দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সদস্যরা নিহত ও আটক হওয়ার পর অনেকটা অগোছালো হয়ে পড়লেও থেমে নেই জঙ্গি কার্যক্রম। দাওয়াতের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্য সামনে রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে তারা। এজন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক সভা করেছে সংগঠনটির সদস্যরা। গত ১২ এপ্রিল বগুড়ার সোনাতলায় জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের একটি দাওয়াতী সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১০ জুন) গ্রেফতার হওয়া সারোয়ার-তামিম গ্রুপের দাওয়াতী শাখার শুরা সদস্য গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক ইমরানের কাছ থেকে র্যাব কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানতে পেরেছেন।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘তারা মূলত দাওয়াতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, দাওয়াতী কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে।’ র্যাবের এই মুখপাত্র বলেন, ‘বগুড়ার সোনাতলায় জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের যে দাওয়াতী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে বিভিন্ন জেলার সক্রিয় ৩০-৩৫ জন সদস্য অংশ নেয়। এই সম্মেলনে শায়খ আইয়ুবকে আমির নির্বাচিত করে ১০ সদস্যের একটি দাওয়াতী শুরা বোর্ড গঠন করা হয়। সে কুরআন সুন্নাহ একাডেমির খতিব। এছাড়া, নায়েবে আমির নির্বাচিত হয় শায়খ এনামুল। মূলত তার বাসাতেই অনুষ্ঠিত হয়েছে সম্মেলনটি।’
র্যাবের ভাষ্য, জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের বর্তমান আমির আবু মুয়ারেব। আগের আমিরদের তুলনায় একটু ভিন্ন পথে হাঁটছে সে। সারোয়ার-তামিম গ্রুপের বিভিন্ন শাখা প্রধানের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। আমির ও শাখা প্রধানদের মধ্যে কাজের সমন্বয় করে থাকে সাজিদ নামে এক যুবক। সে সাংগঠনিকভাবে সমন্বয়ক ও সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে পরিচিত। ‘সানজিদ’ আর ‘লালভাই’ নামেও সে পরিচিত। র্যাব জানায়, ১২ এপ্রিলের সম্মেলনে যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলো অনুমোদনের জন্য সমন্বয়ক সাজিদের মাধ্যমে আমির আবু মুয়ারেবের কাছেও পাঠানো হয়।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পরই জানা যায়, জেএমবির মূলধারাসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা একত্রিত হয়ে সারোয়ার-তামিম গ্রুপ তৈরি করে। এই গ্রুপটিই গুলশান ও শোলাকিয়ায় নাশকতা চালায়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের ফলে এই গ্রুপের দলনেতাসহ অধিকাংশ শীর্ষ সক্রিয় সদস্য নিহত হয়েছে, দলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য গ্রেফতারও হয়েছে। এ কারণে সংগঠনের সদস্য বাড়ানোর জন্য আরও বেশি দাওয়াতের ওপর গুরুত্বারোপ করছে এই গ্রুপ।
র্যাব সূত্র জানায়, জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপে বেশ কয়েকটি শাখায় ভাগ হয়ে কাজ করছে। এগুলো হলো— দাওয়াতী শাখা, সামরিক শাখা, অর্থ শাখা, মিডিয়া শাখা ও আইটি শাখা। এছাড়াও গ্রুপটির সাংগঠনিক কাঠামোতে রয়েছে আরও দু’টি বোর্ড— শরিয়াহ বোর্ড ও আলেম বোর্ড। জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপে কেন্দ্রীয় আমীর নিজে অন্তরালে থেকে একজন বিশ্বস্ত সমন্বয়কারীর মাধ্যমে সংগঠনের সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকে। সাধারণত সামরিক শাখার আমীরই কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করে থাকে। এছাড়া, উইং বা শাখাগুলোর প্রধানরা কেন্দ্রীয় আমীরের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করে।
র্যাবের একজন কর্মকর্তা জানান, ধারাবাহিক অভিযানে কোণঠাসা হওয়া সারোয়ার-তামিম গ্রুপ নতুন করে সংগঠিত হওয়ার জন্য কাজ করছে। এ কারণে অন্যান্য শাখার চাইতে তারা দাওয়াতী শাখার কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। নতুন সদস্য সংগ্রহ করে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করে অন্যান্য শাখা, বিশেষ করে সামরিক শাখার কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা করছে।
উল্লেখ্য, শনিবার রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকা থেকে সন্দেহভাজন জঙ্গি হিসেবে ইমরান আহমেদ (৩৭) ও শামীম মিয়া নামে দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। র্যাবের দাবি, তাদের কাছ থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ জঙ্গিবাদী বই, কম্পিউটার ও অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া ইমরান কেন্দ্রীয় দাওয়াত বিষয়ক কমিটির শুরা সদস্য এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিমের (গুলশান-বনানী-মিরপুর) দাওয়াতী শাখার আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে বলে দাবি র্যাবের। ঢাকা মহানগর ছাড়াও সে চট্টগ্রাম বগুড়া, কুমিল্লা, কক্সবাজার ও রাজশাহীসহ ১০টি জেলার দাওয়াতী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। সে বর্তমানে গাজীপুরের জিম টেক্স লিংকেস ইন্ড্রাস্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
র্যাবের পক্ষ থেকে যাদের সারোয়ার-তামিম গ্রুপ বলা হচ্ছে, পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট তাদের বলছে নিও জেএমবি। কাউন্টার টেররিজমের দাবি, নিও জেএমবির বর্তমান আমির আইয়ুব বাচ্চু নামে এক ব্যক্তি।
/এনএল/টিআর/জেএইচ/








