রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা মাসুদ রানা খান। ব্যবসায়িক কারণে তাকে প্রায়ই দেশের বাইরে যেতে হয়, বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় তার যাতায়াত নিয়মিত। বছর দুয়েক আগেও এই রুটে ঢাকা-কুয়ালালামপুর যাতায়াতে (আপ-ডাউন) বিমান খরচ পড়তো ৩০ থেকে ৩৫ হাজার, সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমানে এই ভাড়া ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বেড়ে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা ছুঁয়েছে। মাসুদ রানা আক্ষেপ করে বলেন, “দেড়-দুই বছরের ব্যবধানে শুধু মালয়েশিয়া রুটে বিমান ভাড়া ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেড়েছে।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু মালয়েশিয়া নয়, আন্তর্জাতিক প্রায় সব রুটেই ভাড়া একই হারে বা কোনও কোনও ক্ষেত্রে দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক দেশগুলোতে মরশুম ভেদে এই ভাড়া দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত হয়ে যায়। সাধারণ সময়ে সৌদি আরবের আপ-ডাউন ভাড়া যেখানে ছিল ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকায়।
আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের তুলনামূলক চিত্র
বিমান ভাড়ার এই লাগামহীন যাঁতাকলে পড়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দুই ধরনের যাত্রীরাই চরম নাজেহাল হচ্ছেন। দেড়-দুই বছরের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ রুটে ২ থেকে ৪ হাজার এবং আন্তর্জাতিক রুটে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে।
মোয়াজ্জেম হোসেন নামের এক ট্রাভেল এজেন্সির মালিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিমান ভাড়া সবসময় এক থাকে না, চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত ওঠানামা করে। তবে গত দুই বছরের তুলনায় সব আন্তর্জাতিক রুটেই ভাড়া বেড়েছে। সদ্য হজ মৌসুম শেষ হওয়ায় এখন ওমরাহর প্রস্তুতি চলছে। এই সময়ে স্বাভাবিক ভাড়া কিছুটা কমে ৮০ থেকে ৮৫ হাজারের মধ্যে থাকলেও মাস দুয়েকের মধ্যে এই ভাড়া আরও বেড়ে যাবে।” এছাড়া ঢাকা থেকে কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, জেদ্দা, রিয়াদসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতে যাত্রীদের আগের চেয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
এদিকে অভ্যন্তরীণ রুটে আগে যেখানে ৪ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকার মধ্যে ঢাকা থেকে রাজশাহী বা সৈয়দপুর যাওয়া যেতো, বর্তমানে সেখানে ন্যূনতম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার নিচে টিকিট মিলছে না। শেষ মুহূর্তের টিকিটের ক্ষেত্রে এই দাম ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ রুটের নিয়মিত যাত্রী আব্দুর রহমান বলেন, “দেড়-দুই বছর আগেও যে রুটে সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজারে রাজশাহী গেছি, এখন সেখানে ৭ হাজার টাকার ওপরে লেগে যাচ্ছে। ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় আমরা সাধারণ যাত্রীরা চরম অসহায় বোধ করছি।”
অভ্যন্তরীণ রুটের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এখন ঢাকা-কক্সবাজার রুট। পর্যটকদের জন্য এই রুটে যাতায়াত এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। আগে সাড়ে ৫ হাজার টাকায় ওয়ান-ওয়ে টিকিট মিললেও এখন ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকার নিচে পাওয়া দুষ্কর। এমনকি কখনও কখনও শেষ মুহূর্তে ওয়ান-ওয়ে ভাড়া ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। বাড়তি ভাড়ার কারণে বাধ্য হয়ে অনেক যাত্রী এখন বিমান ছেড়ে সড়ক বা রেলপথের দিকে ঝুঁকছেন।
নেপথ্যে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি ও ভূরাজনীতি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের (বিমানের জ্বালানি) মূল্যবৃদ্ধি, অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অশান্ত ও অস্থির পরিস্থিতি বিমান ভাড়ার এই লাগামহীন বৃদ্ধির প্রধান কারণ। বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ রুটে জেট ফুয়েলের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। জ্বালানির দামের সঙ্গে ভাড়া সমন্বয় না করলে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
উল্লেখ্য, গত ২৪ মার্চ অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩২১৬ ডলার করা হয়।
এর আগে ৭ এপ্রিল বিইআরসি সচিব মো. নজরুল ইসলাম সরকারের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে দাম আরও বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি লিটার ২২৭ টাকা ০৮ পয়সা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৪৮০৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়।
সবশেষ ২৪ মে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি ৩৯ টাকা ৫৭ পয়সা কমানো হয়। নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি লিটার তেলের দাম ২০৫ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে কমে ১৬৫ টাকা ৮৮ পয়সা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ১ দশমিক ৩৮৮৫ ডলার থেকে কমে ১ দশমিক ০৮২৩ ডলার (শুল্ক ও ভ্যাট ছাড়া) নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলো— ঢাকার হযরত শাহজালাল, চট্টগ্রামের হযরত শাহ আমানত, সিলেটের ওসমানী, যশোর ও কক্সবাজার বিমানবন্দরসহ সব রুটের জন্য নিয়মিত বিরতিতে এই মূল্য সমন্বয় করে থাকে।
কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বিমানের ভাড়া কিছুটা বেড়েছে, তবে তা একবারে অস্বাভাবিক নয়। মাঝে মাঝে ভাড়া অতিরিক্ত বাড়ার কারণ হলো সিটের তুলনায় অতিরিক্ত চাহিদা। সবাই তো ব্যবসা করতে চায়, তখন আমাদেরও পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এছাড়া এক শ্রেণীর ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে, যারা সুযোগ বুঝে সময়-অসময়ে টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেয়।”
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম এই সংকট উত্তরণে সরকারকে নীতিগত সহায়তার তাগিদ দিয়ে বলেন, “দেশীয় বিমান খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে বিশেষ ভর্তুকি বা করছাড়ের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। বিশেষ করে, জেট ফুয়েলের ওপর বিদ্যমান উচ্চ ট্যাক্স ও ভ্যাট কমিয়ে দাম সাধারণের সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। ডলার সংকটের এই সময়ে এয়ারলাইনসগুলোর জন্য বিশেষ এলসি সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি ও অন্যান্য চার্জ পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্বালানি তেলের দাম ও বিমান ভাড়া না কমালে যাত্রীদের পাশাপাশি এয়ারলাইনস মালিকরাও বড় ধরনের বিপাকে পড়বেন।









