বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারে নারীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরেই প্রশংসিত হলেও সংখ্যাগত উপস্থিতি বাস্তব ক্ষমতায় রূপ নেয়নি। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত হলেও কার্যকর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তারা এখনও পিছিয়ে আছেন।
১৯৯৭ সালে ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত আসন চালু হওয়ার পর নারী প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরে পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনেও একই ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা ২৫–৩০ শতাংশে পৌঁছেছে—জাতীয় সংসদের নারীর অংশগ্রহণের চেয়ে অনেক বেশি।
তবে বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জ বেশি। ইউনিয়ন ও সিটি পর্যায়ে নারীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সীমিত ক্ষমতার মধ্যে রয়েছেন। একজন নারী সদস্য তিনটি ওয়ার্ড দেখভাল করেন, কিন্তু পুরুষ সদস্যের মতো অতিরিক্ত সম্পদ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা পান না। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব সীমিত থাকে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখন ২৫–৩০ শতাংশ। যা জাতীয় সংসদে নারীর অংশগ্রহণের চেয়ে অনেক বেশি। সংসদের ৩৫০টি আসনের মধ্যে নারীর অংশ ১৪–১৫ শতাংশ মাত্র।
তবে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট বলছে, “দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এটি নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সবচেয়ে বিস্তৃত ব্যবস্থা। কিন্তু এই ব্যবস্থার নকশাই নারীর ক্ষমতা সীমিত করে।”
সীমিত ক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ
নারী সদস্যরা সামাজিক নিরাপত্তা, মাতৃস্বাস্থ্য এবং শিক্ষার বিষয়গুলোতে সক্রিয় হলেও উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট নির্ধারণে তাদের ভূমিকা সীমিত।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান ড. মুনিরুজ্জামান বলেন,“একজন নারী সদস্য তিনটি ওয়ার্ড দেখাশোনা করেন, কিন্তু পুরুষ সদস্যের মতো অতিরিক্ত ক্ষমতা বা সম্পদ পান না। এই কাঠামোগত বৈষম্য কার্যকর প্রতিনিধিত্বকে কঠিন করে তোলে।”
খুলনা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মাজেদা খাতুন বলেন,“অনেক সময় সভা শুরু হওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। আমরা উপস্থিত থাকি, কিন্তু সবসময় আমাদের কথা শোনা হয় না।”
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সালাহউদ্দিন আমিনুজ্জামান বলেন,“পুরুষদের মধ্যে এখনও একটি ধারণা আছে যে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে সক্ষম নয়। নারীদের ক্ষমতা ও স্থান নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক মনোভাব পরিবর্তন জরুরি।”
সংরক্ষিত আসন ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নারীদের সংখ্যা খুবই কম।
জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ আসনকে এখনও পুরুষের এলাকা হিসেবে দেখে। নারীরা প্রধানত সংরক্ষিত আসনে সীমিত থাকলে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা দুর্বল থাকে।”
তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মধ্যে ৭ শতাংশের কম নারী এবং বড় শহরের মেয়র পদে নারীরা দুষ্প্রাপ্য।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা
নারী নেতারা প্রায়ই নির্বাচনের সময় মৌখিক হয়রানি, চরিত্রহানি এবং আর্থিক অসুবিধার মুখোমুখি হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ড. ফেরদৌস জাহান বলেন,“অনেক নারী উপযুক্ত সুরক্ষা ছাড়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এতে যোগ্য নারীরা সংরক্ষিত আসনের বাইরে নির্বাচনে সাহস পান না।”
তবুও ধীরে ধীরে জনমত পরিবর্তিত হচ্ছে, কমিউনিটি নারী নেতৃত্বের সঙ্গে অভ্যস্ত হচ্ছে।
নারীর অবদান এবং সম্ভাবনা
গবেষণায় দেখা গেছে, নারী সদস্যরা স্থানীয় উন্নয়ন, স্বচ্ছতা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সীমিত জায়গাতেও নারী নেতারা স্থানীয় অগ্রাধিকার পরিবর্তন করেছেন। চ্যালেঞ্জ হল সেই জায়গাগুলো প্রসারিত করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেনন, কেবল কোটা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও প্রয়োজন। সুপারিশ হিসেবে তারা বলছেন- ওয়ার্ড কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে সমান দায়িত্ব নিশ্চিত করা; কাউন্সিলরদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি; পরিকল্পনা ও টেন্ডার কমিটিতে বাধ্যতামূলক নারী অন্তর্ভুক্তি; রাজনৈতিক দলের সাধারণ আসনে নারীর মনোনয়ন বৃদ্ধি।
ড. সালাহউদ্দিন আমিনুজ্জামান বলেন,“বাংলাদেশ প্রথম বাধা অতিক্রম করেছে—অ্যাকসেস নিশ্চিত হয়েছে। এখন প্রয়োজন ক্ষমতা, জবাবদিহিতা এবং নেতৃত্ব নিশ্চিত করা।”
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এখন আলোচনা কেন্দ্রবিন্দু—কতজন নারী নির্বাচিত হচ্ছেন তা নয়, বরং তারা কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,“কোটা দরজা খুলে দিয়েছে। পুরোপুরি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সাহস প্রয়োজন।”









