রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন এবং ভারতকে নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে বাংলাদেশকে। এ সমস্যার সামরিক সমাধান খোঁজার অহেতুক উদ্দীপনা থেকে দূরে থেকে বাংলাদেশকে কৌশলী হতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের অধিকার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের কমিটিতে আলোচনার প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারলে সমাধানের পথে চলা দ্রুত ও সহজ হতো।’
বৃহস্পতিবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন একাধিক সাবেক রাষ্ট্রদূত, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাবেক বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। মতবিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল ইনস্টিটিউট অফ কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সারমর্ম উপস্থাপন করেন আই ক্যাডসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জমির।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা আমাদের না হলেও সৃষ্ট এই বিপদ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত নয়। দুই দেশের (বাংলাদেশ-মিয়ানমার) সর্ম্পকের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস জরুরি। একই সঙ্গে পারস্পরিক শঙ্কার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে শঙ্কামুক্ত করার কৌশলও যৌথভাবে খুঁজতে হবে।’
একইসঙ্গে তারা বলেন, ‘মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নিজেদের দেশের নাগরিক বলে স্বীকার করে না, কিন্তু তারাও মিয়ানমারের নাগরিক।’
আই ক্যাডসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জমির বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যাকে জাতিগত দিক থেকে দেখলে চলবে না, এটি মানবাধিকারের বিষয়। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কফি আনান প্রতিবেদন বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে।’
অনুষ্ঠানে বক্তারা, কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকারকে সহানুভূতি ও মানবিক দিক থেকে দেখেও সংকটের সমাধান করার কথাও বলেন।
অনুষ্ঠানে আই ক্যাডসের নির্বাহী পরিচালক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মো আবদুর রশীদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিক স্বীকৃতি এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে অন্তত ইসলামিক দেশাগুলোর সম্মেলন হওয়া উচিত। বাংলাদেশ এ সময়ে রোহিঙ্গা সংকটে আবর্তিত। এটি একটি জাতীয় ও মানবতার বিপর্যয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে সেটা বাংলাদেশের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়, এখানে কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।’
অনুষ্ঠানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা আজকের নয়, কিন্তু আজ রোহিঙ্গাদের জঙ্গি সম্পৃক্ততার সঙ্গে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার আমরাও একসময় অন্য দেশে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন কী আমাদেরও জঙ্গি বলা হয়েছিল।’
রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়টিকে খুব বেশি সরলীকরণ করে দেখার অবকাশ নেই জানিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত আশফাকুর রহমান বলেন, ‘অনেক বেশি কৌশলী হতে হবে আমাদের।’
অপরদিকে বিষয়টিকে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘একইসঙ্গে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনেরও বিপর্যয়। তাই একে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে মোকাবিলা করতে হবে। কারণ মিয়ানমার সেনাবাহিনী যা করছে সেটা গণহত্যা। তাই অবশ্যই মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তবে এ ক্ষেত্রে ভারত ও চীনকে পাশে পেতে হবে।’
সাংবাদিক শ্যামল দত্ত অনুষ্ঠানে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের স্পষ্ট কোনও নীতিমালা নেই। ভারত ও চীনকে সঙ্গে নিয়ে এবং অবশ্যই আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলি সিকদার, সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস, সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবীর, সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, অভিবাসন শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর প্রমুখ।







