শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংকট চরম রূপ নেয় পানি পাওয়ার জরুরি মুহূর্তে। ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার মতো ২৭টি ঘটনামুখী পরিস্থিতির মধ্যে ১৫টিতেই বাংলাদেশের নির্ধারিত ন্যূনতম হিস্যা নিশ্চিত করেনি ভারত। অর্থাৎ, পানি পাওয়ার সবচেয়ে জরুরি মুহূর্তে ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই চুক্তির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ।
নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (আইএমপিআরআই)-এর সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ‘রিভিজিটিং ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ গঙ্গা ওয়াটার ট্রিটি (১৯৯৬)’ শীর্ষক এই বিশ্লেষণে স্পষ্ট বলা হয়েছে, গঙ্গার পানি নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের বিরোধ নিয়ন্ত্রণে ১৯৯৬ সালের চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শুষ্ক মৌসুমে ভাটির দেশ বাংলাদেশের পানির অধিকার সুনিশ্চিত করতে এটি অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছে।
আইএমপিআরআই গবেষক কিম্বারলি এ থমাসের গবেষণা উদ্ধৃত করে জানায়, নদীতে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক থাকা ও বাংলাদেশে পানির জরুরি চাহিদা না থাকার সময়ে ভারতের ফারাক্কা পয়েন্টে চুক্তি মেনে পানি বণ্টন করা হয়েছে; এমনকি কখনও নির্ধারিতের চেয়ে বেশি পানি ছাড়ার রেকর্ডও রয়েছে। কিন্তু সংকট যখন ঘনীভূত হয়েছে, অর্থাৎ যখন বাংলাদেশে গঙ্গার প্রবাহ কমে গিয়ে পানির হাহাকার সবচেয়ে বেশি ছিল, ঠিক তখনই নির্ধারিত ন্যূনতম পানি মেলেনি।
গবেষণায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে সই হওয়া ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি চুক্তির প্রধান দুর্বলতা ছিল সার্বিক পানি বণ্টনে নয়; বরং সংকটের সময়ে বাংলাদেশের পানি নিশ্চিত করতে না পারায়। আগামী ডিসেম্বরেই শেষ হতে যাচ্ছে তিন দশক মেয়াদি ঐতিহাসিক এই চুক্তির মেয়াদ।
‘ওয়াটার পলিসি’ জার্নালে প্রকাশিত অপর একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতি ১০ দিনের ভিত্তিতে করা ৩০০টি হিসাবের মধ্যে ৩১ শতাংশ সময়েই বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজে প্রত্যাশিত পানি এসে পৌঁছায়নি।
বিশেষ করে ১১ মার্চ থেকে ১০ মে যা চুক্তিতে সবচেয়ে খরা বা সংকটকাল হিসেবে চিহ্নিত ঐ সময়ে পরিস্থিতি ছিল আরও আশঙ্কাজনক। এ সময়ের ১২০টি হিসাবের ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে অর্থাৎ ৫২টি ঘটনায় প্রত্যাশিত পানি পাওয়া যায়নি। এমনকি চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট ৩৫ হাজার কিউসেক পানি নিশ্চিত থাকার কথা ছিল যেসব সময়ে, তার ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে, ৬০টি হিসাবের ৩৯টিতে, হার্ডিঞ্জ ব্রিজে সেই পরিমাণ পানি পৌঁছায়নি।
সংস্থাটির মতে, ফারাক্কা ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মধ্যবর্তী এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত পানি প্রত্যাহার, উপনদীর প্রবাহে পরিবর্তন, নদীর গতিপথ ও নদীর গঠনগত পরিবর্তন এবং পরিমাপ ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার কারণেই মূলত হিসাবের এই বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
আইএমপিআরআই সুপারিশ করেছে, আগামী ডিসেম্বরে চুক্তি নবায়নের সময় কেবল ফারাক্কা থেকে কী পরিমাণ পানি ছাড়া হলো তা না দেখে, বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজে বাস্তবে কতটুকু পানি পৌঁছাল- সেটিকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরতে হবে।
গবেষণাভিত্তিক সংস্থাটি চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে যে প্রধান সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে:
পরিবর্তনশীল বণ্টন ব্যবস্থা: বর্তমান চুক্তিটি ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক পানির প্রবাহ, হালনাগাদ অববাহিকা মডেল ও বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে নতুন চুক্তি সাজাতে হবে।
সংকটকালের স্পষ্ট বিধান: নদীর প্রবাহ ঠিক কতটা কমলে দুই দেশ জরুরি বৈঠকে বসবে, কত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকটে কম পানি কীভাবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টন হবে তা আগেই চুক্তিতে স্পষ্ট করতে হবে।
রিয়েল-টাইম তথ্য ও ডিজিটাল নজরদারি: ফারাক্কা ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টের যৌথ ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার চালু করতে হবে, যেখানে পানিপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও পানি ছাড়ার সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যাবে।
একতরফা প্রকল্প বন্ধ ও পরিবেশ সংরক্ষণ: গঙ্গার প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন কোনও বাঁধ বা অবকাঠামো নির্মাণের আগে যৌথ আলোচনার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে শুধু পানি ভাগ নয়; নদী ব্যবস্থার লবণাক্ততা, মৎস্যসম্পদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পলি পরিবহন ও নৌ-চলাচলের মতো বিষয়গুলো চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
গবেষকরা জানান, আসন্ন চুক্তি নবায়ন যেন শুধু পুরোনো ব্যবস্থার মেয়াদ বাড়ানোর একটি প্রথাগত দলিল না হয়। বরং এটি যেন জলবায়ু পরিবর্তন ও ভাটির দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষার একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা কাঠামো হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।









