৪৫ জেলা থেকে পাঁচ শতাধিক সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে জাতীয় কনভেনশন করলো গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য। ‘কন্ঠে মোদের কুন্ঠাবিহীন নিত্যকালের ডাক’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে ১০টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর (জাতীয় নাট্যশাল)-তে শুরু হওয়া এ কনভেনশনে লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
কনভেনশনে আরও অংশ নেন শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিককর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে জাতীয় কনভেনশন উদ্বোধন করেন লেখক ও সাংবাদিক নুরুল কবীর। এরপর সংস্কৃতিকর্মীদের একটি শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপনের সভাপতিত্ব এবং সদস্য সচিব মফিজুর রহমান লালটুর সঞ্চালনায় জাতীয় কনভেনশনের কার্যক্রম শুরু হয় গণসংগীত, কবিতা আবৃত্তি ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের পাহাড়ি নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে।
প্রথম অধিবেশনে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক নুরুল কবীর, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ৬৯ গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও কমিউনিস্ট নেত্রী দীপা দত্ত, বাউলশিল্পী আবুল সরকার, লেখক রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়, কবি মোহন রায়হান এবং নৃত্যশিল্পী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সাজু আহমেদ।
পাশাপাশি গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের অন্তর্ভুক্ত সংগঠনের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য জানান চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের জাকির হোসেন, প্রগতি লেখক সংঘের দীনবন্ধু দাশ, যাত্রা শিল্পী উন্নয়ন পরিষদ এস এম লাভলু, সমাজ চিন্তা ফোরামের পক্ষ থেকে কামাল হোসেন বাদল, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্রের বিমল কান্তিসহ আরও অনেকে।
প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্ববায়ক জামশেদ আনোয়ার তপন সংস্কৃতিকর্মীদের গণঅভ্যুত্থানে কারফিউ ভেঙ্গে গানের মিছিল, দ্রোহযাত্রা সংঘটিত করার বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলেও তার শাসনব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অবসান হয়নি; সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় উগ্রতা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অশুভ ছায়া আজও আমাদের সমাজকে বিপন্ন করছে। এই সংকটকালে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠকে সংগঠিত করে মানুষের মনে প্রত্যয় জাগাতে এবং একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজের পথ নির্মাণের লক্ষ্যে আজ এই জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।”
লেখক ও সাংবাদিক নুরুল কবীর বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের সময়ে ভেতরে থেকেও জীবনের ঝুঁকি নিয়েও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর দেখতে চেয়েছিলান আপনারা, তা আমাদের সবার কাছে হাতছাড়া। ৬৯, ৯০ এবং ২৪’র পর এই একই ঘটনা ঘটেছে। পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখলে এতে আশ্চর্যের কিছু না। যদি আমরা ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ চাই, তবে আমাদের কর্তব্য সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটিয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর ঘটানো।”
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের লড়াইয়ের তাগিদে এই কনভেনশন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরি করে। সাংস্কৃতিক লড়াই সব লড়াইয়ের ভিত্তি। খেয়াল করি আর না করি, এই লড়াই চলছে। এই লড়াই শুধু মাঠে-ময়দানে হয়, তা নয়। এই লড়াই চায়ের দোকানে, পত্রিকায়, ফেসবুকে হয়। এই লড়াই চিন্তার লড়াই, চৈতন্যের লড়াই। অনেক উচ্চশিক্ষিত লোক পাবেন, যারা বলবেন— ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ভালো, বন্দর বিদেশিদের দেওয়া উচিত, ফুলবাড়ি উন্মুক্ত কয়লা তোলা উচিত’— এই বলা একটি দাসত্বের সংস্কৃতি। যারা জনগণের পক্ষে, আধিপত্যে ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, তারাও তো একটা সাংস্কৃতিক অংশ।”
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গান গাওয়ার কারণে কারাবরণ করা বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজ বলেন, “আমি গান করতে পারি। এটাই আমার অস্ত্র। আমি মনে করি সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত আমরা প্রত্যেকেই একটা পরিবার।”
জাতীয় ঐক্য কবিতার পরিষদের কবি মোহন রায়হান রায়হান বলেন, “১৭ বছর ধরে চলে আসা স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আমরা কলম ধরেছি। আজ বর্তমান সরকার যদি বিশেষ গোষ্ঠীকে দলদাস বানাতে চায়, ক্ষমতাকে অন্যায়ভাবে হাতিয়ার পরিণত করতে চায় তবে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য রুখে দাড়াবে। আজকে কনভেনশনে এসে আশ্বস্ত হয়েছি আমরা সেই শক্তি হয়ে উঠতে পারবো।”
কমিউনিস্ট নেত্রী দীপা দত্ত বলেন, “নির্বাচিত সরকারকে পেয়ে আমি ভেবেছি ভালো হয়েছে। কিন্তু যেভাবে চলছে সেখানে গণমানুষের কথাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না।”









