমাদের প্রতিটি সূচকের গভীরে গিয়ে বুঝতে হবে—কীভাবে এবং কেন তা সামগ্রিক দারিদ্র্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।’
তিনি আরও বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিভিন্ন খাতে সমন্বয়ের অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা—এসব কারণে বহুমাত্রিক শিশুদারিদ্র্য মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে বাধা তৈরি হচ্ছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফার্স্ট কাউন্সেলর ও অ্যাক্টিং হেড অব ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এডউইন কুককুক বলেন, ‘বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য যে দেশের সব নাগরিক—বিশেষ করে যারা এখনও দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে আছেন—সমান সুযোগ ও মর্যাদা লাভ করুন। এর জন্য একদিকে আমাদের অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, অন্যদিকে নিজেদের উদ্ভাবনী কর্মসূচি, যেমন গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামের মতো উদ্যোগগুলোর মূল্যায়ন ও সম্প্রসারণ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এই প্রতিবেদন আমাদের হাতে একটি তথ্যভিত্তিক শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। এখন সময় এসেছে সরকার, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী ও জনগণের সমন্বয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করার, যেন বাংলাদেশ হয়ে ওঠে আরও সমতাভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি রাষ্ট্র—যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না।’









