রায়েরবাজার বধ্যভূমি এখন যেমন

শাহেদ শফিক
১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৭:৫০আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ১২:৫২

 

রায়েরবাজর বধ্যভূমিতে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ রায়েরবাজার। এক সময় এই এলাকার নাম শুনলে রাজধানীর ঢাকার সব মানুষের গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠতো। স্বাধীনতার পরবর্তী এক দশকে রাতের বেলা দূরের কথা, দিনেও মানুষ সেখানে চলাচল করতো ভয়ে ভয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা দেশের সূর্য সন্তানসহ অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে এই এলাকার ইটভাটাগুলোতে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই বিভীষিকাময় চিত্র যখন একে একে উন্মুক্ত হতে থাকলো আতঙ্ক আর ভয়ে গা কাঁটা দিয়ে উঠতো রাজধানীবাসীর। রায়েরবাজারের বধ্যভূমির চারদিকে পাওয়া যেত মানুষের খুলি আর হাড়গোড়। এরপর ধীরে ধীরে পাল্টে গেছে সেখানকার জনজীবনের চিত্র। পাল্টে গেছে রায়েরবাজারও। মুক্তিযুদ্ধের সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এখানে নির্মাণ করা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় স্মৃতিসৌধ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতার সময় এই স্থানটিতে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে হত্যার স্থানটি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল অরক্ষিত-অবহেলিত। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানটি সংরক্ষণ করে তাতে একটি স্মৃতিসৌধসহ বড় কবরস্থান নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।  

তিন একর জায়গার ওপর ১৯৯৯ সালে রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ শেষ হলেও সৌধের পেছনের বিশাল অংশ বেদখল ছিল। এর ঠিক পেছনের অংশসহ পুরো এলাকা ছিল আবর্জনায় ভর্তি। এটি সরকারি খাসজমি হলেও বিভিন্ন সময়ে দখলদাররা তাদের নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছেন। সৌধের পেছনে বড়-বড় স্থাপনা নির্মাণের কাজও শুরু করেন তাদের অনেকেই। তবে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলে স্মৃতিসৌধের মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটতো। এ কারণে সরকার পুরোজমি অধিগ্রহণ করে সেখানে কবরস্থান নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।

রায়ের বাজার বধ্যভূমিতের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ

গত মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের জুলাই মাসে ‘রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ-সংলগ্ন কবরস্থান উন্নয়ন প্রকল্প’ নামের একটি প্রকল্প হাতে নেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৪ স্বতন্ত্র ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের ৫-আর ই ব্যাটালিয়নকে। এতে খরচ হয় ৫৪৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

৯৬ দশমিক ২৩ একর জমির ওপর নির্মিত মূল কবরস্থানের ভূমির পরিমাণ ৮১ দশমিক ৩০ একর। প্রকল্পে কবরস্থান ছাড়াও ভেতরে রয়েছে দু’টি দৃষ্টিনন্দন লেক, দু’টি মসজিদ, জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য পাঁচ একর জায়গা, ৬ দশমিক ১৩ একর জমিতে র‌্যাবের একটি কার্যালয় রয়েছে। এছাড়া এ কবরস্থানে সাত হাজার ২০ বর্গমিটার নামাজের স্থান ও মরদেহ রাখার ঘর, চার হাজার ৭১৭ মিটার সীমানা প্রাচীর, এক দশমিক ৮০ কিলোমিটার রাস্তা, ১০ দশমিক ১৩ কিলোমিটার হাঁটার পথ, এক দশমিক ৯১ কিলোমিটার পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং ১৪২ দশমিক ৮৬ বর্গমিটার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। কবরস্থানে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি ফটক।। এতে ছোট-বড় এক লাখ ২০ হাজার মানুষকে দাফন করা যাবে।

বিস্তীর্ণ কবরস্থানটি ১৬টি ব্লকে বিভক্ত। এর মাঝপথ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বেশ কিছু সরু পাকা রাস্তা। এর ভেতর দিয়ে বয়ে চলা লেকের ওপর তিনটি সংযোগ সেতু রয়েছে। এতে শিশু ও ভিআইপিদের কবরের জন্য আলাদা জায়গা রাখা হয়েছে। রয়েছে বাতির ব্যবস্থাও। আছে নানা জাতের ফুলের বাগান। কবরস্থানের লেকে রয়েছের সামনে নির্মাণ করা হচ্ছে চার লেনের সড়ক।  

রায়েরবাজার বধ্যভূমি শহীদ স্মৃতিসৌধের লেক

কবস্থানটির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মী মো. আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রায়েরবাজার কবরস্থানটির এলাকায় আগে মানুষের চলাচলে ভয় ছিল। এখন কবরস্থান নির্মাণের কারণে অত্যন্ত সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে কয়জন সদস্য রয়েছেন, তা পর্যাপ্ত নয়। সংখ্যা আরও বাড়ানো দরকার।’

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিছুদিন আগেও এই এলাকায় হাট ছিল আতঙ্কের বিষয়। দুর্গন্ধে এর আশপাশে হাঁটা যেতো না। বধ্যভূমির পুরো এলাকা বেদখল ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে প্রকল্প গ্রহণ করে পুরো এলাকা সংরক্ষণ করেছে সরকার। এর নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে। পুরো এলাকা অত্যন্ত সুন্দর ও আধুনিক স্থাপত্যে পরিণত করা হয়েছে। এখানে এখন মানুষ ঘুরতে আসে। প্রকল্পের ভেতরে ঢুকলে মন জুড়িয়ে যায়।’

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

 

/এমএনএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে