হালখাতা: পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে ঐতিহ্য রক্ষার দায়

সুহাইল আহমদ
১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:০২ আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:০২

বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘হালখাতা’। একসময় ঘটা করে এ উৎসব পালন করা হতো। বাংলা সনের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা উৎসবের মাধ্যমে লাল মলাটের নতুন খাতায় নতুন বছরের হিসাব শুরু করেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে অনেকটা বিবর্ণ হয়ে গেছে হালখাতা উৎসব। আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এ সময়ে শহর কিংবা গ্রাম-বাংলার জনজীবনেও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অ্যাপ ও অনলাইন শপিংয়ের কারণে চিরচেনা বাঙালির মিলনমেলার উৎসব হালখাতা উদযাপনের দৃশ্য এখন আর কার্যত দেখা যায় না। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার ফলে খাতার হিসেবের রেওয়াজে ভাটা পড়েছে। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে শতবর্ষী এ ‘হালখাতা উৎসব’। কমেছে উৎসবমুখরতা। গুটিকয়েক দোকানে এ বছর হালখাতা করলেও নেই আগের মতো পুরোনো জৌলুস।

সরেজমিনে পুরান ঢাকার বাংলাবাজার, শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে জুয়েলারি দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায়, সেসব দোকানে আগের মতো নেই হালখাতা উৎসবের আমেজ। তবে এখনও কিছু জায়গায় ব্যবসার হিসাবপত্র খাতাতেই হয়ে থাকে। তাতে হিসাব রাখতে ও বোঝাতে সুবিধা হয়।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন সবাই নগদ টাকায় কেনাকাটা করেন। বাকি বেচাকেনা, বন্ধক রাখা এসব গত কয়েক বছর ধরে বিলুপ্তপ্রায়। বকেয়া লেখার লাল কাপড়ের টালি খাতার ব্যবহার নেই বললেই চলে। হিসাব রাখা হয় কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের নোটপ্যাডে। তাই হালখাতার আয়োজন নেই।

পুরান ঢাকার বাংলাবাজার, শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে জুয়েলারি দোকানগুলোর একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হালখাতা হলো সৌজন্য প্রকাশের এক প্রাচীন ঐতিহ্য। দেনাদার ও পাওনাদারের মধ্যে বিশ্বাস, আস্থা ও গভীর সম্পর্কের প্রকাশ ঘটে এ উৎসবের মাধ্যমে। কিন্তু এখন আর সেই জৌলুস নেই। মুসলমান ব্যবসায়ীদের নিমন্ত্রণপত্রে মসজিদের মিনার, আর হিন্দু ব্যবসায়ীদের নিমন্ত্রণপত্রে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবিসংবলিত দাওয়াতপত্র এখন আর তেমন একটা চোখে পড়ে না। 

তারা আরও জানান, দিন দিন হালখাতার উৎসাহ-উদ্দীপনা অনেকটাই কমে গেছে। কারণ আগে ব্যবসায়ীরা মুখের কথায় বিশ্বাস করে লাখ লাখ টাকা বাকি দিতেন। তার বেশিরভাগই উসুল হতো হালখাতার দিনে। কিন্তু এখন লেনদেন হয় আধুনিক যুগের অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। ফলে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে সব লেনদেনের ধরন। তাই ধোপে টিকতে পারছে না সার্বজনীন উৎসব ‘হালখাতা’।

আবার ব্যবসায়ীদের অনেকেই বলছেন, এখন অনেকটা নিয়মরক্ষার জন্যই হালখাতার আয়োজন করা হচ্ছে। আগের মতো কেউ আর বাকি দেয় না। তাই হালখাতায় এসে বাকি টাকা ফেরত দেওয়ার প্রবণতায় ভাটার টান পড়েছে। আবার কম্পিউটারের মাধ্যমে হিসাব করার ফলে লাল কাপড়ে বাঁধাই করা হিসাব খাতার চলও কমে গেছে। এ ছাড়াও আয়োজন ও আপ্যায়নের ধরনও পাল্টেছে। 

হালখাতা উপলক্ষে ফুল দিয়ে সাজানো পুরান ঢাকার কিছু দোকান

একসময় ক্রেতার এলাকায় গিয়ে কার্ড দিয়ে দাওয়াত দেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও এখন ডাকযোগে কার্ড পাঠানো এবং সেটি করতে না পারলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফোনে কিংবা মোবাইল ফোন মেসেজে দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। হালখাতায় ক্রেতাদের গরম মিষ্টি, অন্যান্য উপায়ে খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করলেও এখন তা বদলেছে। বেশিরভাগ দোকানি হোটেল বুকিং করে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা রাখেন। বিভিন্ন ধরনের দামি ও আকর্ষণীয় উপহার রাখা হচ্ছে ক্রেতাদের জন্য।

জিৎ গোল্ড হাউসের কর্মচারী অনিক দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রাণের উৎসব হলো এই হালখাতা। আমরা ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের এ দিনটির জন্য অপেক্ষা করি। পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাব শুরুর দিন এটি আমাদের। হালখাতা মানে যে শুধু পুরোনো হিসাব চুকানো তা নয়, এটি আমাদের কাছে একটি উৎসব। তাই সাজিয়ে-গুছিয়ে দোকানের সরঞ্জাম রাখা হচ্ছে। আমাদের দূরের ক্রেতাদের আগেভাগে কার্ড বিতরণ করা শেষ হয়েছে। ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করা ও মগ উপহার দেওয়া হবে। আশা করছি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারব। কিন্তু এখন আর আগের মতো জমজমাট আয়োজন হয় না।’’

শাঁখারীবাজারের শ্যামা জুয়েলার্সের মালিক সজিব চৌধুরী বলেন, ‘‘হালখাতা উৎসবের ঐতিহ্য ছোট পরিসরে আয়োজনে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগের রীতি অনুসারে পহেলা বৈশাখের আগে বাকি টাকা পরিশোধ সেভাবে হয় না। এখন আর কেউ বাকিও নেয় না, পুরান ঢাকায় আগের মতো হয় না ধুমধাম করে হালখাতা। বৈশাখের দিন দোকানে গণেশ পূজাসহ নতুন খাতা খোলা হবে। এদিন ক্রেতা-বিক্রেতার পুরোনো সব পাওনা চুকিয়ে মিষ্টিমুখ করানো হবে। শুধুমাত্র ঐতিহ্য রক্ষার খাতিরে হাল খাতার আয়োজন করেছি।’’

মানিকগঞ্জ জুয়েলার্সের মালিক সুভ্রত রায় বলেন, ‘‘তাঁতীবাজারের নববর্ষ উদযাপনের সেই ঐতিহ্য আর জৌলুস এখন আর নেই। আগে যেখানে উৎসবের ব্যাপক আমেজ ছিল, এখন তা ১০ শতাংশেও নেমে এসেছে। এর মূল কারণ বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং মানুষের মানসিক দুশ্চিন্তা। রুটি-রুজির অভাব আর ব্যবসায়িক দুরবস্থার কারণে উৎসবের সেই স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ হারিয়ে গেছে। এখন আমরা কেবল নিয়ম রক্ষার খাতিরে অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে দিনটি উদযাপন করি।


হালখাতা উৎসবের ঐতিহ্য হিসেবে সাজানো দোকান

বাংলাবাজারের কার্ড ছাপানোর দোকানি শ্যামল চন্দ্র বলেন, বছর পাঁচেক আগেও পহেলা বৈশাখের সময় কার্ড ছাপানোর ব্যস্ততায় নিশ্বাস ফেলার সময় পেতাম না। পহেলা বৈশাখের এক সপ্তাহ আগেই কার্ড ছাপানোর অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দিতাম। আর এখন হালখাতার কার্ডই কেউ ছাপাতে আসে না। এবার কার্ডের জন্য এখনও তেমন কোনও অর্ডার পাইনি। মাত্র দুইজন ব্যবসায় এসেছিল ১ হাজার কার্ড ছাপিয়েছে। হালখাতায় কার্ড ছাপানোর যে সংস্কৃতি ছিল তা এখন বিলুপ্তের পথে।’’

হালখাতার পুরানো ইতিহাস সম্পর্কে পুরান ঢাকার বাসিন্দা পলাশ আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একটা সময় বৈশাখ এলে পাড়া মহল্লার প্রতিটি দোকানে হালখাতা আয়োজনের ধুম পড়তো। আমাদের কাছে এই দিনটি বিশেষ একটি দিন ছিল। টানা তিন দিন চলতো এই উৎসব। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই উৎসব ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে।’’

 

/এমএএল/ 
সম্পর্কিত
নিমতলী দেউড়ি, যার এক ফটকেই লুকিয়ে নবাবি আমলের গল্প
পুরান ঢাকায় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি: দাম বাড়ায় কমেছে কেনাবেচা
পুরান ঢাকার স্বাদে জমজমাট বিফ ভুনা
সর্বশেষ খবর
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির