প্রাণ বাঁচানো গেলেও দুর্ঘটনা ঠেকানোর উপায় কী

সাদ্দিফ অভি
০৫ জুন ২০২৬, ২০:০০আপডেট : ০৫ জুন ২০২৬, ২০:২২

গত মার্চে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় পদ্মা নদীতে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর শুক্রবার (৫ জুন) আবারও দৌলতদিয়ায় ফেরিতে ওঠার সময় একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে ডুবে যায়। তবে যাত্রী না থাকায় এবার কারও প্রাণ যায়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে ফেরি ও নৌ-দুর্ঘটনার বড় বড় ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত বন্ধ হয়নি এই ধরনের দুর্ঘটনা। তাই প্রশ্ন, বারবার ফেরিতে দুর্ঘটনা ঘটছে কেন। নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না এই দুর্ঘটনা।    

বাংলাদেশের ইতিহাসে বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক নৌ ও ফেরি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালে সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী ‘এমভি অভিযান-১০’ নামের লঞ্চে ভয়াবহ আগুনে অন্তত ৩৯ জন নিহত ও ৭২ জন আহত হন। শীতলক্ষ্যা নদীতে ২০২১ ও ২০২২ সালে যাত্রীবাহী লঞ্চডুবি, বাল্কহেড বা কার্গো জাহাজের ধাক্কায় বহু প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া বুড়িগঙ্গায় ২০২০ সালে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ‘মর্নিং বার্ড’ নামে একটি লঞ্চ ডুবে ৩৪ জনের প্রাণহানি হয়।

লয়েডস রেজিস্টার ফাউন্ডেশনের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘‘অপর্যাপ্ত সুরক্ষা বিধিমালা এবং ক্রুদের দুর্বল প্রশিক্ষণের কারণে সারা বিশ্বে বছরে গড়ে এক হাজারেরও বেশি মৃত্যু ঘটে  ফেরি-দুর্ঘটনায়।  সামুদ্রিক অবকাঠামো এবং প্রয়োগের পদ্ধতিগত সমস্যাগুলো হাজার হাজার জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।’’

গত ২৫ মার্চ রাজবাড়ির দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে গেলে ২৬ জনের মৃত্যু হয়, যা সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এরপর গত ২৪ মে নতুন নির্দেশনা জারি করে বিআইডব্লিউটিসি। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘‘ফেরিতে বাস ওঠা ও নামার আগে সব যাত্রীকে গাড়ি থেকে নামাতে হবে।’’ ওই নির্দেশনার পরও তা অমান্য করে ফেরিতে বাস, প্রাইভেটকার ওঠার অভিযোগ আছে।

বাংলা ট্রিবিউনের রাজবাড়ী প্রতিনিধি মইনুল হক মৃধা জানান, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ঘাট থেকে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এসবি পরিবহনের ওই বাসটি ফেরিতে ওঠে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেরির রেলিং ভেঙে নদীতে পড়ে ডুবে যায়। ‘করবী অক্সফাম’ নামে একটি ছোট ফেরিতে ওঠার আগে সব যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এতে করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

তিনি জানান, এসবি পরিবহনের ওই বাসটি কুষ্টিয়া থেকে ঢাকা যাচ্ছিল।  কিন্তু দৌলতদিয়া ৭ নম্বর পন্টুন এলাকায় এসে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। বাসটি পন্টুনের সংযোগকারী র‌্যাম্প ভেঙে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।  সৌভাগ্যবশত, পন্টুন বা ফেরিতে ওঠার আগেই নিয়ম অনুযায়ী বাসের সমস্ত যাত্রী নেমে গিয়েছিলেন। ফলে দুর্ঘটনার সময় বাসের ভেতরে কোনও সাধারণ যাত্রী ছিলেন না। দুর্ঘটনার পরপরই বাসের চালক ও তার সহযোগীদের (হেলপার) স্থানীয়দের সহায়তায় জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, দৌলতদিয়া ঘাটের পন্টুনগুলোতে কোনও লোহার শক্তিশালী রেলিং বা নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। কোনও যান নিয়ন্ত্রণ হারালে তা আটকে রাখার মতো কোনও প্রতিরোধক ব্যবস্থা না থাকায় বাসটি সহজেই পন্টুন থেকে পিছলে নদীতে তলিয়ে যায়। ঘাট সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, ফেরিঘাটের অ্যাপ্রোচ সড়ক ও পন্টুনের সংযোগস্থলের ত্রুটি এবং যানবাহনের যান্ত্রিক ফিটনেসের অভাব—বারবার একই ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

দুর্ঘটনায় আহত বাসচালক গোয়ালন্দ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ঝন্টু মিয়া বলেন, ‘‘কুষ্টিয়ার মজমপুর গেট থেকে সকাল সোয়া ৭টার দিকে বাসটি ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ি। এর আগে বাসের ইঞ্জিন ও ব্রেক ঠিক আছে কিনা, তা দেখে নিই। তারপরও ফেরিতে ওঠার আগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যাই। এ সময় হেলপার আমাকে সতর্ক করে লাফিয়ে ফেরির পন্টুনে নেমে যায়। এ ছাড়া বাসের ভেতর আমি ছাড়া আর কোনও লোক ছিল না। বাসটি পানিতে তলিয়ে গেলেও সৃষ্টিকর্তার দয়ায় আমি জানালা দিয়ে বের হয়ে ওপরে ভেসে উঠতে সক্ষম হই। তবে কীভাবে বের হলাম জানি না। না-হয় মরেই যেতাম। পরে স্থানীয়রা আমাকে টেনে তীরে তোলেন। এরপর গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশ আমাকে উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে।’’

বাসটিতে থাকা সহকারী (হেলপার) সাকিব হোসেন (২৭) দুর্ঘটনার বিষয়টি বুঝতে পেরে লাফিয়ে ফেরির পন্টুনের ওপর পড়ে যান। এতে তিনি কিছুটা আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। চালক ঝন্টু আলী ও হেলপার সাকিব হোসেনকে চিকিৎসার জন্য গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর বেলা পৌনে ১২টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা বাসটিকে ওপরে তুলতে সক্ষম হয়।

দুর্ঘটনায় পড়া বাসের যাত্রীরা জানান, দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর নিয়ম অনুযায়ী যাত্রীদের বাস থেকে পুলিশ নামিয়ে দেয়। যাত্রীরা নেমে যাওয়ার ২০ সেকেন্ডের মধ্যেই চোখের সামনে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মার পানিতে তলিয়ে যায়। ওই সময় বাসে চালক ছাড়া ৩৭ জন যাত্রীর কেউই ছিল না।

রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ জানান, বাসটি ফেরির পাটাতনের শেকল ভেঙে নদীতে পড়ে গেলেও ভেতরে কোনও যাত্রী ছিল না। শুধু চালক ও সহকারী (হেলপার) সামান্য আহত হয়েছেন। নৌ-রুটে যাত্রীদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘাটে আরও কঠোর সতর্কতা ও নজরদারি বাড়ানো হবে।

বিআইডব্লিউটিএ’র একজন কর্মকর্তা জানান, ফেরি ঘাট নদীভাঙন কবলিত এলাকা। প্রতি বছরই ভাঙনের সম্ভাবনা থাকে। তাই আমরা চাইলেও স্থায়ীভাবে সংযোগ সড়ক পাকা করা সম্ভব না। নদীর পানি যখন বাড়ে, তখন পানির সঙ্গে সমন্বয় করে পল্টুন ওঠানামা করতে হয়।

ফেরি ঘাটের সব কিছু ঠিকঠাক আছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘‘যেসব গাড়ির ফিটনেস নেই, ওভারলোড সেগুলো ফেরিতে উঠতে সমস্যা করে।’’

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক এবং পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘পুরো ব্যবস্থাপনার মধ্যে যে বিশৃঙ্খলা, এটা আসলে তারই পুনরাবৃত্তি। আমাদের ফেরি ঘাটের বিশেষ করে পল্টুন-জেটিগুলো সুরক্ষার একটা ব্যবস্থাপনা যেমন দরকার, একইসঙ্গে ঘাটের নিয়ন্ত্রণে যারা আছেন, যারা ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট করেন, তাদেরও আরও সচেতন হওয়া দরকার।’’

তিনি বলেন, ‘‘সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের চালক। তাদের সচেতনতা এবং একইসঙ্গে যানবাহনের ফিটনেস—এসব কিছু মিলে এই দুর্ঘটনাগুলো আমরা বারবার দেখছি, পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘দৌলতদিয়া ঘাটের আজকের ঘটনায় যাত্রী কেউ ছিল না। সেটা কিছুটা ব্যবস্থাপনার উন্নতি। এটা আমরা কিছুটা হলেও একটা ক্ষয়ক্ষতির জায়গাটা থেকে সরে আসতে পারছি। কিন্তু আমাদের যানবহনের ফিটনেস নাই, চালকের দক্ষতা বলি বা দীর্ঘ সময় চালক যে স্টিয়ারিংয়ে বসে থাকছে, তার সাথে সাথে ঘাট ব্যবস্থাপনা, সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার। আমরা গতবারও দেখেছি, দুর্ঘটনার পরে পূর্ণ জেটির চারপাশে রেলিং দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এটা দুর্ঘটনার পরে কেন। দুর্ঘটনার আগেই তো সেফটিটা দরকার। এ জন্য সেফটি অডিট করা নিয়মিত প্রয়োজন। পন্টুনে যে ওঠানামা করছে, এই জায়গাগুলোতে নিয়মিত সেফটি অডিট করতে হবে। নতুবা এই দুর্ঘটনাগুলো ঠেকানো কঠিন হবে। কোনও অবস্থাতেই যাত্রী নিয়ে বাস বা জেটি থেকে ফেরিতে ওঠা বা ফেরি থেকে নামা যেমন করতে পারবে না, একইসঙ্গে কোনোভাবেই যেন হেলপারের হাতে স্টিয়ারিং না যায়।’’

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
বন্ধ হয়ে গেলো ১৮ বছর ধরে চলা দূরপাল্লার বাস সার্ভিস
রাজশাহী-নাটোর রুটে বাস চলাচল বন্ধ
জামালপুর থেকে ঢাকার বাস চলাচল বন্ধ
সর্বশেষ খবর
আগ্রাসনের মূল্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম এশিয়া ছাড়তে বললো ইরানি সেনাবাহিনী
আগ্রাসনের মূল্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম এশিয়া ছাড়তে বললো ইরানি সেনাবাহিনী
৪৪৫ জন খেলোয়াড়, ৪৭ জন বিদেশি: খেলা কবে?
৪৪৫ জন খেলোয়াড়, ৪৭ জন বিদেশি: খেলা কবে?
ইন্ডাস্ট্রিতে কাস্টিং কাউচের অস্তিত্ব রয়েছে: শ্রেয়া ঘোষাল
ইন্ডাস্ট্রিতে কাস্টিং কাউচের অস্তিত্ব রয়েছে: শ্রেয়া ঘোষাল
সরকার যাত্রা শুরুর ছয় মিনিটের আগেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে: মামুনুল হক
সরকার যাত্রা শুরুর ছয় মিনিটের আগেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে: মামুনুল হক
সর্বাধিক পঠিত
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
বৃন্দাবনের যে অংশে সন্ধ্যার পর প্রবেশ নিষেধ
বৃন্দাবনের যে অংশে সন্ধ্যার পর প্রবেশ নিষেধ