যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ইতালির রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে ২৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আটকে আছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টরন্টো-রোম-ঢাকা রুটের বিজি-৩০৬ ফ্লাইট। ফ্লাইটের যাত্রীরা ‘মানবেতর’ জীবনযাপন করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ফ্লাইটের এক যাত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষক ডক্টর মো. জিয়াউর রহমান, যিনি সাইম রানা নামে পরিচিত।
বাংলাদেশ সময় শনিবার (৮ আগস্ট) বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘সর্বত্র নিউজ হচ্ছে যাত্রীদের নিরাপদ হোটেলে রাখা হয়েছে। আর বাস্তবতা হলো সামান্য কয়েকজন কানাডিয়ান পাসপোর্টধারী ব্যতীত দেড় শতাধিক যাত্রী ফিউমিচিনো এয়ারপোর্টের ই১ জোনে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা ধরে বসে আছেন। মাঝে কেউ কেউ ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লাউঞ্জের চেয়ারে-মেঝেতে ঘুমিয়েছেন। এখনও ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় এখানে থাকতে হবে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘বিমান কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীল হলে এখনও আমাদের অ্যাকোমোডেশন দিতে পারতো। কিন্তু তাদের কাউকেই কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। বয়স্কদের ওষুধ শেষ, শিশুদের খাবার শেষ। এরকম মানবেতর অবস্থা রোমের বুকে উদাহরণ হয়ে থাকবে।’
ফ্লাইটটিতে ছিলেন সাবেক ক্রিকেটার সৈয়দ হালিম শাহ ও তার ছেলে জাতীয় দলের ফুটবলার সৈয়দ কাজেম শাহসহ পুরো পরিবার। দীর্ঘ সময় রোম বিমানবন্দরে আটকে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন তারাও।
রোম থেকে সৈয়দ হালিম শাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ফ্লাইটটি রোমে অবতরণের পর দীর্ঘ সময় যাত্রীদের উড়োজাহাজের ভেতরেই অপেক্ষা করতে হয়। প্রায় আট ঘণ্টা তাদের উড়োজাহাজের ভেতরে থাকতে হয়েছে। একপর্যায়ে গরমও অনুভূত হয়।
তিনি বলেন, ‘রোমে তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি। বিমানের গেটও খোলা রাখতে হয়েছে। এসি অল্প কাজ করেছে। অনেকটাই দুর্বিষহ সময় কাটাতে হয়েছে। একপর্যায়ে কেউ কিছু ঠিকমতো জানাতে পারছিল না। পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হতে পারে। সাধারণত এমন কিছু হলে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে জানানোর কথা।’
জরুরি অবতরণের পর উড়োজাহাজটিকে গ্রাউন্ডেড ঘোষণা করা হলে আড়াইশ’র বেশি যাত্রীর সঙ্গে বিড়ম্বনায় পড়েন কাজেমের পরিবারও। পরে হালিম শাহ বলেন, ‘সিদ্ধান্ত হওয়ার পর আমাদের কানাডার নাগরিকত্ব থাকায় রোমের হোটেলে উঠতে পেরেছি। যাদের নেই তারা এয়ারপোর্টেই আছে বলে শুনেছি। তবে পরবর্তী ফ্লাইট কখন এখনও আমরা বিমান বাংলাদেশ থেকে জানতে পারিনি। এ নিয়ে টেনশনে আছি।’
এদিকে ১৪ আগস্ট কাজেমের বিয়ে। ঢাকায় সেই অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়েও চিন্তায় আছেন তার বাবা। কবে দেশে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগ জানায়, কারিগরি ত্রুটি সরানো সাপেক্ষে ফ্লাইটটি বাংলাদেশ সময় শনিবার (৮ আগস্ট) দিবাগত রাত ৩টায় বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবে। এরপর ৯ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৫টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা রয়েছে।
ফ্লাইটটি সচল করতে বিমানের প্রকৌশল বিভাগের একটি দল ইতিমধ্যে রোমের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ১৭ মিনিটে দলটি রোমে অবতরণ করবে।
বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, ভিসা জটিলতায় বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের স্থানীয় ইমিগ্রেশন আইন মেনে টার্মিনালের ভেতরেই প্রয়োজনীয় খাবার, পানি ও দেখভালের চেষ্টা করা হয়েছে। আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য হোটেলে আবাসন, খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র ও মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম জানান, যান্ত্রিক ত্রুটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা হলেও যাত্রীদের নিরাপত্তাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, ‘টরন্টো থেকে ঢাকাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ‘বিজি ৩০৬’ ফ্লাইটটি রোম বিমানবন্দরে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হয়। শতভাগ আকাশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ফ্লাইটটি জরুরি অবতরণ করানো হয়।’
বোসরা ইসলাম বলেন, এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের সাময়িক কষ্ট ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, যার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী, ট্রানজিট ভিসা ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিককে বিমানবন্দরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার। ইতালির কঠোর শেনজেন ভিসা নীতির কারণে বাংলাদেশি ও নেপালি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়নি স্থানীয় ইমিগ্রেশন পুলিশ।
বিমানের পক্ষ থেকে সব যাত্রীর জন্য হোটেলের ব্যবস্থা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি। আইনি বাধা না থাকায় কানাডিয়ান ও ইউরোপীয় পাসপোর্টধারী যাত্রীদের দ্রুত হোটেলে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছে।
বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিজি-৩০৬ ফ্লাইটে ব্যবহৃত উড়োজাহাজটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার। বিমানটি সচল করতে ঢাকা থেকে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী দল এবং প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ দ্রুততম সময়ে রোমে পাঠানো হয়েছে। যাত্রীদের দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলছে।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিয়ম ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে যাত্রীদের সুরক্ষায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কাজ করছে উল্লেখ করে সাময়িক ধৈর্য ও সহযোগিতার জন্য যাত্রীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

রোমে আটকে পড়া যাত্রীদের ভোগান্তি, যা বলছে বিমান কর্তৃপক্ষ







