ঈদ মানেই ঘরমুখো মানুষের ঢল। কিন্তু অনিয়ম আর অবহেলায় আনন্দের এই যাত্রা প্রতি বছরই পরিণত হচ্ছে ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার করুণ বাস্তবতায়। সড়ক, রেল ও নৌপথ— সবখানেই বাড়ছে ঝুঁকি, বাড়ছে প্রাণহানি। এবছর যেন এই দুর্ভোগ রূপ নিয়েছে মহামারীতে।
শনিবার (২১ মার্চ) বিকাল থেকে রবিবার (২২ মার্চ) বিকাল পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৬ জন, আহত হয়েছেন শতাধিক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১৩ মার্চ থেকেই মূলত ঈদযাত্রা শুরু হয়। ১৫ মার্চ থেকে সরকারিভাবে ঈদের ছুটি শুরু হয়ে ২৩ মার্চ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত অতিরিক্ত ছুটি থাকায় অনেকেই মাঝের দিনগুলো ছুটি নিয়েছেন। ফলে প্রায় ১৫ দিনের দীর্ঘ ছুটিতে রাজধানীসহ দেশের সড়ক-মহাসড়ক অনেকটাই ফাঁকা হয়ে পড়েছে।
এই ফাঁকা সড়কেই বেপরোয়া গতিতে চলছে যানবাহন, যা দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ক্লান্ত ও অনভিজ্ঞ চালক, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং নৌপথে নিরাপত্তা ঘাটতি।
ঈদকে সামনে রেখে রাজধানী ও বড় শহরগুলো ছাড়তে গিয়ে যাত্রীরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে অতিরিক্ত ভিড়, টিকিট সংকট, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং দীর্ঘ যানজট যাত্রাকে করে তুলছে দুর্বিষহ।
বাসে গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন, ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ, লঞ্চে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপ। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে উঠছে বিপজ্জনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনিয়ন্ত্রিত চাপই দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। পাশাপাশি ফাঁকা রাস্তায় অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং উল্টো পথে চলাচলও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধূরীর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ২১ মার্চ (ঈদের দিন) পর্যন্ত ১১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২৫ জন, আহত হয়েছেন ২৬২ জন। একই সময়ে রেলপথে ৭টি দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত ও ৩৪ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ৬টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৮ জন, আহত হয়েছেন ৮৮ জন।
সংগঠনটির তথ্য বলছে, গত চার বছরে আটটি ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ৬৭ জন, আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৯৯৬ জন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলগেটে। শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে একটি যাত্রীবাহী বাস রেললাইন পার হতে গিয়ে অচল হয়ে পড়ে। এ সময় ট্রেনের ধাক্কায় বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে নারী-শিশুসহ ১২ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
এর আগে, ১৯ মার্চ বগুড়ার আদমদিঘীতে ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে প্রায় ২২ ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে, যা রেল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তগত দুর্বলতার দিকটি সামনে আনে।
ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার কারণ প্রসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (প্রশাসন) ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “সড়কের প্রকৌশলগত দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। দেশের সব সড়ক একই মানের নয়, কোথাও কোথাও বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের অসহিষ্ণুতা ও আগে যাওয়ার প্রবণতা।”
তিনি বলেন, “শর্টকাটে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা এবং উল্টো পথে চলাচল দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে। পুরো সড়কে পুলিশ মোতায়েন করা সম্ভব নয়। তাই সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে বড় উপায়। রাস্তায় পুলিশ স্ট্রাটেজিক পয়েন্টগুলোতে থাকে। সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আইন মেনে চলার প্রবণতা বৃদ্ধি পেলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।”
এদিকে রবিবার বিকাল পর্যন্ত জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, কুমিল্লার পদুয়ারবাজার, নড়াইল, হবিগঞ্জ, ফেনীর রামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ঈদের দিন নড়াইল সদরে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক যুবক নিহত হয়েছেন। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে মাইক্রোবাসের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে এক শিশু। ফেনীর রামপুরে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন।
মাধবপুরে বাস-পিকআপ সংঘর্ষে চারজন, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে পিকআপচাপায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত হয়েছেন। নাটোরে বিয়ের আগের দিন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এক প্রকৌশলী। ফরিদপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে এক শিক্ষার্থীর। এছাড়া নড়াইল, ঝিনাইদহ ও নাটোরে পৃথক দুর্ঘটনায় আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
ঈদের আগের রাত থেকে রবিবার বিকাল পর্যন্ত রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) জরুরি বিভাগে প্রায় ৪০০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
অপরদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মো. ফারুক জানান, প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্নভাবে প্রচুর আহত মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। শুধুমাত্র ঈদের দিন ঢামেকের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫১ জন। যাদের বেশিরভাগই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন।









