রাষ্ট্রপতির আগে ‘মহামান্য’, প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীর আগে ‘মাননীয়’— দাফতরিক নথিপত্রে এসব সম্মানসূচক শব্দ আর ব্যবহার করা যাবে না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্বোধন থেকে আনুষ্ঠানিক বিশেষণ সরানোর পর এবার সামনে এসেছে আরেক প্রশ্ন। সরকারি দফতরে বহুদিনের ‘স্যার’ ও ‘মহোদয়’ সংস্কৃতির কী হবে?
আইন ও পুরোনো সরকারি নির্দেশনা বলছে, সরকারি কর্মকর্তাকে নাগরিকদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ‘মহোদয়’ এখনও বাংলা দাফতরিক পত্রের প্রচলিত ও স্বীকৃত সম্বোধনের অংশ। ফলে দুটি শব্দের অবস্থানও এক নয়।
গত ৯ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দাফতরিক যোগাযোগ, নথিপত্র ও সারসংক্ষেপে সম্বোধনের ক্ষেত্রে সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে পরিপত্র জারি করে। এতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পদবির আগে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ বা অন্য কোনও সম্মানসূচক শব্দ লিখিতভাবে ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনাটি অনতিবিলম্বে কার্যকর এবং সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীন দফতরের জন্য প্রযোজ্য।
তবে এই পরিপত্র সব সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্বোধন নিয়ে নয়। ফলে সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, মহাপরিচালক বা অন্য কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ‘মহোদয়’ ব্যবহারের চলমান রীতি এতে বাতিল হয়নি।
অপরদিকে কোনও নাগরিক সরকারি কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করতে বাধ্য— এমন সাধারণ আইন বা বিধান নেই। ২০২১ সালে তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনও জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলতেই হবে, এমন কোনও রীতি-নীতি নেই।
সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদেও সম্বোধনের কোনও শব্দ নির্ধারণ করা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সম্পর্কটি মূলত সেবাদাতা প্রশাসন ও সেবাগ্রহীতা নাগরিকের। তারপরও বাস্তবে ‘স্যার’ এমনভাবে প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে যে, অনেক জায়গায় এটি অলিখিত বাধ্যবাধকতার মতো কাজ করে।
সম্বোধনের এ বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৯০ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষের একটি স্মারকে সরকারি চিঠিপত্রে নামের আগে ‘জনাব বা বেগম’ এবং পত্রের শুরুতে ‘মহোদয় বা মহোদয়া’ ব্যবহারের কথা বলা হয়। মৌখিক সম্বোধনে ‘স্যার বা ম্যাডাম’ ব্যবহার করা যেতে পারে বলেও সেখানে উল্লেখ ছিল। ফলে ‘স্যার’ মূলত মৌখিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক রীতি। আর ‘মহোদয়’ দাফতরিক পত্রলেখনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ কারণে ‘স্যার’ সংস্কৃতি বন্ধ করতে কোনও আইন বাতিলের প্রয়োজন নেই। তবে প্রশাসনের সব স্তরে এটি পরিহার করতে চাইলে স্পষ্ট কেন্দ্রীয় নির্দেশনা প্রয়োজন। অন্যদিকে ‘মহোদয়’ বাদ দিতে হলে দাফতরিক পত্রলেখনের পুরোনো রীতি ও নির্দেশনাও সংশোধন করতে হবে।
এর মধ্যেই প্রশাসনের কিছু অংশে ‘স্যার’ ব্যবহারে লাগাম টানার নজির রয়েছে। চলতি বছরের ৬ এপ্রিল কারা অধিদফতরের অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের সই করা এক নির্দেশনায় বলা হয়, ‘‘ইউনিফর্মধারী সদস্যরা সিভিল কর্মচারীদের অযথা ভক্তিসূচক ‘স্যার’ সম্বোধন করবেন না। এর আগে ২০২৫ সালের ১০ জুলাই উপদেষ্টা পরিষদ নারী কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধনের পূর্ববর্তী নির্দেশনা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো জনপ্রশাসনের জন্য এখনও এমন কোনও অভিন্ন কেন্দ্রীয় পরিপত্র জারি হয়নি, যেখানে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ‘স্যার’ বলা যাবে না বলে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ফলে ‘স্যার’ বলা নাগরিকের আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে শব্দটি শক্তভাবে বহাল রয়েছে। আর ‘মহোদয়’ সরাতে হলে শুধু মানসিকতার পরিবর্তন নয়, সরকারি পত্রলেখনের বিধি ও রীতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘স্যার’ সম্বোধন না করলে নাগরিককে বিরূপ আচরণ বা সেবা না দেওয়ার প্রবণতাকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘কাউকে সম্মান করে স্যার বলা নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু এটিকে বাধ্যতামূলক সম্বোধনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই সমস্যা। যে কেউ কাউকে স্যার ডাকতে পারেন। কিন্তু এটাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেন স্যার বলতেই হবে এটা খুবই খারাপ।’
অতীতে সরকারি অফিসে ‘স্যার’ না বলায় সেবাগ্রহীতার সঙ্গে বিরূপ আচরণের বিভিন্ন ঘটনার কথাও বলেন তিনি। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘স্যার না বলার কারণে রিঅ্যাক্ট করা বা সেবা না দেওয়ার মতো ঘটনা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এটাকে যতটা সম্ভব পরিবর্তনের চেষ্টা করবো।’ তবে শুধু আইন বা নির্দেশনা দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান হবে না বলেও মনে করেন তিনি।
তবে এই সংকট দূর করতে শুধু আইন নয়, মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি বলেও মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তার ভাষায়, ‘ধরুন আইন করলেন, স্যার বলা যাবে না। কিন্তু যিনি সেবা দিচ্ছেন, তিনি যদি স্যার না বলায় অসন্তুষ্ট হয়ে সেবার সঙ্গে সেটাকে রিলেট করেন, তাহলে সমস্যা থেকেই যাবে। কাজেই আমাদের মানসিকতারও পরিবর্তন দরকার।’









