সংসদের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানির পরর্ব্তী তারিখ সোমবার নির্ধারণ করা হয়েছে। রবিবার তৃতীয় দিনের মতো রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যের পর এ বিষয়ে আরও শুনানির জন্য এ তারিখ নির্ধারণ করেছেন এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ।
বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রবিবার রাষ্ট্রপক্ষে লিখিত যুক্ততর্ক উপস্থাপন করা হয়।
শুনানি শেষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা সাংবাদিকদের বলেন, আমি আদালতে বলেছি, বর্তমান মামলাটি কোনোভাবেই পাবলিক ইন্টারেস্টের জায়গা থেকে নয়। আমি এও বলেছি, ১০ জজের যে মামলাটি ছিল, সেটিও একজনের ইন্টারেস্টের মাধ্যমে করেছিল। পরবর্তীকালে সমস্ত জজ এসেও ‘সংক্ষুব্ধ’ হিসেবে পার্টি হয়েছিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে তারা যখন আপিল বিভাগে গিয়েছিলেন, আপিল বিভাগ মনে করলেন, সুপারসিট হতে পারে, তাই তারাও গিয়ে সংক্ষুব্ধ পক্ষ হয়েছিলেন। অতএব এই কেসেও যদি কেউ নিজেকে সংক্ষুব্ধ মনে করেন, তাহলে তাদের সঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের জজরাও মনে করতে পারেন। কিন্তু বর্তমান মামলাটি কোনোভাবেই পাবলিক ইন্টারেস্টের হতে পারে না। এটিই ছিল আমার বক্তব্য।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা সাংবাদিকদের আরও বলেন, ‘আজ আদালতে আমার মূল বক্তব্য ছিল এই রিট পিটিশনটাই মেইনটেনেবল নয়। কারণ ইতোপূর্বে ১৮ বিএলসিতে আপিল বিভাগ গাইডলাইন দিয়ে নির্দেশান দিয়েছেন যে, কোন বিষয়গুলো জনস্বার্থ হতে পারে। কোন কোন বিষয় হতে পারে না তা বলে দিয়েছেন। সে হিসেবে এটি কোন অবস্থায়ই পাবলিক ইন্টারেস্টের আওতায় পড়ে না। আমরা দেখিয়েছি আদালত যে প্যারামিটার দিয়েছেন তার আওতায় এটি কোনও অবস্থায় হতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগ আপিল বিভাগের রায় খণ্ডন করেছেন। হাইকোর্ট বিভাগ আপিল বিভাগের সমস্ত রায় মানতে বাধ্য। এছাড়া বলেছি এ মামলাটি প্রিম্যাচিউর। এখানে একটি আইন পাস করার কথা ছিল, সেটিও করা হয়নি। উদাহরণ দিয়ে আমি বলেছি ‘যে শিশুটির জন্মই হয়নি, সেটাকে গলাটিপে মেরে ফেলার প্রয়াস চালানো হয়েছে এ মামলা করে। সংবিধানের ৯৬ ধারা সংবিধান প্রণেতারা প্রথম থেকেই রেখেছেন। মাঝখানে মার্শাল ল অথরিটি বেআইনিভাবে ক্ষমতা দখল করেছে। তারাই এ সংবিধানকে বিকৃত করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল প্রবিশন ঢুকিয়েছেন। ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বরং আমরা সংবিধানের মূল জায়গায় ফিরে গিয়েছি। এটা মূল সংবিধানের অংশই ছিল। এতে সংবিধানের ব্যাসিক স্ট্রাকচারের কোনও পরিবর্তন হয়নি।’
উল্লেখ্য, গত ৮ মে পেপার বুক থেকে রায় পড়ার মাধ্যমে এই মামলার আপিল শুনানি শুরু হয়। ৯ মে দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি হয়। এ দুদিন রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে পড়ে শোনান। এরপর ওইদিনই আদালতে চারজন অ্যামিকাস কিউরি তাদের লিখিত অভিমত জমা দেন। এই চারজন হলেন সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম, এম আই ফারুকী ও আবদুল ওয়াদুদ ভূইয়া। ওইদিনই আদালত ২১ মে শুনানির পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেছিলেন।
এর আগে ৮ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় আপিল শুনানিতে সহায়তার জন্য ১২ জন সিনিয়র আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেন আপিল বিভাগ। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ১২ আইনজীবী হচ্ছেন- বিচারপতি টিএইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, এ এফ হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, এ জে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, ফিদা এম কামাল, ব্যারিস্টার আজমালুল কিউসি, আবদুল ওয়াদুদ ভূইয়া ও এম আই ফারুকী।
প্রসঙ্গত, বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা পুনরায় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস করা হয়। এরপর তা ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এ অবস্থায় সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ৯জন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
এ আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট ওই সংশোধনী কেন অবৈধ, বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। এ রুলের ওপর শুনানি শেষে গত ৫মে আদালত সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের অভিমতের ভিত্তিতে ১৬তম সংশোধনী অবৈধ বলে রায় দেন। তিন বিচারকের মধ্যে একজন রিট আবেদনটি খারিজ করেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে পরে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে।
/এমটি/ইউআই/ এমএনএইচ/







