সব রেকর্ড ভাঙার ইউপি নির্বাচন

এমরান হোসাইন শেখ
২৭ মে ২০১৬, ২২:৫৯আপডেট : ২৭ মে ২০১৬, ২৩:৩২

ইউপি নির্বাচন ২০১৬ স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) এবারের নির্বাচনে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। সহিংসতা, প্রাণহানি ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সব ক্ষেত্রেই বিগত সব ইউপি নির্বাচনকে হার মানিয়েছে। সেই সঙ্গে প্রথমবারের মতো দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের অনেকগুলো ইউপিতে প্রার্থী দিতে না পারারও ঘটনা দেখা গেছে। সংসদের বাইরের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ ইউপিতে কোনও প্রার্থী দিতে পারেনি।
সহিংসতাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রের এই রেকর্ডকে অনেকটা ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের দাবি, অতীতের ধারাবাহিতায়ই এগুলো ঘটেছে। তবে প্রথমবারের মতো দলীয়ভিত্তিতে এবারের ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারণে কোনও কোনও ক্ষেত্রে অতীতের তুলনায় বাড়াবাড়ি হয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ১১ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনি সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৮২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে প্রায় আট হাজার। বেসরকারি সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক ‘সুজন’ দাবি করেছে, বুধবার পর্যন্ত নির্বাচনি সহিংসতায় ১০১ জন নিহত হয়েছেন। সুজনের দাবি, নিহতদের মধ্যে ৬৩ জনই মারা গেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষের কারণে।

বিভাগভিত্তিক প্রাণহানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে- ঢাকা বিভাগে ২২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯ জন, বরিশাল বিভাগে ১৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৬ জন, খুলনা বিভাগে ১৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯ জন, রংপুর বিভাগে ৫ জন এবং সিলেট বিভাগে ১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

দলগত পরিচয়ে দেখা যায়, বিদ্রোহীসহ আওয়ামী লীগের ৫২ জন, বিএনপির ২ জন, জাতীয় পার্টির (জেপি) ১ জন, জনসংহতি সমিতির ১ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ২ জন, মেম্বার প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ৩১ জন এবং ১২ জন সাধারণ মানুষ। নিহতদের মধ্যে নির্বাচনপূর্ব সংঘর্ষে ৪৫ জন, নির্বাচনকালীন সংঘর্ষে ৩৬ জন এবং নির্বাচনোত্তর সংঘর্ষে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আরও পড়ুন: বগুড়ায় ১৭৩ কেন্দ্রের মধ্যে ৬৯টি ঝুঁকিপূর্ণ

এদিকে অতীতের নির্বাচন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার আমলে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোনও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। একইভাবে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ ও এইচএম এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে কোনও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রথম আমলে ১৯৯২ সালের নির্বাচনেও কোনও প্রাণহানি হয়নি।

এর আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রাণহানির রেকর্ড ছিলো এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৮ সালে। ওই নির্বাচনে ৮০ জন নিহত হয়। দেশের ইতিহাসে এ নির্বাচন সবচেয়ে ‘খারাপ’ নির্বাচন হিসেবে পরিচিত ছিলো। এরপর ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগের আমলে ৩১ জন, ২০০৩ সালে বিএনপির আমলে ২৩ জন এবং ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের আমলে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে।

সেই হিসাবে অতীতের যে কোনও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেকর্ড
সহিংসতার মত এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ারও রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার অনুষ্ঠিত পঞ্চম ধাপের নির্বাচন পর্যন্ত ১৯২ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। ষষ্ঠ ধাপে এখন পর্যন্ত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৮ জন নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে ৬ ধাপে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ২১০ জনে। নির্বাচন কমিশন থেকে আনুষ্ঠানিক তথ্য এলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে।

এবার প্রথম ধাপে ৭১২ ইউপিতে ৫৪ জন, দ্বিতীয় ধাপে ৬৩৯টিতে ৩৪ জন, তৃতীয় ধাপে ৬১৫টিতে ২৯ জন, চতুর্থ ধাপে ৭০৩টিতে ৩৩ জন ও পঞ্চম ধাপে ৭২০ ইউপিতে ৪২ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে- বিনা ভোটে নির্বাচিত ২১০ জনের মধ্যে সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী।

কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, অতীতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড ছিলো ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে। এরশাদ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ওই ইউপি নির্বাচনে ১০০ জন চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এরপর ইউপি নির্বাচনে বিনা ভোটে জয়ের সংখ্যা তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। ১৯৯২ সালের ইউপি নির্বাচনে ৪ জন, ১৯৯৭ সালে ৩৭ জন, ২০০৩ সালে ৩৪ জন বিনাভোটে নির্বাচিত হন।। ২০১১ সালের নির্বাচনে এই সংখ্যা দুই অঙ্কে পৌঁছেনি বলে ওই সময় দায়িত্বে থাকা ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন: রাজশাহীর দুর্গাপুরে ৬৪ কেন্দ্রের ৫৩টি ঝুঁকিপূর্ণ

প্রথমবারের মতো দলীয়ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ১৩ শতাংশ ইউপিতে বিএনপি কোনও প্রার্থী দিতে পারেনি। সর্বশেষ তথ্য মতে, ৬ ধাপে ৪ হাজার একশ’র মতো ইউপির মধ্যে ৫৩৮টিতে বিএনপির কোনও প্রার্থী নেই। অবশ্য সুজনের তথ্য মতে, ৫৫৪টি ইউপিতে দলটির কোনও প্রার্থী ছিল না। দলটি প্রথম ধাপে ১১৯টি, দ্বিতীয় ধাপে ৭৯টি, তৃতীয় ধাপে ৮১টি, চতুর্থ ধাপে ১০৬টি ও পঞ্চম ধাপে ১০০টিতে কোনও প্রার্থী ছিলো না। ষষ্ঠ ধাপেও ৫৩ ইউপিতে দলটির কোনও প্রার্থী নেই।

ফলাফলে আওয়ামী লীগের পাল্লা ভারী
রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বরাবরই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্বাচনে দল দুটির মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা দেখা গেলেও এবারের ইউপি নির্বাচনে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বলা যায়, আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা অনেকটা একতরফা বিজয়ী হয়েছেন। নির্বাচনের প্রথম ৪ ধাপে আওয়ামী লীগ এক হাজার ৮৩৬ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছে। সেখানে বিএনপি জিতেছে মাত্র ২৪৩টিতে। এর বাইরে ৫২৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ সমর্থিত।

চার ধাপের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রথম ধাপের আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান হয়েছেন ৪৯৪ জন ও বিএনপির ৫০ জন। দ্বিতীয় ধাপে আওয়ামী লীগের ৪১৯ জন ও বিএনপির ৬৩ জন। তৃতীয় ধাপের ভোটে আওয়ামী লীগের ৩৬৬ জন ও বিএনপির ৬০ জন এবং চতুর্থ ধাপে আওয়ামী লীগের ৪০৫ জন ও বিএনপির ৭০ জন বিজয়ী হয়েছেন।

এবারের নির্বাচনের বিষয়ে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে আমাদের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছি। আমাদের মতে এবারের নির্বাচনটা হয়েছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার, সহিংসতা-হতাহতের আর জোর জবদস্তির। এবারের নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতা আগের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। এই নির্বাচন কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’

দলীয়ভিত্তিতে নির্বাচন হওয়ার কারণে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটেছে বলে মন করেন সুজন সম্পাদক।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এর জন্য নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা রয়েছে। তারা মুখে ব্যবস্থার কথা বললেও কার্যত সেটা দেখা যায়নি।’

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমাদের চেষ্টার কোনও ত্রুটি ছিলো না। তবে প্রথমবারের দলীয়ভিত্তিতে নির্বাচন হওয়ার কারণে অনিয়মসহ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের অসহিষ্ণুতার কারণে সহিংসতা এবার কিছুটা বেড়েছে। তবে সহিংসতা এবারই প্রথম হয়েছে এমনটি নয়, অতীতেও আমরা দেখেছি। অবশ্য এবারের মাত্রা ও কৌশলটা অন্যবারের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ছিলো বলতে পারেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই দাবি করবো নির্বাচন ভালো হয়েছে। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হলে আরও ভালো হতো।’

আরও পড়ুন: ‘পকেট হেড মাস্টার হতে পারিনি বলেই মন জয় করতে পারিনি’/এজে/আপ-এমও

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু 
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু 
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম