প্রাণের উৎসব বইমেলা করোনার প্রকোপে এবার ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শুরু হয়েছে। তবুও স্টল নির্মাণ শেষ হয়নি বেশকিছু প্রকাশনা সংস্থার। প্রতিবছরই এই আয়োজনে প্রথম চার-পাঁচদিন এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। এবারও ব্যতিক্রম ঘটেনি। বুধবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) মেলার দ্বিতীয় দিন দেখা গেছে, এখনও বেশ কয়েকটি স্টল নির্মাণ চলছে। মেলায় আসা পাঠক-দর্শনার্থীদের মন্তব্য, ‘এমন অগোছালো অবস্থা মেলার প্রথম দিকের যেন সাধারণ দৃশ্য!’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকাশকরা উল্লেখ করেন, সময় সংক্ষিপ্ত থাকার কারণে এমন এলোমেলো অবস্থা হয়েছে। তাদের মতে, মেলা নিয়ে আলাদা আয়োজক কমিটি থাকলে শুরুর দিন থেকে শৃঙ্খলা রাখা সম্ভব। তবে এ নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে মতভেদ। প্রকাশকদের আরেক অংশের মন্তব্য, ‘স্টলের নির্মাণের জন্য বাংলা একাডেমির বেঁধে দেওয়া সময় যথেষ্ট ছিল!’
মেলায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সিদ্দিক বাপ্পি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে প্রতিবারই বইমেলায় আসি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, শুরুর কয়েকদিন একটু অগোছালোই থাকে। এ কারণে পাঠকরা চার-পাঁচ দিন পরেই আসতে শুরু করে। তাদের ধারণাই হয়ে গেছে যে, মেলা চার-পাঁচ দিন পর পুরোদমে শুরু হবে। সংশ্লিষ্টরা একটু হাতে সময় নিয়ে আগে থেকে কাজ সম্পন্ন করতে পারলে হয়তো প্রথম দিন থেকেই মেলা জমজমাট হতো।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদের মন্তব্য প্রায় একই, ‘মেলার প্রথম কয়েকদিন অগোছালো অবস্থায় থাকে। মেলা শুরুর আগেই স্টল নির্মাণের কাজ সম্পন্নের জন্য প্রকাশকরা আরেকটু দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারেন। তাহলে প্রথম দিন থেকেই মেলা জমে উঠতে পারে।’
আরেক পাঠক ইমতিয়াজ আহমেদের দৃষ্টিতে, ‘এমন অগোছালো অবস্থা মেলার প্রথম দিকের যেন সাধারণ ব্যাপার! মেলার সৌন্দর্য রক্ষায় শুরুর আগে সব স্টলের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া উচিত। এজন্য প্রকাশক ও বাংলা একাডেমিকে আরও বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।’
মেলার অগোছালো অবস্থা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুঁথি নিলয় প্রকাশনীর বইমেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘করোনার কারণে এবার বইমেলা আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় ছিল, তার ওপর অন্য সমস্যাও আছে। যেমন সকাল থেকে বিদ্যুৎ ছিল না। বাংলা একাডেমি যদি আরেকটু আগে মেলার বিষয়টি নিশ্চিত করতো তাহলে আমরা যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারতাম।’
আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গনির কথায়, ‘বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। এখানে আমরা প্রাণের স্পন্দন পাই। শুধু প্রকাশক নয়, লেখক-পাঠক-সংস্কৃতিকর্মী সবার মিলনমেলা। এ নিয়ে আমরা বরাবরই প্রস্তুত থাকি। তবে গত বছর করোনার কারণে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছি আমরা। প্রকাশকদের জন্য কোনও রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ছিল না। প্রথম পর্যায়ে মেলা ১৫ দিনের জন্য শুরু হয়েছিল। এটাও ঠিক যে, এবারই মনে হয় একটু বেশি অগোছালো অবস্থায় মেলা শুরু হয়েছে। এখনও হাঁটার পথ এবং মাঠ ঠিক হয়নি। এসব নিয়ে ভাবা দরকার।’
বাংলা প্রকাশের প্রধান রহিম শাহ অবশ্য অগোছালো অবস্থার জন্য প্রকাশকদেরই দুষলেন, ‘মেলাটা হঠাৎ শুরু হওয়ায় সবাই স্টলের কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিক। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রকাশকদের দুর্বলতাও থাকতে পারে। আমরা নিজেরা কাজ শেষ না করে বাংলা একাডেমির দোষ দেই। বাংলা একাডেমি আমাদের পাঁচ দিন সময় দিয়েছে, এটা যথেষ্ট ছিল। আশার ব্যাপার হলো, এবার প্রথম দিন থেকে মেলা জমে উঠেছে এবং মানুষ বই কিনছে।’
বইমেলা আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদের দাবি, এর আগে কোনও বইমেলাই এতটা সুন্দর ও গোছানোভাবে শুরু হয়নি। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবার যেভাবে প্রথম দিন থেকে মেলা জমে উঠেছে তা বইমেলার ইতিহাসে আর কখনও হয়নি।’
স্টল নির্মাণ কাজ চলমান প্রসঙ্গে আয়োজক কমিটির সদস্য সচিবের যুক্তি, ‘প্রতিবছর স্টল নির্ধারণে লটারির জন্য আমরা ১৪ দিন সময় পাই, সেখানে এবার সাতদিন দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ৭৭৬টি স্টলের মধ্যে পাঁচ-ছয়টি স্টলের নির্মাণ কাজ বাকি। আশা করছি, আজ রাতের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এছাড়া দুই-একটা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণ করবে কী করবে না তা নিয়ে দোটানায় ছিল।’
বইমেলা নিয়ে আলাদা কমিটি করার দাবি জানিয়েছেন আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী, ‘বাংলা একাডেমি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বইমেলা কিন্তু তাদের তালিকায় নেই। বাংলা একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মূল অর্জন এই মেলা। কিন্তু সেই আলোকে তাদের এদিকে মূল ফোকাস থাকে না। সারাবছর তারা মেলা নিয়ে কোনও কাজ করে না। এজন্য একটা কমিটি রাখতে হবে, যারা সারাবছর এটি নিয়ে ভাববে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও আমরা বইমেলাকে এখনও অগোছালো অবস্থায় দেখছি। মেলাটাকে কীভাবে সুশৃঙ্খল করা যায় তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। মেলায় প্রায় ৭০০’র অধিক প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই অপেশাদারি সংগঠন। আগে আমাদের পেশাদার সংগঠনগুলোকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য বাংলা একাডেমি প্রকাশকদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারে।’
বাংলা প্রকাশের প্রধানের মন্তব্য, ‘মেলা নিয়ে আলাদা একটা কমিটি হয়তো আমাদের দাবি, কিন্তু বাংলা একাডেমি ছাড়া মেলার শৃঙ্খলা রক্ষা কতটা হতো তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’
বইমেলা নিয়ে আলাদা কমিটি করা হবে কিনা জানতে চাইলে ড. জালাল আহমেদ প্রশ্ন রাখেন, ‘বইমেলার ইতিহাসে বাংলা একাডেমি আয়োজনে সফল, তাহলে অন্যদের কেন দায়িত্ব দেওয়া হবে? যদিও প্রতি বছর মেলার শেষ সপ্তাহে প্রকাশকরা দাবি তোলেন, তারা মেলা আয়োজন করবেন। কিন্তু এটা একটা নীতির ব্যাপার। প্রধানমন্ত্রী যদি তাদের দায়িত্ব দেন তাহলে অবশ্যই তারা আয়োজন করবে।’
এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে বইমেলায় স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গতকাল মাস্ক ছাড়া ঘোরার অপরাধে বেশ কয়েকজনকে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। আজ দ্বিতীয় দিনে মাস্ক ব্যবহার বৃদ্ধি পেলেও শতভাগ নিশ্চিত হয়নি। সবাই মাস্ক পরে মেলা চত্বরে প্রবেশ করলেও পরে খুলে ফেলছেন। দর্শনার্থী, পাঠক ও বিক্রয়কর্মী সবার মধ্যে সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। মাস্ক খুলে রাখা একজন দর্শনার্থীর কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি গরম ও শ্বাসকষ্টের অজুহাত দেন।
স্বাস্থবিধি মেনে চলা প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রকাশক বলেন, ‘দেশে করোনা ঠাট্টার বিষয় হয়ে গেছে। কোনও জায়গায় মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানতে চায় না। স্বাস্থবিধি মেনে চলার বিষয়টি আইন করে শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, এটি মানুষের সচেতনতার বিষয়। সবাইকে এক্ষেত্রে নৈতিকভাবে সচেতন থাকা উচিত।’
মেলায় আসা দর্শনার্থীদের করোনা টিকা সনদ বাধ্যতামূলক বলা হলেও কোথাও পরখ করা হচ্ছে না। যদিও বিক্রয়কর্মীদের সবার টিকা সনদ বাংলা একাডেমি জমা নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।








