ঈদ এলেই গণপরিবহন থেকে শুরু করে সব ধরনের যানবাহনে ভাড়া বেড়ে যাওয়া যেন একটি রীতি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দূরাপাল্লার বাসগুলোতে এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এবারের ঈদেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে পরিবহন কেন্দ্রীক সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতি গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় দাবি করেছে, এবারে গণপরিবহনের ভাড়ায় ২০ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির এমন মন্তব্য দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। খোদ সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রি হাবিবুর রশিদ এই দাবিকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রশ্ন উঠেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতির এই দাবির পেছনে তাদের কোনও গবেষণা আছে, নাকি মনগড়া কথা বলেছে?
সংগঠনটির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কোনও গবেষণা থেকে ওই তথ্য পাননি। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই দাবি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নিজেদের কর্মীদের নেওয়া তথ্য এবং যাত্রীদের সরাসরি অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, অনেক যাত্রী তাদের কাছে সরাসরি অভিযোগ দিয়েছেন ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে। এগুলো নিয়ে তাদের কাছে মনে হয়েছে এবারের ভাড়া ২০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
বুধবার (১৮ মার্চ) দেশের গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, এবারের ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য গত ২০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করতে চলেছে।
ঈদযাত্রায় ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি পর্যবেক্ষণের এক সংক্ষিপ্ত সমীক্ষা তুলে ধরে গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বার্তায় বলা হয়, সরকারি ঘোষণা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির বাস-মিনিবাসে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। বুধবার থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীর সিটিবাসেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। নৌপথের বেশির ভাগ রুটে এমন নৈরাজ্যের চিত্র দেখা গেলেও সরকার বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে মালিকদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবারের ঈদে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে প্রায় ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীর সিটি সার্ভিসের বাসে আরও প্রায় ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াত হতে পারে বলে সংগঠনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। গত ১৪ মার্চ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের যাতায়াত, ঈদের অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা, সরকারের নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট সামগ্রিক কার্যক্রম, পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের গৃহীত ঈদযাত্রা সংশ্লিষ্ট নানান কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
এবারের ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চালাচ্ছে অভিযোগ করে বার্তায় বলা হয়, ঢাকা থেকে পাবনা নিয়মিত ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার বাস ভাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা, ঢাকা থেকে নাটোর নিয়মিত ৫৫০ থেকে ৫৮০ টাকার বাস ভাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা, ঢাকা থেকে রংপুর নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ১ হাজার ৫০০ টাকা, ঢাকা থেকে নোয়াখালীর নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, ঢাকা থেকে লক্ষ্মীপুরের নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ৭০০ টাকা, ঢাকা থেকে রামগঞ্জ নিয়মিত ৩৫০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ লোকাল বাসে ২৫০ টাকার ভাড়া ৬০০ টাকা, ঢাকা থেকে খুলনা নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুর নিয়মিত ৪০০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, চট্টগ্রাম থেকে ভোলা নিয়মিত ৪৫০ টাকার বাস ভাড়া ৯০০ টাকা, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ট্রাক-পিকআপে জনপ্রতি ৫০০ টাকা ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। এছাড়াও ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ভাড়ার এই হার প্রতিদিন বাড়ছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির এই পর্যবেক্ষণ গণমাধ্যমে প্রকাশের পরপরই নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেককে বলতে শোনা গেছে, যাত্রী কল্যাণ সমিতি তাদের মনগড়া তথ্য দিয়েছে। এই দাবির পেছনে তাদের কোনও গবেষণা বা মাঠ পর্যয়ে যাছাই করা হয়নি।
এই অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, ঈদ যাত্রায় যাত্রীদের কাছ থেকে দুই-তিনগুন বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন সঠিক নয়। এখন পর্যন্ত কোনও যাত্রী ভাড়া নিয়ে অভিযোগ করেনি বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকালে রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শনের সময় তিনি এসব কথা বলেন।









