মশা মারতে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ, তবু ডেঙ্গুর প্রকোপ কমছে না কেন

আতিক হাসান শুভ
০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:০০আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:০০

রাজধানীতে মশার উপদ্রব বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল মিলছে না। গত ১০ বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশক নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও নগরবাসী এখনও কিউলেক্স ও এডিস মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫৮ জন, মারা গেছেন ১৯ জন।

মশক নিধনে ব্যবহৃত ওষুধের অকার্যকারিতা এবং দুই সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ওষুধ না ছিটানোর অভিযোগও পুরোনো। প্রশ্ন উঠেছে, প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও কেন মশা কমছে না। মশক নিধনে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় হচ্ছে কোথায়?

গত তিন বছরের তুলনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও নগরবাসীর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার শঙ্কা রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ৩ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫৮ জন এবং মারা গেছেন ১৯ জন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও জুলাই ও আগস্টে রোগটির প্রকোপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, থানা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ‘এনএস১’ পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রোগী বাড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব হাসপাতালে চালু করা হবে। তিনি স্থানীয় পর্যায় থেকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

১০ বছরে বরাদ্দ ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকার বেশি

গত ১০ বছরের বাজেট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিবছর মশক নিধনে বরাদ্দ বাড়লেও ডেঙ্গু সংক্রমণ কমার লক্ষণ নেই। বরং ডেঙ্গুর ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। গত ১০ বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে শুধু মশক নিধনে ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মশক নিধনে বরাদ্দ ছিল ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১৮৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ প্রায় আট গুণ বেড়েছে। গত এক দশকে উত্তর সিটিতে এ খাতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৫৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ প্রায় ৪ দশমিক ৭ গুণ বেড়েছে। গত এক দশকে দক্ষিণ সিটিতে এ খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ৩১০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

বরাদ্দে টাকা কোথায় খরচ হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মশক নিধনের ওষুধ, যন্ত্রপাতি ক্রয়, ডেঙ্গু মোকাবিলায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং প্রচারণায় এ অর্থ ব্যয় করা হয়।

এত খরচের পরও কেন কমছে না মশা

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও মশক নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, আগে এডিস মশা শুধু বর্ষা মৌসুমে দেখা গেলেও ২০১৯ সালের ডেঙ্গু মহামারির পর তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে সব সময় ডেঙ্গুর ঝুঁকি থাকে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত কর্মসূচি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সমন্বিতভাবে সারা দেশে একযোগে মশক নিধনের কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়নি। রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত একসঙ্গে দুই থেকে তিন দিন অভিযান পরিচালনা করতে হবে। বছরে অন্তত দুইবার এ ধরনের অভিযান প্রয়োজন।

তার মতে, এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার প্রজননস্থল ও ডিম পাড়ার স্থান একযোগে পরিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকর ওষুধ নির্বাচন করে সারা দেশে মশা ও শূককীট নিধনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে এ কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত ডেঙ্গুর টিকা প্রদান এবং মৌসুম শুরুর আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সচেতনতার বিকল্প নেই

ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে জাতীয় কমিটি গঠন করেছে এবং কমিটি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পরও মশার লার্ভা তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণের সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। তার নেতৃত্বে পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স

ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ক জাতীয় কমিটি’ পুনর্গঠন করেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির প্রথম সভায় একটি টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে।

টাস্কফোর্সের সভাপতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং সদস্য সচিব স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন-২ শাখার উপসচিব।

টাস্কফোর্সের প্রধান দায়িত্ব হলো জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত জাতীয় কমিটিকে জানানো।

১৯ সদস্যের এই টাস্কফোর্সে স্থানীয় সরকার বিভাগ, দুই সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), রাজউক, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এবং আরবান পাবলিক হেলথ প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস প্রকল্পের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

টাস্কফোর্সের বিশেষ অভিযান

টাস্কফোর্স গঠনের পর প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নেতৃত্বে রাজধানীতে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। জিগাতলা এলাকায় বিভিন্ন ভবন, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শনকালে দুটি নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। এ ঘটনায় দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ২৭০ ধারা অনুযায়ী দুই ভবনের মালিককে ৫০ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি ভবনের প্রবেশপথে সতর্কতামূলক লিফলেট সেঁটে দেওয়া হয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে শাস্তি দেওয়া আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। আমরা চাই, ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিটি নাগরিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক।’

তিনি জানান, জাতীয় কমিটির অধীনে টাস্কফোর্সের অভিযান রাজধানীজুড়ে অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে গণমাধ্যমের আরও সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেন তিনি। এছাড়া যাত্রাবাড়ির দক্ষিণ কুতুবখালী খাল পরিদর্শনের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।

যা বলছে দুই সিটি করপোরেশন

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, সরকার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে। জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, টাস্কফোর্সের অভিযানে প্রতিমন্ত্রী সরাসরি দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। আগামী সপ্তাহেও বিশেষ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘উত্তর সিটিতে নিয়মিত মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গঠিত বিশেষ কমিটির কার্যক্রমও চলছে। আমরা আশা করছি, ডেঙ্গু মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মশককর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। তবে নগরবাসীর সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এ কার্যক্রম সফল হবে না। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে হবে নিজ নিজ বাসা থেকেই। জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।’

/ইউএস/
সম্পর্কিত
ঢাকার সড়ক কার নিয়ন্ত্রণে—ট্রাফিক পুলিশ নাকি অটোরিকশার 
ঢাকায় আজ দিনের তাপমাত্রা হালকা কমতে পারে, হতে পারে বৃষ্টি
আদাবরে বিএনপি নেতা খুন: গ্রেফতার ৯
সর্বশেষ খবর
ম্যাচ শেষে ভোজিনিয়াকে কী বললেন মেসি
ম্যাচ শেষে ভোজিনিয়াকে কী বললেন মেসি
শোকযাত্রার আগে খামেনির জানাজায় জনতার ঢল
শোকযাত্রার আগে খামেনির জানাজায় জনতার ঢল
জাহাজভাঙা শিল্পে ৬ মাসে ২৮ দুর্ঘটনা, তিন জন নিহত
জাহাজভাঙা শিল্পে ৬ মাসে ২৮ দুর্ঘটনা, তিন জন নিহত
কেপ ভার্দের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর জয়ের পর যা বললেন স্কালোনি
কেপ ভার্দের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর জয়ের পর যা বললেন স্কালোনি
সর্বাধিক পঠিত
এএসপি ফজলুর রহমান গ্রেফতার
এএসপি ফজলুর রহমান গ্রেফতার
ত্রিশ বছরে ৩০০ ফাইভ স্টার হোটেলে প্রতারণা, অবশেষে ৬৯ বছর বয়সে গ্রেফতার
ত্রিশ বছরে ৩০০ ফাইভ স্টার হোটেলে প্রতারণা, অবশেষে ৬৯ বছর বয়সে গ্রেফতার
খামেনির শেষ বিদায়ে তেহরানে কারা, আমন্ত্রণ পাননি যারা
খামেনির শেষ বিদায়ে তেহরানে কারা, আমন্ত্রণ পাননি যারা
ভিসা আবেদনকারীদের জন্য যে বার্তা দিলো ভারতীয় হাইকমিশন
ভিসা আবেদনকারীদের জন্য যে বার্তা দিলো ভারতীয় হাইকমিশন
মাঠে নেমেই মেসির ইতিহাস
মাঠে নেমেই মেসির ইতিহাস