‘অনার কিলিং’: এক দশক পর মেয়েকে হত্যার দায়ে বাদী নিজেই গ্রেফতার

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
০৪ মে ২০২৬, ০৩:০৪আপডেট : ০৪ মে ২০২৬, ০৩:০৭

ঢাকার আশুলিয়ায় এক কিশোরীর নিখোঁজের ঘটনায় তদন্তে বাদীর টানা চারবার নারাজি, একাধিক সংস্থার তদন্ত, এমনকি বিচার বিভাগীয় তদন্তেও কোনও হত্যার প্রমাণ না মিললেও শেষ পর্যন্ত চাঞ্চল্যকর মোড় নেয় মামলাটি। প্রায় এক দশক ধরে চলা “ক্লুলেস” এই ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), যেখানে চূড়ান্তভাবে বাদী নিজেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে স্বীকার করেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত বইয়ে এ ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের কালিহাতি থানার ঘড়িয়া পশ্চিম পাড়ার মো. কুদ্দুছ মিয়ার কিশোরী মেয়ে মোছাঃ পারুল আক্তার (১৫) ২০১২ সালের ২৮ মে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয়। পরে জানা যায়, পাশের গ্রামের মো. নাসির উদ্দিন বাবু তাকে নিয়ে ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে বসবাস শুরু করেন।

এরপর দীর্ঘদিন মেয়ের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই মেয়ের খোঁজে জামগড়ায় গিয়ে কোনো সদুত্তর না পাওয়ায় বাবা আদালতে ৩৬৪/৩৪ ধারায় মামলা করেন।

এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ আইনি লড়াই—একটির পর একটি তদন্তে কোনও হত্যার প্রমাণ না মেলায় থানা পুলিশ, ডিবি, পিবিআই টাঙ্গাইল, সিআইডি এমনকি বিচার বিভাগীয় তদন্তেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয় “ঘটনা অপ্রমাণিত” হিসেবে।

তবে বাদী একে একে চারবার নারাজি দেন। এরপর একবার রিভিশন আপিলেও ব্যর্থ হন তিনি। সর্বশেষ আদালত নারাজি খারিজ করলে মামলাটি নতুন মোড়ে যায়।

পরবর্তীকালে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নির্দেশে মামলাটি আশুলিয়া থানায় রুজু হয়ে তদন্তভার পায় পিবিআই ঢাকা জেলা। তদন্ত করেন পিবিআই ঢাকা জেলার এসআই (নিরস্ত্র) মো. জামিল হোসেন।

তদন্তে প্রথম বড় অগ্রগতি আসে নিখোঁজ সংক্রান্ত একটি জিডি এবং মোবাইল কললিস্ট বিশ্লেষণ থেকে। একটি বন্ধ নম্বরের সূত্র ধরে পিবিআই ২২ জন পরিবারের সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়।

এরপর সন্দেহের ভিত্তিতে বাদীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তদন্তে নাটকীয় মোড় নেয়। পিবিআই জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে বাদী নিজেই তার মেয়েকে হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং ঘটনায় আরেকজন সহযোগীর নাম প্রকাশ করেন।

পরে গ্রেফতারকৃত সহযোগী ‘মোকা’ও হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ভিকটিম পারুল আক্তার বাবার অমতে পালিয়ে বিয়ে করার কারণে পারিবারিক সম্মানহানি ও ক্ষোভ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন পর মেয়ের যোগাযোগের চেষ্টা এবং ঘরে ফেরার ইচ্ছার খবর পেয়ে বাবা পূর্বপরিচিত ভাড়াটিয়া খুনি মোকার সঙ্গে পরিকল্পনা করেন হত্যার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ভিকটিমকে বিয়ের কথা বলে সুকৌশলে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থানার কলন্দপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নদীর পাড়ে হাত-পা বেঁধে ওড়না ও গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। পরে মরদেহ তুলশীগঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

অপরদিকে, পিবিআই ঢাকা জেলা বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থানায় ২০১৫ সালে অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের একটি পুরোনো হত্যা মামলা খুঁজে পায়। ওই সময় পরিচয় না পাওয়ায় মামলাটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৯ সালে সিআইডি “চূড়ান্ত প্রতিবেদন সত্য” দিয়ে নিষ্পত্তি করেছিল।

পরে পিবিআই বগুড়ার উদ্যোগে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয় এবং সিআইডিতে সংরক্ষিত ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে ভিকটিমের মা ও বোনের ডিএনএ পরীক্ষা করে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

এভাবে দুই জেলার সমান্তরাল তদন্ত, পুরোনো অজ্ঞাতনামা মরদেহ মামলা পুনরায় খোলা এবং ডিএনএ মিলের মাধ্যমে ২০২২ সালে পুরো ঘটনার সত্যতা উদঘাটিত হয়। 

পিবিআই ঢাকা জেলা এ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে, কারণ তদন্তে দেখা যায় বাদীই মূল পরিকল্পনাকারী।

একই ঘটনায় পিবিআই বগুড়া জেলা জয়পুরহাটের পুনরুজ্জীবিত মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ভিকটিমের বাবা ও ভাড়াটিয়া খুনি মোকার বিরুদ্ধে ৩৬৪/৩০২/২০১/৩৪ দণ্ডবিধির অধীনে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।

এই মামলার মাধ্যমে পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে এক ভয়াবহ বাস্তবতা—দীর্ঘদিন ধরে “নিখোঁজ” ও “অজানা হত্যা” হিসেবে ঘুরতে থাকা একটি মামলা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় পিতার হাতে কন্যা হত্যার চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তিতে।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাটি প্রমাণ করেছে—একাধিক সংস্থার ব্যর্থতা ও সময়ক্ষেপণের মধ্যেও আধুনিক প্রযুক্তি, কললিস্ট বিশ্লেষণ এবং ডিএনএ পরীক্ষাই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড উদঘাটনের মূল চাবিকাঠি।

/এম/  
সম্পর্কিত
যশোরে সন্ত্রাসী ‘চশমা সাইদকে’ গলাকেটে হত্যা
ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যা মামলার আসামিকে আদালত প্রাঙ্গণে মারধর
‘প্রেমের সম্পর্ক জানিয়ে দেওয়ায়’ ১১ বছরের শিশুকে হত্যা করে ১৪ বছরের কিশোর
সর্বশেষ খবর
নেকড়ের আক্রমণ থেকে ভেড়া বাঁচাতে ‘বর্ম’ বানালেন অস্ট্রিয়ার কৃষক
নেকড়ের আক্রমণ থেকে ভেড়া বাঁচাতে ‘বর্ম’ বানালেন অস্ট্রিয়ার কৃষক
শুধু আদ-দ্বীন না, ঢাকায় ‘মৃত্যুফাঁদ’ অনেক!
শুধু আদ-দ্বীন না, ঢাকায় ‘মৃত্যুফাঁদ’ অনেক!
কালো জামের বাম্পার ফলন কি আসন্ন খরার পূর্বাভাস
কালো জামের বাম্পার ফলন কি আসন্ন খরার পূর্বাভাস
ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আবহাওয়া আজ যেমন থাকবে 
ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আবহাওয়া আজ যেমন থাকবে 
সর্বাধিক পঠিত
‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ জানেন না অনেকেই, সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ জানেন না অনেকেই, সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
মোটরযান বিক্রির পর মালিকানা পরিবর্তন বিষয়ে সতর্ক করলো বিআরটিএ
মোটরযান বিক্রির পর মালিকানা পরিবর্তন বিষয়ে সতর্ক করলো বিআরটিএ
মির্জা আব্বাসের সংসদে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন
মির্জা আব্বাসের সংসদে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন
২৫ শীর্ষ নেতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন কমিটি করলো জাতীয় পার্টি
যশোর জেলা জাতীয় পার্টি২৫ শীর্ষ নেতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন কমিটি করলো জাতীয় পার্টি
ভরিতে ৫৪৮২ টাকা কমলো স্বর্ণের দাম
ভরিতে ৫৪৮২ টাকা কমলো স্বর্ণের দাম