ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে, জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি কর্তৃক অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশ থেকে জাতীয় সংসদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নজিরবিহীন এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। যদিও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দ্রুততম সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে আইন, সমাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা, সমালোচনা, পর্যালোচনা ও উদ্বেগ রয়েছে তবে জরুরি সংস্কার ও প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে এবং ক্ষেত্র বিশেষে তথাকথিত ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’ রক্ষার জন্য অধ্যাদেশগুলো ‘জনগুরুত্বপূর্ণ’ ছিল, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর কিছু কাঠামোগত ও সাংবিধানিক সমস্যা চিহ্নিত করা যায়। যার মধ্যে অংশীজনদের মতামতের ঘাটতি, আইনসভার তদারকির অভাব, আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সুরক্ষার নীতিসমূহ এবং সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নসমূহ অন্যতম।
অপরদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দ্রুততম অধ্যাদেশ প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি বলিষ্ঠ প্রচেষ্টা হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে বলিষ্ঠ প্রচেষ্টা কতখানি গণতান্ত্রিক, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আইনের শাসন রক্ষায় কাজে লাগবে তা নাগরিকদের এখনই বলা মুশকিল। ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্য থেকে আইনে রূপান্তরিত আইনসমূহের সম্পূর্ণ কার্যকরণের মূল্যায়নের জন্যও আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে অপেক্ষা না করেই বলা যায়, তথ্য, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং টেলিযোগাযোগ খাতে অন্তর্বর্তী সরকারে আমলে আমূল পরিবর্তন আনতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন ও অধ্যাদেশ জারি করেছে। উল্লেখযোগ্য আইনসমূহের মধ্যে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃপরিচালন অধ্যাদেশ অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ অন্যতম। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানবাধিকার এবং আইনের শাসন সুরক্ষায় নিয়োজিত সংগঠনসমূহ, মানবাধিকার কর্মীবৃন্দ এবং সচেতন নাগরিকদের নানান গ্রহণযোগ্য, প্রয়োজনীয় এবং কার্যকর পর্যালোচনা ও সমালোচনা থাকবার পরেও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫; অধ্যাদেশ দুটি জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি সংসদে হুবহু বা পূর্ণাঙ্গভাবে বিল আকারে তোলা জন্য সুপারিশ করেছে, অন্যদিকে, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃপরিচালন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল তোলার সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। এখন, মানবাধিকার সংগঠনসমূহ এবং নাগরিকদের নিকট সরকারের মন্ত্রণালয় এবং বিশেষ কমিটির কাছে দুটি প্রশ্ন।
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কিংবা জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি কর্তৃক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে মন্ত্রণালয়গুলো কি নাগরিকদের অধ্যাদেশগুলো সম্পর্কে মতামত সংগ্রহ করেছে, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখছেন?
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০০৫ সম্পর্কে নাগরিকদের নানান গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকর পর্যালোচনা ও সমালোচনাসমূহ জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির সদস্যবৃন্দ ওয়াকিবহাল কিংবা ওয়াকিবহাল থাকবার চেষ্টা করেছেন?
আপাতত নাগরিকদের দৃষ্টিতে, দুটি প্রশ্নের উত্তর হলোঃ না, এবং একইসাথে আমরা দেখতে পেলাম, জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি কর্তৃক প্রণীত ৪৯ পৃষ্ঠার একটি দলিল, যা ভোটাভুটি বা বিল পাসের আগে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। যেহেতু, জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি এবং বিশেষ করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যবৃন্দ ভোটাভুটি বা বিল পাসের আগে যথেষ্ট সচেতন নয় এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণে এবং মতামত সংগ্রহ করার প্রয়োজন মনে করেন নাই, সেই প্রেক্ষাপটে জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃপরিচালন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬, অধ্যাদেশ দুটি নিয়ে নাগরিকদের পক্ষ থেকে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।
জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃপরিচালন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং এর পরিপূরক, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ নিয়ে নাগরিক সমাজ, এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃপরিচালন অধ্যাদেশটি প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় সব অংশীজন বা স্টেকহোল্ডারদের (যেমন: প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ,সাধারণ জনগণ) সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনার অভাব ছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। এছাড়া, উপাত্ত ব্যবস্থাপনায় কোনো ভুল বা আইনি লঙ্ঘন হলে প্রতিকারের ব্যবস্থাগুলো সাধারণ নাগরিকদের জন্য যথেষ্ট সহজবোধ্য নয়। এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে বড়ো সমালোচনা হলো এর সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে। এখানে একই কর্তৃপক্ষকে দুটি পরস্পরবিরোধী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে : নিয়ন্ত্রণ : উপাত্ত কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা তদারকি করা এবং পরিচালনা: নিজেরাই উপাত্ত ব্যবস্থাপনার সিস্টেম চালানো। সমালোচকদের মতে, যখন একই প্রতিষ্ঠান রেগুলেটর এবং অপারেটর হিসেবে কাজ করে, তখন নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বড়ো ধরনের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার অভাব আরেকটি চিন্তার বিষয়, এই কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি মূলত নির্বাহী বিভাগের (সরকার) নিয়ন্ত্রণে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানটি একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে কাজ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা না থাকলে উপাত্তের অপব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মানবাধিকার সংগঠন, কর্মী এবং নাগরিকদের দিক থেকে অধ্যাদেশটিতে কিছু অস্পষ্ট শব্দ বা সংজ্ঞা (যেমন : 'রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা' বা 'জনস্বার্থ') ব্যবহার করা হয়েছে। নির্বিচার প্রবেশাধিকার ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা বা অপরাধ দমনের অজুহাতে কোনো সুনির্দিষ্ট বিচারবিভাগীয় পরোয়ানা ছাড়াই ব্যক্তিগত উপাত্তে সরকারের প্রবেশাধিকার পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং সমালোচকদের ভয়, এই আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের ওপর ব্যাপক আকারে নজরদারি চালানো সহজ হতে পারে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। বিশ্বব্যাপী উপাত্ত সুরক্ষার জন্য যে সব স্বীকৃত নীতি (স্বচ্ছতা, উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধতা বা পারপাস লিমিটেশন এবং জবাবদিহিতা) রয়েছে, এই অধ্যাদেশে সেগুলোর যথাযথ প্রতিফলন নেই। অধ্যাদেশে ব্যবহৃত কিছু আইনি সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত ও অস্পষ্ট। ফলে আইনি ব্যাখ্যা দেওয়ার সময় কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেদের সুবিধামতো এর অপব্যবহার করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, এই অধ্যাদেশকে শেখ হাসিনার "ডিজিটাল বাংলাদেশ" থেকে "স্মার্ট বাংলাদেশ" এর দিকে যাওয়ার একটি বড়ো ধাপ এবং উপাত্তের মালিকানা নাগরিকের হাতে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দাবি করছে, তবুও কাঠামোগত ত্রুটি দূর করা এবং নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য অধ্যাদেশটি পুনরায় সংশোধনের জোর দাবি জানিয়েছে নাগরিকবৃন্দ ও মানবাধিকার সংগঠনসমূহ, হ্যালো মন্ত্রণালয় আপনারা শুনতে পাচ্ছেন কি?
ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার আগমুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশের সংশোধন প্রস্তাব পাশ হয়েছে। এর মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ সেবার মান বৃদ্ধি, এর রেগুলেশন এবং রাষ্ট্রের সার্ভেইল্যান্স কাঠামোতে গঠনমূলক পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকারকে সুরক্ষা দিয়েছে, অপরদিকে নজরদারি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন তর্কের জন্ম দিয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংশোধনের মধ্যে প্রধান কিছু প্রস্তাব হচ্ছে - ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেৱা কখনোই বন্ধ করা যাবে না এরকম বিধান রাখা হয়েছে ধারা ৯৭ কিন্তু শুধু বন্ধ নিষিদ্ধ করলেই হবে না, গতি কমানোও অপরাধ ঘোষণা করতে হবে বলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মনে করতে পারেননি।
২০০৬ এবং ২০১০ সালের বিতর্কিত সংশোধনের কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে বিটিআরসির স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে দাবি করার হয়েছে, এবং মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির ক্ষমতা ও কার্যপরিধির মধ্যে ভারসাম্য আনা হয়েছে বলেও বলা হয়েছে। আগে সব লাইসেন্স ইস্যুর অনুমোদন মন্ত্রণালয় থেকে হলেও, এখন থেকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু লাইসেন্সে মন্ত্রণালয় ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টাডির ভিত্তিতে অনুমোদনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে ও অন্যান্য সব লাইসেন্স ইস্যু করার এক্তিয়ার বিটিআরসির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিটিআরসির স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, নতুন সংশোধনীতে বিটিআরসি-কে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একে অনেকেই "অতিরিক্ত ক্ষমতা" হিসেবে দেখছেন যা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। বিটিআরসি-কে 'বিচারক ও পুলিশ'—উভয় ভূমিকা পালন করতে দেওয়া বিপজ্জনক। অন্যদিকে, অধ্যাদেশটি অভূতপূর্ব উপায়ে লাইসেন্সিং এবং বাজারে প্রবেশের উপর কর্তৃত্বকে কেন্দ্রীভূত করে। ৩৩ এবং ৩৬ ধারার অধীনে, মন্ত্রী কমিটিগুলিকে "জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ" লাইসেন্স নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে,একটি বিভাগ যা অনির্ধারিত রয়ে গেছে, তবে, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং সাবমেরিন কেবল থেকে ডেটা সেন্টার, স্যাটেলাইট অপারেটর এবং বড়ো কন্টেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক পর্যন্ত সমস্ত প্রধান টেলিকম এবং ডিজিটাল অবকাঠামো অপারেটরদের অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিককালে, স্টারলিঙ্ককে দেওয়া ১০ বছরের লাইসেন্সের মতো প্রধান ডিজিটাল পরিকাঠামো সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলির উল্লেখযোগ্য জাতীয় প্রভাব রয়েছে; এই জাতীয় সিদ্ধান্তগুলি রাজনৈতিক বিবেচনার উপর ছেড়ে দেওয়া স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ন করে এবং দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দখলদারির দ্বার উন্মুক্ত করে। অধ্যাদেশ অনুসারে, ডিজিটাল পরিষেবা এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর সেন্সরশিপ সক্ষম করে, "জনকল্যাণ" বা "জাতীয় সুরক্ষা"-র মতো অস্পষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে এখন লাইসেন্সিং করে, সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এদিকে, পদ্ধতিগত সুরক্ষা, স্পষ্ট আপিল ব্যবস্থা বা প্রমাণের মান ছাড়াই ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং যথেষ্ট জরিমানা প্রান্ত গুরুতর শাস্তির পাশাপাশি লাইসেন্স ছাড়াই কাজ করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অধ্যাদেশের মধ্যে যা সমানভাবে উদ্বেগজনক তা হলো বিটিআরসির স্বাধীনতা দুর্বল হয়ে পড়েছে, কারণ স্বায়ত্তশাসিত নিয়ন্ত্রক হিসাবে এর নামমাত্র মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও, সরকারকে চেয়ারপার্সন, ভাইস চেয়ারপার্সন এবং কমিশনারদের নিয়োগ, তাদের পরিষেবার শর্ত নির্ধারণ, সরকারি কর্মকর্তাদের কমিশনের মধ্যে লাইনে স্থাপন এবং বিটিআরসি সচিব নিয়োগের একমাত্র কর্তৃত্ব দেওয়া হয়, যার ফলে এর কার্যকারিতার উপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয়। ধারা ৯-এর অধীনে, বিনা স্বাধীনতায় সরকার সরাসরি কমিশনারদের নিয়োগ করে। উপরন্তু, ধারা ১২ কার্যনির্বাহীকে তদন্ত মুলতুবি থাকা সত্ত্বেও নিজের ইচ্ছায় কমিশনারদের বরখাস্ত বা অপসারণের অনুমতি দেয়। এই ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে দুর্বল করে দেয়, যার ফলে কমিশনাররা সরকারি স্বার্থ বা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় যেমন: নজরদারি, বন্ধ, রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত সংস্থাগুলির বাজারে প্রবেশ বা রাষ্ট্র-অনুমোদিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে প্রয়োগকারী পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন বলে মনে হয় না।
এছাড়াও ডাক টেলিযোগাযোগ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির সভাপতিত্বে একটি 'জবাবদিহিতা কমিটি' গঠন করা হয়েছে। লাইসেন্সের আবেদন থেকে শুরু করে সিদ্ধান্ত পর্যন্ত সময় কমানো হয়েছে। ধারা ৩২ক-এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কমিটি সম্পূর্ণরূপে উচ্চ-স্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রভাবিত, যেখানে নাগরিক সমাজ, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ বা ভোক্তা অধিকারের সমর্থকদের জন্য কোনও স্থান নেই। কার্যনির্বাহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই সমান্তরাল তদারকি ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রক স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে আরও আপোশ করে এবং জনসাধারণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে।
(ধারা ৭১) "স্পিচ অফেন্স” সম্পর্কিত নিবর্তনমূলক ধারা পরিবর্তন করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর ধারাবাহিকতায় কেবল সহিংসতার আহ্বানকেই অপরাধের আওতাভুক্ত রাখা হয়েছে, কিন্তু অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কেবল সরাসরি সহিংসতায় উসকানি দিলে অপরাধ হবে। কিন্তু "উসকানি" শব্দটির কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন নেই। এটি ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে ব্যবহৃত হতে পারে বলে অভিযোগ আছে। (ধারা ৬৬ক)। টেলিযোগাযোগ সেবার ক্ষেত্রে আপিল এবং সালিশ বিষয়ক ধারা রাখা হয়েছে।
(ধারা ৮২খ) 'সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট প্রতিষ্ঠা;' (ধারা ৯৭ক) আইনানুগ ইন্টারসেপশনের সংজ্ঞা এবং পরিধি স্পষ্টভাবে এবং সুবিস্তারে আইনে নির্ধারিত করা হয়েছে। কেবল বিচারিক ও জরুরি আইনানুগ ইন্টারসেপশনের প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে 'সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট' প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যা বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশের মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, জরুরি প্রাণরক্ষার প্রয়োজনে, বিচারিক বা তদন্তের প্রয়োজন এবং আন্তঃসীমান্ত করসংক্রান্ত কাজে সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করে আইনানুগ ইন্টারসেপশন করতে পারবে। এই কাজ কেবল আইনে স্পষ্টভাবে বর্ণিত নির্দিষ্ট কিছু সংস্থা, সেটিও কেবল নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের মধ্যে করতে পারবে। 'সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট (সিআইএস) ।' এর মাধ্যমে রোল বেজড অ্যাক্সেস কন্ট্রোল ও আধা বিচারিক কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া ইন্টারসেপশন কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না, কিন্তু এইক্ষেত্রে আড়ি পাতার অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে সরাসরি আদালতের আদেশ থাকতে হবে। যদিও একটি কোয়া জি-জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু আড়ি পাতার ক্ষেত্রে আদালতের আগাম পরোয়ানা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ফলে নির্বাহী বিভাগ এখনো শক্তিশালী রয়ে গেছে। নতুন গঠিত সিআইএস নিজে কোনও ইন্টারসেপশন পরিচালনা করতে পারবে না, এটি কেবল কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। (ধারা ৯৭ক) (More on the implications of this clause, like stopping political surveillance and abuse of surveillance/blackmailing) 'সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট প্রতিষ্ঠা।'র জন্য বর্ণিত সংশোধনের মাধ্যমে এনটিএমসি (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেন্টার) বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে (ধারা ৯৭ক)। নাম পরিবর্তন হলেও সিআইএস মূলত আগের এনটিএমসি-এর মতোই নজরদারি চালাবে বলে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
মূলত, টেলিযোগাযোগ কাঠামোর নিয়ন্ত্রণের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত। ধারা ২ উপধারা ২ক-এর অধীনে, আইনটি প্রচলিত টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং পরিষেবাগুলির বাইরে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, মধ্যস্থতাকারী পরিষেবা, ওভার-দ্য-টপ (ওটিটি) পরিষেবা, অডিয়োভিজুয়াল এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, টেলিভিশন এবং সম্প্রচার সংস্থা, ই-বাণিজ্য এবং অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম, বিষয়বস্তু-ভিত্তি পরিষেবা, ক্লাউড সরবরাহকারী, ডেটা সেন্টার এবং এমনকি এআই পরিষেবাগুলিতে তার রেমিট প্রসারিত করেছে। এই পরিধি সম্প্রসারণ ঐতিহ্যগতভাবে স্বতন্ত্র এবং বিশেষায়িত নিয়ন্ত্রক ক্ষেত্রগুলিকে একটি একক, কেন্দ্রীভূত কাঠামোতে ভেঙে দেয়। ঐতিহাসিকভাবে, এটি নেটওয়ার্ক পরিকাঠামো, স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবার বিধানের সাথে সম্পর্কিত। এর বিপরীতে, অধ্যাদেশটি এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডেটা গভর্নেন্স, বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতা এবং এআই নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এর জন্য স্বচ্ছতা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং জবাবদিহিতা ব্যবস্থার ভিত্তিতে উপযুক্ত আইনি কাঠামো প্রয়োজন। এই পদ্ধতিতে এর পরিধি প্রসারিত করে, অধ্যাদেশটি মৌলিকভাবে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কার্যাবলিকে একত্রিত করে এবং আমাদের যোগাযোগ বাস্তুতন্ত্রের উপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে প্রসারিত করে। হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেনজারের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোকেও বিটিআরসি-এর কঠোর তদারকির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তা' বা 'তদন্তের প্রয়োজন'—এমন শব্দগুলো ব্যবহার করে বিশেষ ক্ষেত্রে এখনো যোগাযোগের ওপর নজরদারির সুযোগ রয়ে গেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
অধ্যাদেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশগুলির মধ্যে একটি হলো এর নজরদারি ক্ষমতা সম্প্রসারণ। আইনটি সমস্ত ইন্টারনেট ট্র্যাফিক তথ্য সংগ্রহ, নেটওয়ার্কে পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম স্থাপন এবং ভয়েস কল, বার্তা, মেটাডেটা এবং সোশ্যাল মিডিয়া রেকর্ড সহ যোগাযোগের বাধা দেওয়ার অনুমোদন দেয়। পাঠ্যের মধ্যে সংজ্ঞাগুলি বিস্তৃত, যার অর্থ প্রায় সমস্ত ধরনের ডিজিটাল যোগাযোগ রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে। যদিও ধারা ৯৭ক সীমিত সুরক্ষার প্রবর্তন করে, তবে বিচার বিভাগীয় অনুমোদন বা স্বাধীন তদারকি ছাড়াই "জাতীয় ঐক্য" বা "জননিরাপত্তা"-র মতো অস্পষ্ট ন্যায্যতার উপর ভিত্তি করে বাধা দেওয়ার অনুমতি দেয় এমন বিধানগুলি তাদের ছাড়িয়ে যায়।
উপরন্তু, আইনি প্রমাণ হিসাবে নজরদারির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা যথাযথ প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করে দেয় এবং সম্পূর্ণ নজরদারি অনুশীলনকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি নেয়। এই বিধানগুলি বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ১৭ অনুচ্ছেদের অধীনে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতার স্পষ্ট বিরোধিতা করে। ডিজিটাল যুগে গোপনীয়তার অধিকার সম্পর্কিত জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের রেজুলেশনে জোর দেওয়া হয়েছে যে 'রাষ্ট্রগুলিকে নিশ্চিত করতে হবে যে গোপনীয়তার অধিকারের সাথে যে কোনও হস্তক্ষেপ বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।'।
পরিশেষে, অধ্যাদেশটি ব্যবহারকারীদের জন্য কোনও অর্থপূর্ণ মানবাধিকার সুরক্ষা প্রদান করে না, গোপনীয়তা, ডেটা সুরক্ষা, যথাযথ প্রক্রিয়া, অ-বৈষম্য বা প্রতিকারের অ্যাক্সেসের সুস্পষ্ট অধিকারের অভাব রয়েছে, ডিজিটাল যুগে গোপনীয়তার অধিকার সম্পর্কিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবসমূহ এবং কমপিউটারাইজড ব্যক্তিগত ডেটা ফাইলগুলির জন্য নির্দেশিকাগুলিতে এবং ডিজিটাল যুগে গোপনীয়তার অধিকার সম্পর্কিত মানবাধিকার কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত এবং রেজ্যুলেশন এর বিপরীতে। রাষ্ট্র এবং অপারেটরদের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং প্ল্যাটফর্মের উপর ব্যাপক কর্তৃত্ব প্রদান করা সত্ত্বেও, অধ্যাদেশটি সংশ্লিষ্ট স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা তদারকির বাধ্যবাধকতা আরোপ করে না। মানবাধিকারের প্রভাব মূল্যায়ন, স্বাধীন তদারকি সংস্থা বা জনসাধারণের পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা ছাড়া, অধ্যাদেশটি মানবাধিকারের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয় এমন একটি প্রশাসনিক মডেলকে আবদ্ধ করার ঝুঁকি নেয়। স্পষ্ট মানবাধিকার সুরক্ষা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং শক্তিশালী তদারকি ছাড়া, অধ্যাদেশটি গোপনীয়তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার ব্যয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে সুসংহত করার ঝুঁকি নেয়। বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে অবশ্যই অধ্যাদেশের কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে, অর্থবহ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জনসাধারণের পরামর্শে জড়িত হতে হবে এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিকাঠামো যাতে জনস্বার্থে কাজ করে তা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী








