ঢাকার প্রথম ফুটওভার ব্রিজ যেন সাক্ষীগোপাল

সুবর্ণ আসসাইফ ও আতিক হাসান শুভ
০৫ মে ২০২৩, ১৯:৩৫ আপডেট : ০৫ মে ২০২৩, ২২:৪৮

পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকায় বাংলাবাজার মোড়ে অবস্থিত ফুটওভার ব্রিজটি অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম ফুটওভার ব্রিজ। নির্মাণের পর থেকেই এটি ব্যবহারে মানুষের তেমন আগ্রহ ছিল না। একসময় এটি দিয়ে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অযত্ন-অবহেলাসহ নানামুখী প্রতিবন্ধকতায় পথচারী-শূন্য ব্রিজটি যেন সাক্ষীগোপাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এমনিতেই সদরঘাট ব্যস্ততম এলাকা। এখানে আর কোনও সড়কে ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মানুষ।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, বাংলাবাজার মোড় ব্যস্ত সড়ক হওয়ায় পথচারীদের পারাপারের সুবিধার্থে ১৯৯৬ সালে এই ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করেছিল ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি)। নির্মাণের পর থেকেই এটির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় এটি এখন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। ফলে ভবঘুরেদের দখলে যাওয়া ও চুরি-ছিনতাই ও মাদক সেবনসহ নানা অপকর্মের কারণে ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় মানুষের প্রস্রাব-পায়খানায় সয়লাব হয়ে থাকে।

ব্রিজের দক্ষিণ-পশ্চিম সিঁড়ির মুখে বসানো হয়েছে চা-নাশতার দোকান

সরেজমিনে দেখা যায়, বাংলাবাজার মোড়ের ফুটওভার ব্রিজের চারটি প্রবেশপথ রয়েছে। চারটি প্রবেশপথই ভাসমান দোকানি ও হকারদের দখলে। ফলে কারও জন্য ব্রিজে ওঠার পথ খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। ব্রিজটির দক্ষিণ-পূর্ব সিঁড়ির মুখে রয়েছে পুরনো বইয়ের দোকান, দক্ষিণ-পশ্চিম সিঁড়ির মুখে চা-নাশতার দোকান। উত্তর-পূর্ব সিঁড়ির মুখে চা-দোকান এবং উত্তর-পশ্চিম সিঁড়ির মুখে জুতা, স্যান্ডেল, রকমারি জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেছেন হকাররা। পাশেই সড়কের ওপরে রাখা হয়েছে ময়লার কনটেইনার। আবার কনটেইনারের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আবর্জনা। এর উৎকট গন্ধে চলাচল হয়ে পড়েছে কষ্টদায়ক।

এ ছাড়া ব্রিজের ওপরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ডিশ ও ইন্টারনেটের ক্যাবল। এসব ক্যাবল এমনভাবে টানা হয়েছে ব্রিজের ওপর দিয়ে, এতে একজন মানুষকে মাথা নিচু করে পার হতে হবে। এদিকে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্রিজটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। ফলে যেকোনও সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। ব্রিজের নিচে রয়েছে লেগুনা পরিবহনের স্ট্যান্ড। এর পশ্চিম পাশে ঘোড়ার গাড়ির স্ট্যান্ড। তাই মোড়টিতে সার্বক্ষণিক তীব্র যানজট থাকে।

ওপরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ডিশ ও ইন্টারনেটের ক্যাবল

চিত্তরঞ্জন এভিনিউ, বাংলাবাজার, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও ইসলামপুর রোডের সংযোগস্থল গুরুত্বপূর্ণ মোড়টিতে বানানো হয়েছিল ব্রিজটি। আশপাশে রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার প্রধান ডাক অফিস, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, হিড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, বাংলাবাজার সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ এই এলাকায় যাতায়াত করলেও এই ব্রিজটি ব্যবহারে কারোরই আগ্রহ নেই। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পার হন পথচারীরা।

স্থানীয়রা জানান, ব্রিজটিতে চলাচল না থাকায় দিনদুপুরে চলে মাদক সেবন ও কেনাবেচা। রাতের বেলায় থাকে ভবঘুরেদের দখলে। ব্রিজটির নিচে পুলিশ বক্স থাকলেও মাদকসেবীদের ধরতে পুলিশের নেই কোনও মাথাব্যথা। আশপাশের ব্যবসায়ীরাও মলমূত্রত্যাগের প্রয়োজনে উঠে পড়েন ব্রিজের ওপরে। আর দীর্ঘদিন সংস্কার না করে এটি আর স্বাভাবিক ব্রিজের অবস্থায় নেই। ফলে নাগরিকদের সুবিধার বদলে ব্রিজটি এখন বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ এই এলাকায় যাতায়াত করলেও এই ব্রিজটি ব্যবহারে কারোরই আগ্রহ নেই

পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা মোতালেব হোসেন বলেন, রাজধানীতে সদরঘাট সবচেয়ে ব্যস্ততম একটি এলাকা। ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ততার চাদরে মোড়ানো থাকে এলাকাটি। নৌপথে যাতায়াত ও বাণিজ্যিক কারণে প্রতিদিন লাখো মানুষের চলাচল এখানে। এই এলাকায় চৌরাস্তা পারাপারের জন্য একমাত্র ফুটওভার ব্রিজ এটি। কিন্তু এটি পরিত্যক্ত থাকার কারণে মানুষ সড়ক দিয়ে পার হয়। যে কারণে যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। এতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া দুর্ঘটনা তো আছেই। কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ওভার ব্রিজটি সংস্কার করা।

সদরঘাটের ব্যবসায়ী তানভীর আহমেদ বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অবহেলা ও গাফিলতির কারণে এই ওভার ব্রিজের বেহাল। তা ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় এর ওপরে অনৈতিক ও অপরাধমূলক কাজকর্ম হয়ে থাকে। দ্রুত এর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ ছাড়া সদরঘাটের প্রতিদিনের মূল সমস্যা হলো যানজট। এই ব্রিজটি সংস্কার করা হলে যানজট সমস্যা থেকে সাধারণ মানুষ রেহাই পাবে। যানজট নিরসনে ও সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে সিটি করপোরেশন উচিত দ্রুত এর সংস্কার করা।

ব্রিজটির দক্ষিণ-পূর্ব সিঁড়ির মুখে রয়েছে পুরনো বইয়ের দোকান

ব্রিজের প্রবেশমুখ দখল করে দোকান বসানোর কারণ জানতে চাইলে বইয়ের দোকানি করিম মিয়া বলেন, ওভার ব্রিজে মানুষ তো ওঠে না। এটা তো ব্যবহার করার মতো নাই। তাই দোকান বসিয়েছি। কর্তৃপক্ষ বললে দোকান নিয়ে চলে যাবো।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুর রহমান মিয়াজী বলেন, বাংলাবাজার মোড়ের ফুটওভার ব্রিজটি এখন চোর-মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। আমি নিজেও কয়েকবার গিয়ে ওদের সরিয়ে দিয়েছি। এটি পথচারীদের উপকারে না এসে উল্টো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি ভেঙে ফেলতে হবে। মেয়র মহোদয় এসে দেখে গেছেন। তিনি এটি ভেঙে ফেলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

/এনএআর/
সম্পর্কিত
প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে ঢাকায় ১৬ হাজার পুলিশ: ডিএমপি
একদিনে হামের উপসর্গে আরও একজনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১০১০
অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করে অতিরিক্ত ডিআইজির সেই বাড়িতে কী কী হতো
সর্বশেষ খবর
সৌদিতে নিহত ওমরাহযাত্রীর পরিবারের দায়িত্ব নিলেন ধর্মমন্ত্রী, দেশে ফিরলেন ৩৩ যাত্রী
সৌদিতে নিহত ওমরাহযাত্রীর পরিবারের দায়িত্ব নিলেন ধর্মমন্ত্রী, দেশে ফিরলেন ৩৩ যাত্রী
১৬০ রানেই শেষ বাংলাদেশ
১৬০ রানেই শেষ বাংলাদেশ
অবশেষে ‘জিনের বাদশাকে’ ধরলো পিবিআই
অবশেষে ‘জিনের বাদশাকে’ ধরলো পিবিআই
হোয়াটসঅ্যাপের ছবি-ভিডিওতে স্টোরেজ শেষ? যেভাবে বন্ধ করবেন অটো ডাউনলোড
হোয়াটসঅ্যাপের ছবি-ভিডিওতে স্টোরেজ শেষ? যেভাবে বন্ধ করবেন অটো ডাউনলোড
সর্বাধিক পঠিত
পুলিশের সেই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে যা বললেন জামায়াত আমির
পুলিশের সেই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে যা বললেন জামায়াত আমির
প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে চেয়ে প্রত্যাহার রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার
প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে চেয়ে প্রত্যাহার রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার
স্থানীয় নির্বাচনে কেমন প্রার্থী বেছে নিতে হবে, সাফ জানিয়ে দিলেন তারেক রহমান
স্থানীয় নির্বাচনে কেমন প্রার্থী বেছে নিতে হবে, সাফ জানিয়ে দিলেন তারেক রহমান
ডিভি লটারি ২০২৭: আবেদন শুরু হচ্ছে কবে?
ডিভি লটারি ২০২৭: আবেদন শুরু হচ্ছে কবে?
প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রবাসী ছেলের ঘরে ঠাঁই হলো ৮৫ বছরের বৃদ্ধা মায়ের
প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রবাসী ছেলের ঘরে ঠাঁই হলো ৮৫ বছরের বৃদ্ধা মায়ের