প্রেমের সম্পর্ক থেকে শুরু। পরে গ্রাম্য সালিশ, জরিমানা, বিয়ে। আর সেই বিয়ের কয়েক মাস পরই তরুণীর মৃত্যুকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে ‘আত্মহত্যা’র খবর। স্বামীর পরিবার দাবি করে, গলায় ফাঁস দিয়ে নিজেই জীবন শেষ করেছেন তিনি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও আত্মহত্যার কথা উল্লেখ ছিল। থানা পুলিশও ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।
কিন্তু সেই ‘আত্মহত্যা’র প্লটে শুরু থেকেই ছিল অদ্ভুত কিছু অসঙ্গতি—মৃতদেহের চুলে আঁকড়া গাছের গুটি, মুখে মাটি, ভেজা কাপড়, গলায় অস্বাভাবিক দাগ, আর গভীর রাতে প্রতিবেশীদের কিছুই টের না পাওয়া।
শেষ পর্যন্ত এসব ছোট ছোট আলামতই খুলে দেয় এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ রহস্য।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত বইয়ে এ ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ভূঞাপুরের পুংলীপাড়া গ্রামের জুরান আলী শেখের মেয়ে আজমিরা খাতুনের সঙ্গে একই গ্রামের আব্দুর রহমান ভোলার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়ভাবে সালিশ বসে। সেখানে ভোলাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়ার মৌখিক সিদ্ধান্ত হয়। পরে জরিমানার টাকা দিতে না পেরে স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী ২০১৬ সালের ২২ জুলাই তাদের বিয়ে হয়।
কিন্তু বিয়ের পর থেকেই পাল্টে যায় আজমিরার জীবন।
তদন্তে উঠে আসে, তাকে বাবার বাড়ি যেতে দেওয়া হতো না। পরিবারে যোগাযোগও প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। আজমিরা দেখতে সুশ্রী নন এবং দরিদ্র পরিবারের মেয়ে—এ কারণেও তাকে পছন্দ করত না স্বামীর পরিবার। গ্রামবাসীর চাপে বিয়ে হওয়ায় স্বামী ও তার পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ ছিল বলেও তদন্তে উঠে আসে। বিয়ের পর থেকেই আজমিরার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলছিল।
এরপর ২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল খবর আসে—আজমিরা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
ভূঞাপুর থানা পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা রুজু করে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাঁসের কারণে শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়েছে এবং ঘটনাটি আত্মহত্যাজনিত। এর ভিত্তিতে থানা পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।
কিন্তু আজমিরার পরিবার সেই ব্যাখ্যা মেনে নেয়নি। পরে আদালতে সিআর মামলা দায়ের হলে তদন্তভার পায় পিবিআই। মামলার তদন্ত শুরু করেন পিবিআই টাঙ্গাইলের পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া।
এরপরই ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে পুরো ঘটনার চিত্র।
তদন্তে পিবিআই প্রথমেই লক্ষ্য করে, আজমিরার গলায় থাকা অর্ধচন্দ্রাকৃতির কালচে দাগটি ছিল অস্বাভাবিকভাবে নিচের দিকে। অথচ সাধারণত গলায় ফাঁস দিলে দাগ ওপরের দিকে থাকার কথা।
এরপর আরও কিছু বিষয় তদন্তকারীদের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। মৃত্যুর পরপর তোলা ছবিতে দেখা যায়, আজমিরার চুলে আঁকড়া গাছের গুটি আটকে আছে, মুখে মাটি লেগে আছে এবং কাপড় ভেজা। এতে ধারণা জোরালো হয়, মৃত্যুর পর মরদেহ অন্য কোথাও নেওয়া হয়েছিল।
পরে সুরতহাল তৈরিতে সহায়তাকারী তিন নারী সাক্ষীর জবানবন্দি নেয় পিবিআই। তারাও জানান, মৃতদেহের শরীর ভেজা ছিল, মুখে মাটি ছিল এবং মাথার চুলে অনেক আঁকড়ার গুটি আটকে ছিল। এমনকি দাফনের আগে লাশ ধোয়ার সময় মাথা থেকে ১৫ থেকে ২০টি আঁকড়ার গুটি সরানো হয় বলেও জানান তারা।
তদন্তে আরও জানা যায়, ঘটনার পর বিবাদীদের বাড়ির পশ্চিম পাশে ডোবার ধারে আঁকড়া গাছের জঙ্গলে সদ্য খোঁড়া একটি গর্ত দেখা যায়।
পিবিআইয়ের ধারণা, হত্যার পর প্রথমে মরদেহ সেখানে মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে বিষয়টি জানাজানি হতে পারে ভেবে রাতেই মরদেহ তুলে ধুয়ে আবার ঘরের খাটে শুইয়ে রাখা হয়, যেন ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হয়।
তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। স্বামী-স্ত্রী একই ঘরে থাকা অবস্থায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলে চিৎকার বা হৈচৈ হওয়ার কথা। কিন্তু ঘটনাস্থলের খুব কাছের প্রতিবেশীরাও সেদিন রাতে কিছু শুনতে পাননি।
সব আলামত, সাক্ষ্য, আচরণগত অসঙ্গতি এবং পারিবারিক সম্পর্কের অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করে পিবিআই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল রাত ১১টার পর যেকোনও সময় আজমিরাকে তার স্বামী আব্দুর রহমান ভোলা, শ্বশুর সাঈদ আকন্দ, শাশুড়ি বুলবুলি বেগম এবং দুই ননদ আকলিমা ও আমেনা বেগম মিলে গলা চেপে হত্যা করেন।
পরে মরদেহ ডোবার পাড়ে নিয়ে গর্তে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরে সেটি তুলে এনে ধুয়ে ঘরের খাটে রাখা হয় এবং সকালে আত্মহত্যার গল্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ভোর ছয়টার দিকে স্বামীর বাবা-মা প্রতিবেশীদের ডেকে বলেন, আজমিরা গলায় ফাঁস দিয়েছেন। কেউ রশি দেখতে চাইলে তারা বলেন, ওড়না দিয়ে ফাঁস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মৃতদেহের চুলে আঁকড়া গাছের গুটি দেখে তখন থেকেই অনেকের মনে সন্দেহ তৈরি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী কোনও সাক্ষী না থাকলেও মৃতদেহের অবস্থা, সুরতহালের বর্ণনা, আলামত, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং ঘটনার আগে-পরে আসামিদের আচরণ বিশ্লেষণ করে পিবিআই আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। পরে আদালত তদন্ত প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হয়ে মামলায় চার্জ গঠন করেন।
এ ঘটনা সম্পর্কে পিবিআই’র ‘ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ বইয়ে বলা হয়েছে, অনেক সময় হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয়ে ওঠে মৃতদেহের নীরব আলামত। আর আত্মহত্যা বলে সাজিয়ে রাখা দৃশ্যের আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে পরিকল্পিত হত্যার নির্মম সত্য।









