কিশোরী মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে সম্পর্ক, তাকে সংসদে চাকরি দেওয়া এবং তার বাবাকে ঠিকাদারি লাইসেন্স করে সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনের অভিযোগ, পরে তাকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি, দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় বহিষ্কার এবং সর্বশেষ মরিয়মের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেফতার ও চার দিনের রিমান্ড—এত কিছুর পরও সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ কীভাবে বহাল থাকে, সেই প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
মরিয়মের মৃত্যু ও এর আগে সেক্সটরশন বা যৌন ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগের নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার বিষয়ে সংসদের মর্যাদা রক্ষায় করণীয় নির্ধারণে স্পিকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে টিআইবি। জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছে সংস্থাটি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী বলা যায় না। তবে দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়া, পদ ও প্রভাব ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলায় গ্রেফতার ও রিমান্ডের পরও একজন সংসদ সদস্যের জবাবদিহির কোনও ব্যবস্থা থাকবে না—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করবে আদালত। কিন্তু সংসদ সদস্যের নৈতিকতা, ক্ষমতার ব্যবহার ও জনগণের আস্থার প্রশ্নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংসদের। তাই গাজী নজরুল ইসলামের সংসদীয় অবস্থান নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট করতে হবে।’
সংবিধানে সংসদ সদস্য পদ হারানোর বিধান
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড হলে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হন। ফলে বর্তমান অভিযোগ, গ্রেফতার, রিমান্ড বা দলীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত নিজে থেকেই গাজী নজরুলের সাংবিধানিক অযোগ্যতা তৈরি করে না।
তবে গুরুতর নৈতিক স্খলন, স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্নকারী আচরণের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্য পদ বাতিল বা আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্ন উঠবে—তা স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে পদ ও প্রভাবের অপব্যবহার এবং বিশেষ করে সেক্সটরশনসহ সব অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
জনপ্রতিনিধিদের আচরণবিধির দাবি
গাজী নজরুলের ঘটনাকে সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের বিভিন্ন অভিযোগ এর আগেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনায় কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষায়িত, পূর্ণাঙ্গ ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি টিআইবির দীর্ঘদিনের। ২০১০ সালে ‘মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট কনডাক্ট বিল, ২০১০’ সংসদে উত্থাপিত হলেও তা আইনে পরিণত হয়নি। প্রস্তাবিত আইনে ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রভাব ব্যবহার না করা, স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং নিয়োগ, পদোন্নতি বা বদলিতে সুপারিশ না করার মতো বিধান ছিল বলে জানান তিনি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ২০২৪-পরবর্তী রাষ্ট্রসংস্কারের প্রস্তাবেও সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক আচরণ আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ‘মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট কনডাক্ট অ্যাক্ট’ প্রণয়নের সুপারিশ করেছে। দুদক সংস্কার কমিশনও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী নিয়মিত হালনাগাদের বিধানসহ আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে, সমাধানের পথও জানা। তারপরও বাস্তবায়নে আগ্রহ নেই কেন—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।’









