ইসিতে অভিযোগ অসংখ্য, ব্যবস্থা হাতে গোনা

এমরান হোসাইন শেখ
১২ মে ২০১৬, ২১:৩১আপডেট : ১২ মে ২০১৬, ২১:৩৯

নির্বাচনি সহিংসতা চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যত অভিযোগ জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি), সে তুলনায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সামান্যই। জানা গেছে,  প্রতিদিনই ইসির পত্রগ্রহণ ও বিতরণ শাখায় শত শত অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই নির্বাচনের দিন প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্টু আচরণ, ভোটে কারচুপি বা জোর জবরদস্তি করে পরাজিত করার অভিযোগ। আর এই অভিযোগকারীদের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীরাও রয়েছেন।
ইসিতে জমা পড়া অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশ কিছু অভিযোগ পড়েছে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় ভোটের আগে। এ সব অভিযোগে এলাকায় প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের দ্বারা ভয়ভীতি দেখানো, হামলা, ভাঙচুর ইত্যাদি।  অভিযোগকারীরা ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে কমিশনে অনুরোধ করেন। এ সব অভিযোগের মধ্যে হাতেগোনা দুই-একটি বাদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কমিশন কোনও ‘কার্যকর’ ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ইসি ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই  সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভোটের সময় ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতা দেখা গেছে।

গত ৭ মে অনুষ্ঠিত চতুর্থ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে (ইউপি) নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চর আড়ালিয়া ইউনিয়নের দু’টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে শতভাগ। এ ইউপির অন্য দু’টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে যথাক্রমে ৯৯ দশমিক ৯০ শতাংশ ও ৯৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। এই ইউপির বাকি ৫টি কেন্দ্রে মোটামুটি ৭৫ থেকে ৭৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। শতভাগ ও তার কাছাকাছি ভোটপড়া কেন্দ্রগুলোকে মৃত ও প্রবাসীদের ভোটও কাস্ট হয়েছে। ওই ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানের বুধবার কমিশনে জমা দেওয়া অভিযোগে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

আরও পড়তে পারেন: ১৪ বিলে রাষ্ট্রপতির সম্মতি

লিখিত অভিযোগে হাসানুজ্জামান দাবি করেন, স্বাভাবিক হারে ভোটপড়া কেন্দ্রগুলোর হিসেবে তিনি নৌকা প্রতীকের চেয়ে ২ হাজার ২ ভোটে এগিয়ে থাকলেও অস্বাভাবিক ভোট পড়া কেন্দ্রগুলোর ভোট যোগ হওয়ার পর তিনি ১ হাজার ৭৬৩ ভোটে হেরেছেন। এই ৪টি কেন্দ্রে প্রদত্ত ৩ হাজার ৮১৫ ভোটের মধ্যে ধানের শীষ পেয়েছে মাত্র ৩টি। অন্যদিকে, নৌকা পায় ৩ হাজার ৭৬৮টি।

নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জমা দিয়ে হাসানুজ্জামান বিষয়টিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় দাবি করেন, পাঁচটি কেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ হয়েছে। কিন্তু চারটি কেন্দ্র দখল করে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে তাকে হারানো হয়েছে।

হাসানুজ্জামানের লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, উল্লিখিত ৪টি কেন্দ্র যে দখল হয়ে যাবে, সে বিষয়ে নির্বাচনের আগেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছিল। একই বিষয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, র‌্যাব, বিজিবি, জেলা প্রশাসক, জেলা নির্বাচন অফিসকে লিখিতভাবে অবহিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কেউই তার আবেদনে সাড়া দেয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

অভিযোগে তিনি ভোট গৃহীত হয়েছে এমন অর্ধশতাধিক মৃত, বিদেশে অবস্থান করা ও অন্য এলাকায় নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা ভোটারের নাম ও নম্বর উল্লেখ করেন।

বৃহস্পতিবার নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার পচাঁগাও ইউনিয়নের ধানের শীষ প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী আলমগীর হোসেনও প্রায় একই ধরনের অভিযোগ কমিশনে জমা দিয়েছেন। অভিযোগে তিনি কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট, তার এজেন্ট বের করে দেওয়া ও ভয়ভীতি দেখিয়ে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। নির্বাচনের আগেও এ ধরনের আশঙ্কা করে তিনি কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব দফতরে আবেদন জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন। এই প্রার্থী ওই ইউপিতে পুনর্নির্বাচনের দাবি করেন।

নরসিংদীর চর আড়ালিয়া ও নোয়াখালীর পাঁচ গাওয়ের মত গত ৪ ধাপে অনুষ্ঠিত ২ হাজার ৬৬৯টি ইউপির অনেকগুলোতেই এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। যার অনেকগুলোর বিষয়ে লিখিত অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে জমা পড়েছে। অনেকে মাঠ পর্যায়ের নির্বাচনি কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেছেন। কেউ কেউ আবার অভিযোগে প্রতিকারের সম্ভাবনা না দেখে নিশ্চুপ হয়ে গেছেন।

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার ৬ নম্বর সদর ইউনিয়নের একজন সাধারণ সদস্যপ্রার্থী সোহেল রানা। তিনি অভিযোগ করেন তার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ১ হাজার ৪৫৩ ভোটারের মধ্যে ৫৩ জন মৃত। বাকিদের মধ্যে ৭ জন নির্বাচনি দায়িত্বে ইউপি’র বাইরে ছিলেন। প্রবাসেও রয়েছেন কয়েকজন। কিন্তু গত ৩১ মার্চের নির্বাচনে ওই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ দেখানো হয়েছে মোট ১ হাজার ৪২২ জন। তিনি দাবি করেন, তার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. আব্দুল হালিম ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য প্রার্থী আইয়ুব আলীর সমর্থকরা কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টকে বের করে দিয়ে ভোট ভাগ ভাটোয়ারা করে নিয়েছেন।

আরও পড়তে পারেন: জঙ্গিরা জাল বিছাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কমিশন প্রথমে জমা পড়া সবগুলো অভিযোগ আমলে নিয়ে গেজেট প্রকাশের আগে বিষয়টি তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কমিশনে অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে যওয়ায় ওই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে শুধু তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগগুলো আমলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে কোনও অভিযোগকেই আর আমলে নেওয়া হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত কমিশনের আসা অভিযোগের মধ্যে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজান নগর ইউপির একটি কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে সেখানে পুনঃভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে কমিশন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে কিছু ইউপির ভোট স্থগিত করেছে। কয়েকটির তফসিল পরিবর্তন করেছে বা কিছু নির্বাচনি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করেছে।

নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালায় কতিপয় ক্ষেত্রে কমিশনকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে ৯০ ধারায় বলা হয়েছে, আইন ও বিধান অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রের নির্বাচন নিরপেক্ষ, ন্যায়সঙ্গত ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি, ক্ষমতা প্রয়োগ এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য আদেশ দিতে পারবেন। তারা বলেন, গেজেট প্রকাশের পর অভিযোগ আমলে নেওয়ার আর কোনও সুযোগ থাকে না। তবে গেজেট প্রকাশের আগে কমিশন চাইলে মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করতে পারে। ২০১১ সালের নির্বাচনে প্রায় অর্ধশত ইউপিতে জুডিশিয়াল ও প্রশাসনিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে কমিশনের কর্মকর্তারা জানান।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঢালাওভাবে সব অভিযোগকে আমলে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে, কোনও অভিযোগ যৌক্তিক মনে করলে সেটা কমিশন সেটা অবশ্যই আমলে নিয়ে থাকে। আর অভিযোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচনি ট্র্যাইব্যুনাল রয়েছে। সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে যেতে পারেন।

নরসিংদীর চর আড়ালিয়া ইউনিয়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতে কমিশন বৃহস্পতিবার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান ইসি সচিব। তিনি বলেন, কমিশন আপাতত এই ইউপির গেজেট প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঘটনাটি খতিয়ে দেখে কমিশন এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে বলে তিনি জানান।

নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, সব অভিযোগ আমলে নেওয়া কমিশনের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কিছু কিছু অভিযোগ তারা আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

 

আরও পড়তে পারেন: নিজামীর জানাজা নিয়ে ‘জনপ্রিয়তা’র প্রচারণা!

নির্বাচনে কোনও কেন্দ্র শতভাগ ভোট পড়াকে অস্বাভাবিক মেনে করেন এই কমিশনার। তিনি বলেন, কোনও একটি কেন্দ্রের সব ভোট কাস্ট হবে, এটা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদের পরে অনেকে মারা গেছেন। কেউ কেউ দেশের বাইরে চলে গেছেন। তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের কোনও সুযোগ নেই।

এর আগে পৌরসভা নির্বাচনের যশোরে একটি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়লেও কমিশন শেষ পর্যন্ত সেটাকে আমলে নেয়নি বলে জানা গেছে।

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম