গণমাধ্যমে এ কোন ঐক্য, কেন ভাবতে হচ্ছে

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩:৫৯আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৪

বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে যখন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে— তাদের আদর্শ ও সাংবাদিকতার জন্য, যখন একের পর এক গণমাধ্যমে ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও হুমকির ঘটনা ঘটে চলেছে— সেই সময়ে দেশের বড় দুই গণমাধ্যম সংগঠনের পক্ষ থেকে বড় পরিসরে ঐক্যের ডাক এসেছে। সম্পাদক পরিষদ এবং নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বের হওয়া পত্রিকার সম্পাদক ও প্রেসক্লাবের নেতাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল সেখানে। তেমনই ছিলেন দেশের টেলিভিশন ও অনলাইনের সম্পাদক ও গণমাধ্যমকর্মীরা। লক্ষ্য— গণমাধ্যমের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্বাধীনতা রক্ষা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখা।

দেশে সম্পাদক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সংগঠনের সংখ্যা কম না। সম্পাদক পরিষদ, অনলাইন এডিটর্স অ্যালায়েন্স, বিভিন্ন সাংবাদিক ইউনিয়ন, রিপোর্টার্স ইউনিটি, মালিকদের সংগঠন নোয়াব সবই সক্রিয়। এই সংগঠনগুলোকে যার যার মতো কাজ করলেও, এই যে ঐক্য, সেটার রূপরেখা কী হবে— তা স্পষ্ট হয়নি। এ ধরনের ঐক্যের ডাকে ঐক্য হয় কিনা, সে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। মেইনস্ট্রিম অনলাইন, টিভি রেডিওকে সম্পাদক পরিষদের বাইরে রেখে আসলে কমিউনিটির বড় অংশকে— এই ঐক্যের বাইরেই রাখতে হবে বলেও শঙ্কা অনেকের।

কেন ভাবতে হচ্ছে

সম্মিলনের শুরুতে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নুরুল কবির বলেন, ‘‘একটা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাওয়ার যে উৎক্রমণকাল, যে ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন মিডিয়ারও গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য, রাজনীতির গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য, রাষ্ট্রের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য লড়াই হচ্ছে— তখন এই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রান্ত হচ্ছে। এই আক্রমণে জুলাই যুদ্ধের নাম নিয়ে জুলাই যুদ্ধের স্পিরিটকে তারা অপমানিত করছে, তার সব প্রমাণ আমাদের হাতে কাছে। আমরা পরিষ্কারভাবে জানি যে, এই ঘটনার মধ্যে যারা ছিলেন তারা জুলাইয়ের যে মৌলিক চেতনা, জুলাইয়ের যে গণতান্ত্রিক চেতনা, আর সেই জুলাইকে ব্যবহার করে— সেই চেতনাকে ধ্বংস করবার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। ফলে এরকম একটা সময়ের মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের সঙ্ঘবদ্ধতা দরকার। প্রত্যেকের সচেতন সংগ্রামের মধ্যে শামিল হওয়া দরকার।’’

আজকের আয়োজন থেকে প্রাপ্তি কী?

মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা সংঘটিত হচ্ছে এবং এসব ঘটনার প্রতিবাদ এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের জানান দিতে যে আয়োজন, সে আয়োজন থেকে প্রাপ্তি কী? সম্পাদক ও সাংবাদিকদের এত বিশাল মিলনমেলার পরের উদ্যোগ কী হবে, যা থেকে জানা যাবে, ঐক্য কাজ করছে— এমন প্রশ্নের জবাবে ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আজকের ঐক্যের ডাকটা আসলে আমরা আছি এবং সরকারের কাছে একটা বার্তা দেওয়া। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান যখন কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে ইতাবাচক কিছু দেখতে পাচ্ছেন না, তখনতো বোঝা যায়, পরিস্থিতি কী। ফলে এক হতে পারার দরকার আছে। আমরা সবাই বিপদের মধ্যে আছি। ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের কথায় হতাশা ছিল। সবগুলো বিষয়ে কাজ করার দরকার আছে। তবে ঐক্যের বিষয়ে সেখানে উপস্থিত সম্পাদকদের কেউ কেউ হতাশা ব্যক্ত করেন। তারা মনে করেন, এভাবে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয় না। এ ধরনের অনুষ্ঠানে তাড়াহুড়ো করলে সেটার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ জাগে।’’

তবে এই অনুষ্ঠানের শুরুতে সঞ্চালক ও সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, আগামী মে মাসে ‘মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে’ তারা এই আলোচনা থেকে একটা প্রকাশনা বের করবেন। সম্পাদকদের কথার মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্টতই ছিল, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী এই আয়োজনে আমন্ত্রিত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ঐক‍্যের ডাক ও এই আয়োজন প্রশ্নে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এ বিষয়ে আমি খুব একটা উৎসাহ বোধ করি না। করার কোনও কারণ নেই। তার মানে এই নয় যে, এ ধরনের কাজগুলো আমি বা আমরা সমর্থন করি।’’

“একসময় গভীর অন‍্যায়ের শিকার আমরাও হয়েছি। কিন্তু এরা তখন কেউ কোনও কথা বলেননি,” বলেন তিনি।

দর্শক গ্যালারিতে সম্পাদক ও সাংবাদিকরা শঙ্কার দোলাচলে তবু ঐক্য চায়

ঐক্যের কথা বলেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারা যাবে কিনা— শঙ্কা জানিয়ে লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আ হ ম মোশতাকুর রহমান তার বক্তব্যে সভাস্থলেই বলেন, ‘‘উপস্থিত বিজ্ঞ সাংবাদিক, বিজ্ঞ নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আমাদের ঐক্য প্রয়োজন। আমাদের মব ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে আমাদের যে উপলব্ধি হয়েছে, আমি মনে করি দরকার ঐক্য। কিন্তু ঐক্যের কথা বলেও আসলে কি আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারবো? আমরা যদি অন্তরকে পরিষ্কার না করি, আমরা যদি দলীয় সংকীর্ণতা থেকে দূরে সরে আসতে না পারি— তাহলে কোনোভাবেই আমাদের ঐক্য সফলতার মুখ দেখবে না।’’ যদিও দৈনিক প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘‘এই যে ঐক্য থাকা, ঐক্যবদ্ধ থাকা, একত্রিত হওয়া, একে অপরের পাশে থাকা, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের প্রতি সম্মতি-সহানুভূতি জানানো— এটা খুবই খুবই জরুরি।’’ তবু কেন ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে শঙ্কার কথা বলা হচ্ছে প্রশ্নে উপস্থিত একজন গণমাধ্যমকর্মী বলেন, ‘‘যেহেতু আলোচনায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের আগুন ও হামলার ঘটনার কথা বারবার উঠে এসেছে, যেহেতু আয়োজনের দায়িত্বের বড় জায়গায় এই দুই প্রতিষ্ঠানকে দেখা গেছে, ফলে অনেকের মনে হয়েছে— এখানেও এক ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠের ব্যাপার আছে। তবে ঐক্য কার সঙ্গে কার, কে কে ঐক্যের অংশ— এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’’

দৈনিক যায় যায় দিন সম্পাদক শফিক রেহমান আরেকটু স্পষ্ট করে তার আলোচনায় বলেন, ‘‘আজকে দেখুন, মতিউর রহমান এবং মাহফুজ আনাম, নিশ্চয়ই তারা এই সম্মিলনের পেছনে বড় অবদান রাখছেন। কেন? তারা দেখেছেন— তাদের অফিস পুড়ে গেছে। পুড়ে গেছে হাদীর মৃত্যুর ২০ মিনিটের মধ্যে। মানে তারা আগেই টার্গেট ছিলেন। যেকোনও মূল্যে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে ধ্বংস করতে হবে। এক্ষেত্রে বিদেশের পডকাস্ট বক্তা খারাপ ভূমিকা রেখেছেন, এটা অন্যায়। কিন্তু মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনামকে বুঝতে হবে— যখন নয়া দিগন্ত ও সংগ্রাম আক্রান্ত হয়েছিল, তখন তারা কোনও কথা বলেননি, আমি দেখিনি। আমার কাগজ যখন বন্ধ হয়ে গেল, আমিও তাদের পাশে পাইনি। আজকে তারা চাচ্ছেন, আপনারা সবাই চাচ্ছেন, সব সাংবাদিক যেন ঐক্যবদ্ধ হয়। আমিও সেটাই চাই। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ হতে হলে আপনার বিকল্প গুণ থাকতে হবে। যাতে সাংবাদিকতা বাদ দিয়ে অন্যকিছু করতে পারেন। মাসের শেষে টাকাটাই প্রধান কথা। এই টাকা যেন নিশ্চিত হতে পারেন, সেটা দয়া করে চিন্তা করুন।’’

ঐক্যে কোথায় অনলাইন মিডিয়া ও ডিজিটাল মাধ্যম

বর্তমান সময়ে অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যম বড় একটি অংশ দখল করে রেখেছে। কিন্তু সম্মিলনে তাদের কণ্ঠ শোনা যায়নি। কেবল সম্মিলন না, অনেক আগে থেকে সম্পাদক পরিষদ কেন কেবল প্রিন্ট মিডিয়া নিয়ে হবে, কেন ডিজিটাল যুক্ত হবে না, সে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশে মূলধারার অনলাইনগুলোকে প্রতিনিয়ত নানাবিধ চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে টিকে থাকতে হলেও এই ঐক্যে কেবল পত্রিকার সম্পাদকদেরই কথা শোনা হয়েছে। যদিও বেশকিছু অনলাইনের সম্পাদক তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন।

/ইউআই/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
মন্ত্রণালয় থেকে ফোনের পর সেই এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন
দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করায় সাংবাদিকের বাড়িতে এসিল্যান্ডের ‘মাদক উদ্ধারের’ অভিযান
চিকিৎসাধীন মায়ের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি পেলেন সাংবাদিক ফারজানা রুপার সন্তানরা
সর্বশেষ খবর
বাফুফেকে কোনও মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলে পক্ষ নেবো: ডুলি
বাফুফেকে কোনও মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলে পক্ষ নেবো: ডুলি
প্রবাসীদের নিরাপত্তায় বিমানবন্দর সড়কে বসছে শতাধিক সিসি ক্যামেরা
প্রবাসীদের নিরাপত্তায় বিমানবন্দর সড়কে বসছে শতাধিক সিসি ক্যামেরা
 শিল্পীদের জ্ঞান সীমিত, রাজনৈতিক প্রশ্ন করবেন না: শ্বেতা
 শিল্পীদের জ্ঞান সীমিত, রাজনৈতিক প্রশ্ন করবেন না: শ্বেতা
সক্রিয় মৌসুমি বায়ু: সারাদেশে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস
সক্রিয় মৌসুমি বায়ু: সারাদেশে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস
সর্বাধিক পঠিত
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
জন্মদিনে সাবিনা ইয়াসমীন: জীবনের বিশেষ কোনও সংজ্ঞা নেই
জন্মদিনে সাবিনা ইয়াসমীন: জীবনের বিশেষ কোনও সংজ্ঞা নেই