পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যয় বাংলাদেশের একটি হত্যার ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি পরিষ্কার করে হাদি হত্যার বিষয়ে কোনও শব্দ উচ্চারণ করেননি। নিজের প্রতিপক্ষের উদ্দেশে তার বার্তা— ‘‘বাংলাদেশে কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন জানি।’’ এমনকি তিনি দাবি করেন, ‘‘ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ফোন করে ‘দেশের স্বার্থে’ খবর চেপে যেতে বলেছিলেন।’’ তিনি আরও দাবি করেন, তার কাছে খুনির তথ্য আছে। মমতার এমন বক্তব্যে বাংলাদেশে তোলপাড় শুরু হলেও কূটনৈতিক মহল বিষয়টিকে পলিটিক্যাল স্ট্যান্ট হিসেবেই দেখছেন। কারণ ক্ষমতায় থেকেও তিনি এই বিষয় চেপে গিয়েছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ে ক্ষমতা হারান মমতা ব্যানার্জি। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর দলটি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে হেরে যায়। নির্বাচনের পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানালে পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যের সপ্তদশ বিধানসভা ভেঙে দেন। এরপর বিজেপি’র প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। গঠন করেন মন্ত্রিসভা। মমতা হয়ে পড়েন প্রধানবিরোধী।
মমতা বন্দোপাধ্যয় কলকাতার ধর্মতলায় গত মঙ্গলবার (২ জুন) একটি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে এসটিএফ অ্যারেস্ট করেছিল জেনে রাখুন। যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভল্যুশন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না, আমার সেই অধিকার নেই। কিন্তু আমার মুখ্য বক্তব্য হলো— তারা মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে। তখন আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে।’’
মমতা দাবি করেন, তার পরে হোম মিনিস্টার নিজে আমাকে ফোন করে বলেন, ‘আপনি বেঙ্গল পুলিশকে বলে দিন এই কথা যেন বাইরে না যায়। এটা দেশের স্বার্থে।’’
মমতা বন্দোপাধ্যয় বলেন, ‘‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ গভর্নমেন্ট চেঞ্জ হলেও আমি তো সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথা ভাণ্ডার, তথ্য ভাণ্ডার, সত্য ভাণ্ডার।’’
চলতি বছরেরই মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বাংলাদেশে ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। তাদের নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেন। এই দুই অভিযুক্ত মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকেছিল বলে জানিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। এর পরে অভিযুক্ত ফিলিপ সাংমা নামে একজনকে নদিয়ার শান্তিপুরের কাছ থেকে গ্রেফতার করে এসটিএফ। তার আগে ফয়সাল করিম মাসুদকে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশের পুলিশ। তবে সুস্পষ্টভাবে এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন কিনা, মমতার বক্তব্যে তা স্পষ্ট না।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, মমতার কাছে যদি তথ্য থাকে, তাহলে সেটা তিনি ক্ষমতায় থাকতে স্পষ্ট করতে পারতেন। তার জন্য তখন অবস্থান নিরাপদ ছিল।
সাবেক একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমি মনে করি এটা একটা পলিটক্যাল স্টান্ট। এটা কোনও কূটনৈতিক বার্তা নয়। এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত হবে না।’’
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘‘মমতা সুনির্দিষ্টভাবে কিন্তু উল্লেখ করেননি শরীফ ওসমান হাদির খুনিদের বিষয় কিনা। উল্লেখ না করলেও কিছুটা হলেও ধারণা করা যায়। কিন্তু সেই ঘটনা যখন পশ্চিমবঙ্গে ঘটে তখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। যদি কেন্দ্রীয় সরকার তার কাছে তথ্য গোপন করার কথা বলেও থাকে, তিনি চাইলে তা প্রকাশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তখন করেননি। তখনও তিনি ক্ষমতাসীন বিজেপি’র বিরোধীপক্ষ ছিলেন, এখনও আছেন। অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে শুধু মুখ্যমন্ত্রী পদের। তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তথ্য গোপন করে গেছেন, এখন ক্ষমতা হারিয়ে বলছেন। এটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা, পলিটিক্যাল স্ট্যান্ট। এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ, এটা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত হবে না।’’
এদিকে ঢাকার পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া না জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, মমতার বক্তব্য আলোচনার কোনও বিষয় নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘একটা নির্বাচন হয়েছে পাশের দেশে। যিনি হেরে গেছেন তিনি বলছেন, ওনাদের সরকারকে উদ্দেশ করে। সেটা নিয়ে এখানে বাংলাদেশের মন্তব্য করা উচিত হবে না বলে আমি মনে করি। এটা আমাদের আলোচনা করার মতো বিষয় নয়।’’
মমতার এমন বক্তব্যে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপড়েন তৈরি হবে কিনা, এমন প্রশ্নে ওই কূটনীতিক বলেন, ‘‘সুযোগ নেই।’’
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দোপাধ্যয় হেরে যাওয়ার জন্য বিজেপি’র প্রতি রাজনৈতিক বিদ্বেষ করছেন। মমতার সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক ইস্যুতে বিরোধ ছিল। তার মধ্যে অন্যতম বিরোধ গঙ্গার পানি। তার বিরোধিতা এবং হুমকিতে গঙ্গা চুক্তি হয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে উত্তেজনা তৈরি করে বিজেপিকে চাপে ফেলতে চাচ্ছেন মমতা। অনেকটা বাংলাদেশের ঘাড়ে বন্দুক রাখার মতোই।









