দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে আজ শনিবার (২১ মার্চ)। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করছে মানুষ। তবে ব্যতিক্রম পুলিশ সদস্যরা। তারা রাজপথে দায়িত্ব পালন করেই ঈদ উদযাপন করছেন। ঈদকেন্দ্রিক ঢাকার মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিনরাত কাজ করছেন তারা। তাদের দায়িত্বের কাছেই যেন হার মানে ঈদের খুশি।
এবারের ঈদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে গিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ পুলিশ সদস্য ছুটি পাননি। তাদের ঈদ কাটছে স্বজনহীন কর্মব্যস্ততায়। পুলিশ সদস্যদের জন্য সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গা হলো পরিবার থেকে দূরে থাকা। অনেকেই বছরের পর বছর ঈদ করেন থানায়, ব্যারাকে কিংবা রাস্তায় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। আর ভিডিও কলে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলেই কাটে ঈদের আনন্দ।
শনিবার জাতীয় ঈদগাহ, বায়তুল মোকাররম মসজিদসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিভিন্ন সড়কে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে পুলিশ সদস্যদের।
রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় সকালে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় এক পুলিশ সদস্যকে। তিনি জানান, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে ছুটি পাননি। তবে দায়িত্ব পালনের মধ্যেই তিনি আনন্দ খুঁজে পান। শান্তিনগর চৌরাস্তায় দেখা যায় পরিমল নামে এক পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে। তবে তিনি কথা বলতে চাননি।
পুলিশ সদস্যরা বলছেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল দায়িত্ব। সেবামূলক এই পেশায় যুক্ত থাকায় ঈদের ছুটি না পেলেও তাদের মধ্যে কোনও আক্ষেপ নেই।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সামিউল ইসলাম জানান, ২০১৯ সালে পুলিশে যোগ দেওয়ার পর থেকে বহু ঈদেই তিনি ছুটি পাননি। গত তিন বছর ধরে কোনও ঈদেই ছুটি মেলেনি। তবুও তিনি এটিকে দায়িত্বের অংশ হিসেবেই দেখেন।
পল্লবী থানার এসআই সাচ্চু বিশ্বাসও এবার ঈদে ছুটি পাননি। ফলে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামে যাওয়া হয়নি তার। তিনি বলেন, মানুষ যাতে নিরাপদে ঈদ উদযাপন করতে পারে, সেটিই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, এবার ঈদে ছুটিতে রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকার ৫০টি থানার আওতায় বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এছাড়া র্যাব, ডিবি, সিটিটিসি, এপিবিএন, আনসারসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সক্রিয় রয়েছে।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা বলেন, ঈদের দিন সকালে ডিউটি দিয়েই আমাদের দিন শুরু হয়। যে যেখানে দায়িত্বে থাকে, সেখানেই সুযোগ বুঝে ঈদের জামাতে অংশ নেয়, নামাজ শেষে আবার দায়িত্বে ফিরে যায়।
তিনি আরও বলেন, দেশের বাস্তবতায় পুলিশের ওপর যে চাপ রয়েছে, তা অনেক সময় পুরোপুরি উপলব্ধি করা হয় না। সীমিত জনবল নিয়েও তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
ডিএমপির মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩৪ হাজার। এর মধ্যে অধিকাংশ সদস্যই ঈদে ছুটি পাননি।
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মাঠে রয়েছেন। মোট সদস্যের প্রায় ২০ শতাংশ ছুটি পেয়েছেন, বাকি ৮০ শতাংশ দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, প্রতি উৎসবেই মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামনে থেকে কাজ করেন পুলিশ সদস্যরা। সড়ক, মহাসড়ক, রেল ও নৌপথসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তারা বিরামহীন দায়িত্ব পালন করেন। রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, শপিংমল, বাসাবাড়ি ও অলিগলিতে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত ঈদ বা সরকারি ছুটিতে চোর-ডাকাত, ছিনতাইকারী ও অন্যান্য অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে নেওয়া হয়েছে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা। বাড়ানো হয়েছে টহল, চেকপোস্ট, সিসিটিভি মনিটরিং ও গোয়েন্দা নজরদারি।
পুলিশের ঈদ মানে নিজের আনন্দ ত্যাগ করে অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যখন সবাই পরিবার নিয়ে ব্যস্ত, তখন রাস্তায়, চেকপোস্টে, থানায় দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোর কারণেই নিরাপদ থাকে ঈদের উৎসব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন বলেই আমরা নির্বিঘ্নে উৎসব উদযাপন করতে পারি। তবে তাদেরও যেন পর্যায়ক্রমে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের সুযোগ থাকে, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অন্যদের নিরাপদ ঈদ নিশ্চিত করতেই নিজেদের ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। তাদের এই ত্যাগের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দায়িত্ববোধ ও পেশাগত অঙ্গীকারের এক অনন্য উদাহরণ।









