বেতনের টাকা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে কেন, কারণ জানলে চমকে যাবেন

গোলাম মওলা
২২ জুলাই ২০২৬, ১০:০৬আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ১০:০৮

একসময় মাসের বেতন দিয়ে পুরো মাসের সংসার চালানো অনেক পরিবারের জন্য সম্ভব হতো। এখন সেই বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বেতন হাতে পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই অনেকের ব্যাংক হিসাব প্রায় শূন্য হয়ে যাচ্ছে। মাসের শেষ সপ্তাহ পার করতে ধার, ক্রেডিট কার্ড কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অসংখ্য পরিবারকে। প্রশ্ন হচ্ছে— একই বেতন পেয়েও কেন মাসের শুরুতেই টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে?

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর প্রধান কারণ শুধু মূল্যস্ফীতি নয়; বরং দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, উচ্চ সুদহার, স্থবির বিনিয়োগ এবং মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাব।

চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ

টানা চার অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতিকে স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারেনি সরকার। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ সেই স্বস্তি পাচ্ছেন না।

চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, সবজি— প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো—দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। ফলে বাজারে মানুষ যে দামে পণ্য কিনছেন, তাতে বাস্তব স্বস্তি এখনও আসেনি।

১০০ টাকার বাজার এখন ১৪০ টাকারও বেশি

মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে পরিবারের মাসিক বাজেটে।

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত চার অর্থবছরে ১০০ টাকার যে বাজার করা যেত, এখন সেই একই বাজার করতে খরচ হচ্ছে ১৪০ টাকারও বেশি।

অন্যদিকে একই সময়ে বেতন বা মজুরি সেই হারে বাড়েনি। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। কাগজে-কলমে বেতন বাড়লেও সেই অর্থ দিয়ে আগের মতো পণ্য কেনা যাচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

কৃষকের কাছ থেকে ২০ টাকা, ঢাকায় ৬০ টাকা দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির অন্যতম কারণ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা।

বগুড়ার মহাস্থানগড়সহ দেশের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকা থেকে কম দামে কেনা সবজি রাজধানীতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কয়েক হাত বদলায়। প্রতিটি ধাপে যুক্ত হয় কমিশন, পরিবহন ব্যয়, গুদাম খরচ, লাভ, কখনও অনানুষ্ঠানিক চাঁদাবাজির ব্যয়ও। ফলে কৃষক যে পণ্য ২০ টাকায় বিক্রি করেন, সেটিই ঢাকায় ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়। শুধু সবজি নয়, চাল, ডিম, মাছ, মুরগি, দুধসহ অনেক পণ্যের ক্ষেত্রেই উৎপাদক ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বাজার ব্যবস্থাপনার বড় ব্যর্থতা।

কেন কমছে না বাজারের দাম?

সরকার কয়েকটি নিত্যপণ্যে শুল্ক কমিয়েছে, আমদানিতে সুবিধা দিয়েছে এবং বাজার তদারকিও বাড়িয়েছে। তবুও কেন দাম কমছে না?

বিশ্লেষকদের মতে, এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। সেগুলো হলো– দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল; অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগী; দুর্বল বাজার তদারকি; সীমিত প্রতিযোগিতা

পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি; উচ্চ সুদহারে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়া; আগের বেশি দামে আমদানি করা পণ্যের মজুত।

এ কারণে সরকারের দেওয়া অনেক সুবিধাই শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

উচ্চ সুদের আরেক চাপ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। এতে ব্যাংক ঋণের খরচ বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে অনেক পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ থাকলেও ব্যবসায়ীরা তা পারছেন না।

অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানও ধীর হয়ে পড়ছে।

বেতন শেষ, ভরসা এখন ক্রেডিট কার্ড

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশের ভেতরে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা; যা এক বছরের ব্যবধানে ৩৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। এটি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, মানুষ এখন শুধু বিলাসী কেনাকাটা নয়, দৈনন্দিন বাজার করতেও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন।

ব্যাংকারদের মতে, মাসিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়ায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ধারনির্ভর জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, সাময়িকভাবে ক্রেডিট কার্ড স্বস্তি দিলেও আয় অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে এটি বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতি

গত জুন মাসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল বাংলাদেশে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট, কিন্তু ব্যয় প্রতিদিন বাড়ছে, তাদের জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সমাধান নয়

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কার্যকর সমাধানের জন্য প্রয়োজন– কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ; অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী কমানো; পাইকারি ও খুচরা বাজারে কার্যকর নজরদারি; ডিজিটাল কৃষি বিপণন সম্প্রসারণ; কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নয়ন; বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি; চাঁদাবাজি ও কৃত্রিম সংকট কঠোরভাবে দমন; উৎপাদন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।

কেন মাসের শুরুতেই বেতন শেষ হয়ে যাচ্ছে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। সেগুলো হলো– দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি; বেতনের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি; নিত্যপণ্যের দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি; কৃষক ও ভোক্তার দামের মধ্যে বিশাল ব্যবধান; বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা; উচ্চ সুদে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি; বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা এবং প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া।

স্বস্তি ফিরবে কীভাবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরবে না। কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য পান, ভোক্তা যেন যুক্তিসংগত দামে পণ্য কিনতে পারেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অস্বাভাবিক মুনাফা কমানো যায়– এমন একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

কারণ কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি কমলেও যদি বাজারে গিয়ে মানুষ একই দামে চাল, ডিম, মাছ কিংবা সবজি কিনতে বাধ্য হন, তাহলে তাদের কাছে অর্থনীতির কোনও পরিসংখ্যানই স্বস্তির খবর হয়ে ওঠে না।

বাস্তবতা হলো, আজ অনেক পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর বেতন কত– তা নয়; বরং সেই বেতন দিয়ে মাসের কতদিন সংসার চালানো সম্ভব।

/আরকে/
সম্পর্কিত
বৃষ্টির ধাক্কায় কাঁচাবাজারে আগুন, মরিচের দাম ২০০ টাকা
বৃষ্টি-বন্যার ধাক্কায় রাজধানীর বাজারে অস্থিরতা, ভোগান্তিতে ক্রেতারা
হঠাৎ বেড়েছে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন, নেপথ্যের কারণ কী
সর্বশেষ খবর
জামায়াত এমপির বিয়ে আর কাবিনের গোমর ফাঁস করে দিলেন কাজী
জামায়াত এমপির বিয়ে আর কাবিনের গোমর ফাঁস করে দিলেন কাজী
বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের পর বিশ্রামে কোথায় গেলেন মেসি
বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের পর বিশ্রামে কোথায় গেলেন মেসি
আবারও গুমের অভিযোগ: রাষ্ট্রের কী করা উচিত 
আবারও গুমের অভিযোগ: রাষ্ট্রের কী করা উচিত 
চোখের সামনে মৃত্যু দেখেও পালাইনি, গোলাবর্ষণ আর বোমা আতঙ্কে কেটেছে ১১৫ দিন
চোখের সামনে মৃত্যু দেখেও পালাইনি, গোলাবর্ষণ আর বোমা আতঙ্কে কেটেছে ১১৫ দিন
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নিয়ে নানান প্রশ্ন, যা বললেন স্ত্রী ও শ্বশুর
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নিয়ে নানান প্রশ্ন, যা বললেন স্ত্রী ও শ্বশুর
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
গুজবে তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ট্যাংকি ভর্তি করার হিড়িক, প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি
গুজবে তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ট্যাংকি ভর্তি করার হিড়িক, প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি
চাকরি হারালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, গ্রেফতারে চলছে অভিযান
চাকরি হারালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, গ্রেফতারে চলছে অভিযান