রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসায় ১১ বছরের শিশু মারিয়াকে দেওয়া হয়েছিল গৃহকর্মী হিসেবে। বিনিময়ে তার পিতা মাসুদ ইসলাম নিয়েছিলেন অটোরিকশা কেনার টাকা। মাত্র চার মাসের মাথায় লাশ হতে হয়েছে শিশুটিকে। শনিবার (৩০ আগস্ট) বিকাল ৩টার দিকে পশ্চিম ধানমন্ডির ৯/এ রোডের ৬০ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলার বাসায় সবার অগোচরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মেয়েটি ‘আত্মহত্যা’ করেছে বলে দাবি করেন গৃহকর্ত্রী নাসরীন সুলতানা। তবে এত কম বয়সী একটা শিশু কী কারণে ‘আত্মহত্যা’ করলো, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। থানা ও পারিবারিক সূত্র জানায়, শিশুটির পরিবারের সঙ্গে চার লাখ টাকার বিনিময়ে গৃহকর্ত্রীর সমঝোতা হয়েছে।
শিশুটির গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার ইছাপশর গ্রামে।
শনিবার বিকালে শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ধানমন্ডির ওই বাসার সামনে শতাধিক মানুষ জড়ো হন। বিকাল থেকে রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত শিশুটিকে ‘হত্যা’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। অবশ্য এলাকাবাসী জড়ো হওয়ার আগেই শিশুটিকে প্রথমে ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পরে শিশুটির লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যালের কলেজ মর্গে রাখা হয়। সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) ময়নাতদন্ত শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।
মারিয়ার নানি বকুলি বেগম শনিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ধানমন্ডির ওই বাড়ির পঞ্চম তলায় থাকেন নাসরীন সুলতানা। তিনি নিজেও ওই বাড়ির পাশের ফ্ল্যাটে ১০ বছর ধরে কাজ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। চার মাস আগে তার নাতনী মারিয়া খাতুনকে নাসরীন সুলতানার বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজে দেওয়া হয়। বিকালের দিকে তাদের জানানো হয়, মারিয়া ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস নিয়েছে। পরে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে প্রথমে ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মারিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।
মারিয়ার নানি বকুলি বেগমের ছেলে শাহ আলমের বউ রিমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তার ধারণা শিশুটিকে সকালেই ‘হত্যা’ করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পরে দুপুর ১২টার দিকে নাসরীন সুলতানা বাসার বাইরে যান। পরে এসে মারিয়া তার অনুপস্থিতিতে ‘আত্মহত্যা’ করেছে বলে তাদের খবর দেওয়া হয়। তিনি নিজেও ওই বাড়ির অন্য ফ্ল্যাটে গৃহকর্মীর কাজ করেন।
রবিবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে শিশুটির পিতা মাসুদ ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মারধর করার কারণে তার শিশুকন্যা আত্মহত্যা করে থাকতে পারে। পরে বিকালে তিনি আর কোনও বক্তব্য দিতে রাজি হননি। থানা ও পারিবারিক সূত্র জানায়, শিশুটির পরিবারের সঙ্গে চার লাখ টাকার বিনিময়ে নাসরীন সুলতানার সমঝোতা হয়েছে। এরপরই বিকালে শিশুটির পিতা মাসুদ ইসলাম বাদী হয়ে রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন।
শিশুটির ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকা ধানমন্ডি থানার এসআই জান্নাতুল ফেরদৌসী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিশুটির পিতা বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শিশুটি গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তবে মৃত্যুর আর কোনও কারণ আছে কিনা, সেটা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বলা যাবে।
ধানমন্ডির বাসার মালিক নাসরিন সুলতানার ভাই সাংবাদিক হামিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তার বোন ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন না। তিনিও একা থাকতেন। তার সন্তান থাকেন দেশের বাইরে। সাধারণ একটা ঘটনায় বাসার সামনে মব তৈরি করা হয়েছিল। পরে খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। পুলিশ ও তার স্বজনরা সিসিটিভি ফুটেজে দেখেছেন—শিশুটি নিজেই আত্মহত্যা করেছে। সব কিছু দেখে এখন শিশুটির স্বজনরা সমঝোতায় আসার কথা বলছে। তিনি বলেন, মানবিক দিক থেকেই দেখা যায় যে ওনার বাসায় যেহেতু কাজ করতো, সেজন্য সেই পরিবারটাকে সহায়তা করার জন্যেও তো কিছু করা লাগে।









