চলতি বছরে পানিতে ডুবে ঝরেছে ৫২৬ শিশুর প্রাণ, থামবে কীভাবে

আসাদ আবেদীন জয়
২৫ জুলাই ২০২৬, ১৭:৪২আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ১৭:৪৩

বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই দেশে পানিতে ডুবে মারা গেছে ৫৮২ জন। এর মধ্যে ৫২৬ জনই শিশু। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মৃত্যুর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। শিশুদের ছয় বছর বয়স হলেই সাঁতার শেখানো, নিয়মিত তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত সিপিআর দেওয়ার মাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর বয়সে সাঁতার শেখানো হলে একটি শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে প্রায় ৯০ দশমিক ৩ শতাংশ সুরক্ষিত থাকে।

‘ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইড’ বা ‘স্রোতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান’—এই প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ (২৫ জুলাই) পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

পরিসংখ্যান যা বলছে

ডিজাস্টার ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পানিতে ডুবে মোট ৫৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ৫২৬ জন, নারী ১১ জন এবং পুরুষ ৪৫ জন। শিশুদের মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন।

সংস্থাটি জানায়, এ সময় সবচেয়ে বেশি ৩৪৮ জন পুকুরে এবং ১০৪ জন নদীতে ডুবে মারা গেছেন।

ডিজাস্টার ফোরামের ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে পানিতে ডুবে মোট ১ হাজার ৩১১ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে শিশু ১ হাজার ১৮৪ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ। নিহত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৭৬১ জন এবং মেয়ে ৪২৩ জন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মারা যাওয়া ১ হাজার ১৮৪ শিশুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৩১ জনের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছর। এছাড়া ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী মারা যায় ৩৫৪ শিশু।

ডিজাস্টার ফোরাম জানায়, সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটে। ওই সময়ে পুকুরে ৭৬৫ জন, নদীতে ১৮৫ জন এবং ডোবায় ১০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

কেন ঘটছে এত মৃত্যু

বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যগত ঘাটতি, সুযোগের অভাব ও সচেতনতার অভাব; এই তিন কারণে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা কমানো যাচ্ছে না।

ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর ড্রাউনিং প্রিভেনশনের (এনএডিপি) আহ্বায়ক সদরুল হাসান মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় সমস্যা তথ্যগত ঘাটতি। একজন রিকশাচালক বা গৃহকর্মী জানেন, সন্তানের স্কুলে যাওয়ার বয়স হলে তাকে স্কুলে পাঠাতে হবে। কিন্তু অনেক শিক্ষিত অভিভাবকও জানেন না, সন্তানের ছয় বছর বয়স হলেই তাকে সাঁতার শেখানো উচিত। এই তথ্য এখনো মানুষের কাছে পৌঁছায়নি।

তিনি বলেন, আরেকটি বড় সমস্যা সুযোগের অভাব। ঢাকায় সাত বছর বয়সী সন্তানকে সাঁতার শেখাতে চাইলে কোথায় নিয়ে যাবেন—এমন প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর নেই। সরকারি পর্যায়ে উন্মুক্ত ও সহজলভ্য সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা নেই। বেসরকারিভাবে কিছু উদ্যোগ থাকলেও সেগুলো সীমিত এবং অনেকেই সে সম্পর্কে জানেন না। ফলে তথ্য ও সুযোগ—দুই ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক আবু হাসানাত মোহাম্মদ কিশোয়ার হোসেন বলেন, এই ব্যর্থতার একটি বড় কারণ সামাজিক কাঠামো। সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় টিকাকেন্দ্র, স্বাস্থ্যকর্মী ও জাতীয় কর্মসূচি থাকলেও পানিতে ডোবা থেকে একটি শিশুকে রক্ষা করার দায় প্রায় পুরোপুরি পরিবারের, বিশেষ করে মায়ের ওপর বর্তায়। অথচ একজন গ্রামীণ নারীকে একই সঙ্গে রান্না, পানি সংগ্রহ, গৃহস্থালির কাজ, অন্য সন্তানের যত্ন এবং অনেক ক্ষেত্রে আয়মূলক কাজও করতে হয়। কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতায় কোনো শিশু মারা গেলে সমাজ প্রথমেই মাকেই দোষারোপ করে। অথচ নিরাপদ শিশুযত্নের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

তিনি আরও বলেন, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া বা মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধে জাতীয় কর্মসূচি, বাজেট ও তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকলেও প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া পানিতে ডুবে মৃত্যুর জন্য নেই কোনো স্বতন্ত্র জাতীয় পরিকল্পনা, নির্দিষ্ট বাজেট বা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের কাঠামো। কোথায়, কখন, কোন বয়সের শিশু ডুবে মারা যাচ্ছে—সেই মৌলিক তথ্যও নিয়মিত সংরক্ষণ করা হয় না। যে সমস্যাকে পরিমাপ করা হয় না, সেটি কখনও অগ্রাধিকারও পায় না।

কীভাবে কমবে পানিতে ডুবে মৃত্যু

পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে শিশুদের নিয়মিত তত্ত্বাবধান, ছয় বছর বয়সে সাঁতার শেখানো এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত সিপিআর দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সদরুল হাসান মজুমদার বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু এখন মহামারির মতো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু নদী, পুকুর বা খালে নয়, বাথরুমে বালতিতে জমে থাকা পানিতেও শিশু মারা যায়। তাই কোনো এনজিও বা সরকারি সংস্থার পক্ষে প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে বাথরুম পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিভাবক ও শিশুদের দেখাশোনাকারীদের সচেতন করা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর তিনটি উদ্যোগ ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। প্রথমত, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা গেলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো শিশুর ৬ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে সাঁতার শেখানো হলে সে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে প্রায় ৯০ দশমিক ৩ শতাংশ সুরক্ষিত থাকে।

তৃতীয়ত, পানিতে পড়ে যাওয়ার পর উদ্ধার করে মাথার ওপর তুলে ঘোরানো, ময়লা বা দুর্গন্ধযুক্ত পানি খাওয়ানো কিংবা পেট থেকে পানি বের করার চেষ্টা করার মতো প্রচলিত পদ্ধতিগুলো সম্পূর্ণ ভুল ও ক্ষতিকর। এর পরিবর্তে দ্রুত সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) দিতে হবে। অর্থাৎ মুখে মুখ দিয়ে শ্বাস দেওয়া এবং বুকে চাপ দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস চালু করার চেষ্টা করতে হবে, যাতে শ্বাসনালিতে আটকে থাকা পানি বের হয়ে আসে এবং তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঝুঁকি কমে।

তিনি আরও বলেন, এই তিনটি কার্যকর উদ্যোগ বাংলাদেশেই গবেষণা ও পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এর ভিত্তিতেই ২০২১ সালে জাতিসংঘ ‘গ্লোবাল ড্রাউনিং প্রিভেনশন’–সংক্রান্ত রেজুলেশন গ্রহণ করে।

সন্তানকে সাঁতার শেখানোর আহ্বান

সদরুল হাসান মজুমদার বলেন, শত প্রতিকূলতা ও শত বাধা সত্ত্বেও প্রতিটি অভিভাবককে ছয় বছর বয়সী সন্তানকে সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ নিতে হবে। যেভাবে বাবা-মা শিশুকে হাঁটতে শেখান—প্রথমে হাত ধরে, পরে ধীরে ধীরে ছেড়ে দেন; ঠিক একইভাবে নিয়মিত গোসলের সময় ধাপে ধাপে সাঁতারও শেখানো যায়। তাই গ্রামাঞ্চলের বাবা-মায়েদের এই শিক্ষা দেওয়া জরুরি যে, সন্তানের ছয় বছর বয়স হলেই তাকে সাঁতার শেখাতে হবে।

তিনি বলেন, সন্তানকে নরম খাবার খাওয়ানো, হাঁটতে শেখানো, অক্ষর শেখানো কিংবা স্কুলে পাঠানোর মতোই সাঁতার শেখানোও একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা। ‘সুইমিং ইজ নো মোর অ্যা স্পোর্ট’—সাঁতার শুধু খেলাধুলা নয়, এটি একটি জীবন রক্ষাকারী দক্ষতা। তাই প্রতিটি শিশুকে ছয় বছর বয়সেই এই দক্ষতায় পারদর্শী করে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারের ওপর সব দায় চাপিয়ে লাভ নেই। সাঁতার শেখানোর পর্যাপ্ত জায়গা নেই—এটি সত্য। কিন্তু সন্তান মারা গেলে সেই ক্ষতি অভিভাবকেরই হবে। তাই যার সন্তানের ছয় বছর বয়স হয়েছে, তাকে অবশ্যই সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
৩০ ঘণ্টা পর সেতুর নিচে ভেসে উঠলো বর্ণার লাশ
বাড়ছে পানি, শনিবার খোলা হবে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট
গোসলে নেমে একসঙ্গে ডুবে গেলো চার ছাত্রী, একে একে লাশ উদ্ধার
সর্বশেষ খবর
ব্রিকস আমন্ত্রণের প্রভাব ক্রিকেটে, বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ নিয়ে নতুন খবর!
ব্রিকস আমন্ত্রণের প্রভাব ক্রিকেটে, বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ নিয়ে নতুন খবর!
যন্তর মন্তরের আন্দোলন প্রত্যাহার করলো ককরোচ জনতা পার্টি
যন্তর মন্তরের আন্দোলন প্রত্যাহার করলো ককরোচ জনতা পার্টি
স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মালদ্বীপ গেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মালদ্বীপ গেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ধর্মের ভিত্তিতে নয়, সবাইকে সমান মর্যাদায় দেখতে হবে: আইনমন্ত্রী
ধর্মের ভিত্তিতে নয়, সবাইকে সমান মর্যাদায় দেখতে হবে: আইনমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে, একজনের নাম উল্লেখ করে যা বললেন আসিফ নজরুল
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে, একজনের নাম উল্লেখ করে যা বললেন আসিফ নজরুল
রান্নার সময় মাংস কেন সবুজ হলো, নতুন কারণ জানালেন বিশেষজ্ঞ
রান্নার সময় মাংস কেন সবুজ হলো, নতুন কারণ জানালেন বিশেষজ্ঞ
একটি পুরো দেশের চেয়েও বড় বিশ্বের এই বৃহত্তম বিমানবন্দর
একটি পুরো দেশের চেয়েও বড় বিশ্বের এই বৃহত্তম বিমানবন্দর
সংগৃহীত নামগুলো থেকেই একজন রাষ্ট্রপতি হবেন: বিএনপি নেত্রী
সংগৃহীত নামগুলো থেকেই একজন রাষ্ট্রপতি হবেন: বিএনপি নেত্রী
প্রেমিকার জন্য স্পেনের রাজকন্যাকে কি প্রত্যাখ্যান করেছেন গাভি
প্রেমিকার জন্য স্পেনের রাজকন্যাকে কি প্রত্যাখ্যান করেছেন গাভি