X
রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
২১ মাঘ ১৪২৯
একান্ত সাক্ষাৎকারে বেলিয়া সভাপতি ইমদাদ উর রহমান

লিফটের মান নির্ধারণ ও তদারকি করার সরকারি কোনও সংস্থা নেই

রাশেদুল হাসান
১২ নভেম্বর ২০২২, ১৯:৩০আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২২, ২০:৩০

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বিকাশের কারণে রাজধানীর পর বিভাগীয় ও জেলা শহরে সুউচ্চ ভবন ও স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। এগুলো ব্যবহারের জন্য লিফট ও এস্কেলেটর হচ্ছে একটি অত্যাবশকীয় পণ্য। তাই দেশে ভবন ব্যবসার পাশাপাশি লিফট ব্যবসাটিও বাড়ছে। যদিও এটি বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। এ ব্যবসার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ এলিভেটেড এস্কেলেটর অ্যান্ড লিফট ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেলিয়া) সভাপতি ইমদাদ উর রহমান।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশে লিফট ও এস্কেলেটরের ব্যবসা কেমন চলছে?

ইমদাদ উর রহমান : ডলার সংকটের কারণে অনেক দিন ধরেই ব্যবসায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। আর আমরা তারও কিছু আগ থেকে সমস্যার মধ্যে ছিলাম। এলসি মার্জিনের একটা ইস্যু ছিল। আগে আমরা ব্যাংকের সঙ্গে ৫ বা ১০ বা ২০ ভাগে এলসি খুলতে পারতাম। সংকট শুরু হওয়ার পর মার্জিন বাড়িয়ে দেওয়া হলো ৫ ভাগ থেকে ক্ষেত্রবিশেষে শতভাগ। এ কারণেই ব্যবসায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। আমরা একটি পণ্য বিক্রি করার পর আমদানি করি। বিক্রির পর যে টাকা পাই, তা ২০ থেকে ৩০ ভাগ হয়। আবার ২০ থেকে ৩০ ভাগ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে শতভাগ মার্জিনে এলসি খোলা অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব হয় না।

প্রতিবার আমদানিতে একটি বিশাল অঙ্কের টাকা লগ্নি করতে হয়। পরে আবার আমাদের পেমেন্ট পেতেও ঝামেলা হয়। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে বিক্রি নিয়ে শিথিলতার মধ্যে ছিলাম।

বাংলা ট্রিবিউন: অর্থনৈতিক সংকটে কি প্রভাব পড়ছে আপনাদের ব্যবসায়?

ইমদাদ: প্রতিদিন ডলার দাম উঠতো। নামার ক্ষেত্রটা ছিল খুবই কম। আমরা এ ডলারের দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলাম না। আজ ১০৫ টাকা দরে একটি লিফট বিক্রি করলে এলসি খুলতে গিয়ে দেখি দাম হয়ে গেছে ১১০ টাকা। চারদিক থেকেই আমাদের ওপর একটা চাপ ছিল।

অতিসম্প্রতি আমরা এলসি থ্রো করতে পারছি না। ডলারের সংকটে আমাদের ব্যবসা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। দেশের রিজার্ভের অবস্থা হুমকির মুখে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সারা দেশ আজ পর্যুদস্ত। সেটার একটা প্রভাব তো আছেই।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশে এখন লিফটের ক্রেতাসংখ্যা কেমন?

ইমদাদ: এসব সংকটের কারণে এ মুহূর্তে ক্রেতা অনেক কম। যেহেতু আমরা সম্ভাব্য একটি দুর্ভিক্ষের সামনে আছি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের আগেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি সবাইকে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। বোধ করি সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে উন্নয়নকাজটাও এখন আস্তে-ধীরে হচ্ছে। যে কারণে আমাদের কেনাবেচায় মন্থর গতি চলে এসেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশে লিফটের গুণগত মান ও নিরাপত্তা বিষয় তদারকি করার জন্য কোনও সংস্থা আছে কি?

ইমদাদ: আমরা যদি কোনও কারখানা থেকে একটি পণ্য কিনে আনি, সে পণ্যটি অবশ্যই সব রকম সেফটি সিকিউরিটি বজায় রেখেই তৈরি করা হয়। কারণ প্রতিটা নির্মাণকারীকে প্রতিটি অংশ তৈরি করার জন্য আলাদাভাবে লাইসেন্স নিতে হয়। যেমন লিফটের গতি, সক্ষমতা ও উচ্চতার জন্য আলাদাভাবে লাইসেন্স নিতে হয়। এত লাইসেন্স পাওয়া খুব সহজ নয়। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে লাইসেন্সগুলো নিতে হয়। তা ছাড়া কোনও কারখানা স্বেচ্ছায় নিম্নমানের সামগ্রী নির্মাণ করে না।

আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। খুব উঁচু মানের প্রতিষ্ঠানও যেমন আছে, মধ্য ও নিম্নমানেরও আছে। আর আমাদের দেশে আরেকটা সেগমেন্ট চালু হয়েছে। এ যাত্রাটাকে আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু পদ্ধতির ক্ষেত্রে আমার কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। সেটা হচ্ছে আমরা লিফটের বিভিন্ন অংশ কিনে এনে এখানে বিক্রি করছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তারা লিফটের অংশগুলো আমদানি করে।

এ দেশের কিছু ক্রেতা আছে, যারা যন্ত্রগুলো এসেম্বল করে চালিয়ে দিচ্ছে। এতে দোষের কিছু নেই কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণটা হচ্ছে এগুলো করতে গিয়ে আমরা মানের সঙ্গে আপস করছি। এটা আমাদের দেশে করা খুবই সহজ। দেশে এগুলো দেখার জন্য কোনও সরকারি সংস্থা নেই, যারা লিফটের মান নির্ধারণ করবে ও তদারকি করবে।

বাংলা ট্রিবিউন: রাজউক কি তদারকি করে না?

ইমদাদ: বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় এটা সম্পর্কে বলা আছে, সেই বলাটি যথেষ্ট নয়। আমাদের দেশে এ ধরনের রেগুলেটরি বডি থাকার এটাই মোক্ষম সময়। লিফটের বাজারের আকার এখন অনেক বড়। আমরা এখন সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করছি।

আটজনের সক্ষমতার একটি লিফট ছয় তলা বা ১০ তলা ভবনের ক্ষেত্রে যেমন হবে, ২০ তলা ভবনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। এই কারিগরি পার্থক্যগুলো নির্ধারণ করা ও এগুলো অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, এটা দেখার জন্যই একটি রেগুলেটরি বডি থাকা অত্যাবশ্যক।

২০২১ সালের নভেম্বরে ‘এ’ ক্লাস অর্গানাইজেশন হিসেবে আমাদের সংগঠনটির লাইসেন্স পাই সরকারের কাছ থেকে। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা এবং একটি রেগুলেটরি বডিকে সক্রিয় করা। যে রেগুলেটরি বডি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করবে ও দিকনির্দেশনা দেবে; যাতে ভুলভ্রান্তি ও ব্যত্যয়গুলো নিরসন করে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়।

বাংলা ট্রিবিউন: তদারককারী সংস্থার কেমন সক্ষমতা দরকার?

ইমদাদ: আমাদের পণ্যটি দেখতে সাধারণ মনে হয়। কিন্তু এটি কয়েকটি প্রকৌশল কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানে ইলেকট্রনিকস, ইলেট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কিছু কাজ রয়েছে। প্রতিটি অংশের কাজের জন্য বিশেষ বিশেষ দক্ষতার বিষয় আছে। এ বিষয়ে তদারকি করতে গেলে ওই সংস্থাকে এ বিষয়ে সার্বিকভাবে দক্ষ হতে হবে। আমরা যারা এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, সবার এ সক্ষমতাগুলো আছে।

এ ধরনের সংস্থা না থাকা মানে মানের সঙ্গে আপস হচ্ছে। নকশা, গুণগত মান ও ভোক্তার নিরাপত্তা নিয়ে আপস হচ্ছে। যেমন ধরুন একটি ছয়তলা ভবনে লিফট বসাতে গেলে গাইড রেলের যে স্পেসিফিকেশন হবে, একই সক্ষমতার একটি লিফট যদি আমি একটি ১৫ তলা ভবনে লাগাই, তাহলে আমার স্পেসিফিকেশনটা ভিন্ন হবে। ২০ তলার জন্যও আলাদা হবে। আবার এটার গতিরও সম্পর্ক আছে। এক মিটার প্রতি সেকেন্ড গতির জন্য যেটা লাগাবো, দুই মিটারের জন্য যন্ত্রাংশগুলো ভিন্ন হবে। প্রতিটার সঙ্গে প্রতিটা জড়িত। একটা গাইড রেলে যদি মানের ক্ষেত্রে আপস হয়ে যায়, এর সঙ্গে আরও ৬ থেকে ৭ অংশ জড়িত, সেখানেও আপস হবে। বিশ্বের বহু দেশে এ রেগুলেটরি বডি আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: কয়টি ধাপে তদারকি কাজ হয়?

ইমদাদ: তিনটি ক্ষেত্রে তদারকি দরকার। আমরা যে লিফটি বিক্রি করছি, সেখানে কী কী জিনিস কীভাবে থাকা দরকার আর সেটা সেভাবে আছে কি না। পরে এটা যখন বসানো হয়, এর মান তদারকি করা দরকার। কারণ লিফট যতই ভালো হোক, এটা সঠিকভাবে বসানো না হলে ভালো সেবা দেবে না।

লিফট যখন চলে, প্রতিবছর এটি কী অবস্থায় আছে এ জন্য রিভেলডেট করা দরকার। আমরা যারা রক্ষণাবেক্ষণ করি, ক্রেতারা আমাদের সঠিকভাবে সহযোগিতা করছেন কি না, এটাও দেখা দরকার। ক্রেতাদেরও এ ব্যাপারে ভূমিকা থাকতে হবে। আমাদের পাশের দেশ ভারতের আটটি অঙ্গরাজ্যে একটি লিফট কিনতে গেলেও লাইসেন্স লাগে।

বাংলা ট্রিবিউন: বিদ্যুৎ সংকট কোনও প্রভাব ফেলছে?

ইমদাদ: এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। একটি হাইরাইজ ভবনে একটি লিফট অচল হয়ে যাওয়া মানে প্রত্যেকের জন্য ভোগান্তি। কিন্তু আমাদের বিদ্যুতের দাম বেশি। বিদ্যুতের সমস্যা এই শিল্পে প্রভাব ফেলছে। বেশি দাম দিয়ে বিদ্যুৎ কিনলেও আমাদের ব্যবসা চলবে। কিন্তু একেবারে না থাকলে তো সমস্যা।

বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশ কি শুধু আমদানি করছে? উৎপাদন করছে না কেউ?

ইমদাদ: দেশের ভেতরে বড় দুটি কোম্পানি উৎপাদন শুরু করেছে প্রাণ-আরএফএল এবং ওয়ালটন। এটা একটা ভালো দিক। নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি হওয়া দরকার। ধীরে ধীরে যেহেতু আমরা লিফট তৈরি করছি, ভবিষ্যতে তাই গুণগত স্ট্যান্ডাডারাইজেশন ও রেগুলেটরি বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

/এনএআর/
সর্বশেষ খবর
সর্বকালের সেরা বলিউড ছবির পথে ‘পাঠান’
সর্বকালের সেরা বলিউড ছবির পথে ‘পাঠান’
‘কাগজের মূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষের বই কিনতে কষ্ট হচ্ছে’
‘কাগজের মূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষের বই কিনতে কষ্ট হচ্ছে’
আজকের নির্বাচিত বই
অমর একুশে গ্রন্থমেলাআজকের নির্বাচিত বই
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়াম উদ্বোধনের আগেই ভাড়া
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়াম উদ্বোধনের আগেই ভাড়া
সর্বাধিক পঠিত
দিনদুপুরে তালা ভেঙে ব্যাংক থেকে ৪ লাখ টাকা লুট
দিনদুপুরে তালা ভেঙে ব্যাংক থেকে ৪ লাখ টাকা লুট
ক্রাইম প্যাট্রল থেকে কৌশল শিখে ৫ কিশোরের এক রোমহর্ষক কিলিং মিশন
ক্রাইম প্যাট্রল থেকে কৌশল শিখে ৫ কিশোরের এক রোমহর্ষক কিলিং মিশন
শাকিব ও জোভান প্রসঙ্গে মুখ খুললেন পূজা!
শাকিব ও জোভান প্রসঙ্গে মুখ খুললেন পূজা!
রডের টন লাখ ছুঁই ছুঁই
রডের টন লাখ ছুঁই ছুঁই
‘পুরো ইউক্রেন পুড়বে’
‘পুরো ইউক্রেন পুড়বে’