নারীদের পলিসিস্টিক ওভারিয়ন সিনড্রম রোধে সচেতনতা জরুরি

Send
তাসকিনা ইয়াসমিন
প্রকাশিত : ০৭:৫৯, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫১, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৮

 

 

‘পলিসিস্টিক ওভারিয়ন সিনড্রমদেশে নারীদের মধ্যে হরমোনজনিত রোগ ‘পলিসিস্টিক ওভারিয়ন সিনড্রম (পিসিওএস)’ ব্যাপক হারে বাড়ছে। এই রোগ প্রতিরোধে এখনই সচেতন হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও পরিবেশের কারণে এই রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শরীরে অপ্রয়োজনে লোম বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ব্রণ, ওজন বৃদ্ধি প্রতিরোধ করা না গেলে নারীরা বন্ধ্যাত্ব, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন জাহান বলেন, ‘পিসিওএস-এর  সমস্যা যেকোনও বয়সের নারীর হতে পারে। তবে আমরা রিপ্রোডাক্টিভ বয়সটাকে (১৫-৪২ বছর) প্রাধান্য ধরে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করি। এ রোগের সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ এখনও নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হয়, মূলত ‘পরিবেশগত’ ও ‘বংশগত’ কারণে এসব রোগ হয়ে থাকে। এছাড়া খাদ্যাভ্যাস, আচরণ, ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বিবাহিত নারীর গর্ভধারণে সমস্যা সৃষ্টি ও ঘন ঘন গর্ভপাতের কারণে এই হরমোনজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন নারীরা।’

বিএসএমএমইউ’র এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক এম এ হাসানাত বলেন, ‘এসব রোগে আক্রান্ত হলে টেস্টোটেরন, থাইরয়েড টিএসএইচ, স্টিমুলেটিং হরমোনের সমস্যা দেখা দেয়। ফলে জরায়ু বড় হয়ে যাওয়া, ছোট ছোট সিস্ট দেখা দেয়, ঘাড়ে, বগলে, হাঁটুর ভাঁজে কালো দাগ দেখা যায়। জরায়ুতে কতগুলো হরমোনের তারতম্য ঘটে। এ সময় লিউটেনাইজিং হরমোনের (এলএইচ) বেড়ে যায় এবং ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন (এফএসএইচ) কমে যায়, যা মাসিক হওয়া এবং ডিম্বাণু পরিস্ফুটনে বাধা দেয়। ফলে সন্তান ধারণ করা সম্ভব হয় না।’

এই রোগের গবেষণার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিএসএমএমইউ’র এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ থেকে পাঁচ শতাধিক রোগীর ওপর এ বিষয়ে গবেষণা চালানো হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের অনুমানের তুলনায় এই রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রায় ৫০-৭০ শতাংশ নারীর মধ্যে এ সমস্যা পাওয়া গেছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সারাদেশে সব মিলিয়ে এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্টের সংখ্যা প্রায় ১৫০ জন। দেশের সব মেডিক্যাল কলেজেই এই রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিএসএমএমইউতে পর্যায়ক্রমে বেশ কয়েকজন চিকিৎসক এই বিষয়ে কাজ করছেন। তারা রোগীদের হরমোনাল অ্যাসপেক্ট, রোগীদের ওপর ওষুধের প্রভাব, এর উপকারিতা-অপকারিতা ও চিকিৎসা পরবর্তী অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। এগুলো নিয়ে কাজ করছেন ডা. শারমিন জাহান, ডা. তাছনিয়া হক ও ডা. হুর জাহান বানু (উর্মি)।’

এ বিষয়ে ডা. সাদিয়া জাহান ও ডা. হুর জাহান বানু (উর্মি) বলেন, ‘একটা সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে, মাসিক অনিয়মিত হলে, ঋতুচক্রের সমস্যা হলে, গর্ভধারণের সমস্যা হলে গাইনোকলজিস্টের কাছে যেতে হবে। কিন্তু এগুলো আসলে হরমোনজনিত রোগ। মুখে বেশি লোম উঠলে হরমোন বিশেষজ্ঞ এবং চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। যদি কারও ঋতুচক্রের সমস্যা ও গর্ভধারণের সমস্যা হয় এবং চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ভালো না হন, তাহলে অবশ্যই এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের কাছে যেতে হবে।’

তারা আরও বলেন,  ‘প্রত্যেক নারীর ওজন নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যে থাকতে হবে, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কিছু প্রসেস আছে যাদের শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হয়ে যায়। তাদের শরীরে যেন ইনসুলিন কাজ করতে পারে সে ব্যবস্থা করা। এজন্য আমরা মেডফরমিন দেই। অনেক রোগী মনে করেন, এটা ডায়াবেটিসের ওষুধ। কিন্তু ডায়াবেটিসের জন্য আমরা এই ওষুধ দেই না, এটা রোগীর ইনসুলিন ঠিক করার জন্য দেওয়া হয়। এছাড়া আমরা বিভিন্ন জন্মবিরতীকরণ পিল দেই। এটা নিয়ে রোগীরা ভাবেন—কেন অবিবাহিত নারীকে এই ওষুধ দেওয়া হলো? কিন্তু ওই পিল এক্ষেত্রে ব্যবহার করা জরুরি। আসলে আমরা ফোরথ জেনারেশন পিল দেই, যেগুলোতে ওজন বাড়ে না। কিছু ঘরোয়া পদ্ধতিতেও লোম তোলার ব্যবস্থা আছে। সেগুলো প্রয়োগ করা যেতে পারে। সেটারও আমরা অনুমতি দেই। রোগীরা মনে করেন, মুখের লোম একেবারে তুলে ফেললে আর হবে না, এ ধারণাটা ঠিক না।’

ডা. সাদিয়া জাহান  বলেন, ‘যখন এই রোগে আক্রান্ত নারীরা গর্ভধারণের কথা চিন্তা করেন, তখন তাদের গর্ভপাতের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই আগে থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। ঋতুচক্রের সমস্যা, মাসিক অনিয়মিত হওয়া—এগুলো গাইনি সমস্যা। তাই তারা প্রথমে গাইনি চিকিৎসকের কাছে যান। অনেকে ভুল করে আয়ুর্বেদ, হারবাল, হোমিও চিকিৎসকের কাছে যান। এসব ক্ষেত্রে রোগটা বাড়লে আমাদের কাছে আসেন। এটা করে রোগীর ক্ষতি হয়ে বেশি। হরমোনের সমস্যাজনিত রোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে হবে।’

অধ্যাপক হাসানাত চিকিৎসার বিষয়ে বলেন, ‘স্পেসিফিক ট্রিটমেন্ট হচ্ছে কনট্রাসেপটিভ পিল দেওয়া। যেটা নিয়মিত মাসিক হতে সহায়তা করে।’

ডা. সাদিয়া জাহান বলেন, ‘যদি স্বাস্থ্যগতভাবে আরেকটু সচেতন হওয়া যায়, ওজন নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং শারীরিক পরিশ্রম বাড়ানো যায়—তাহলে এই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হয়। তাই রোগীকে শারীরিক পরিশ্রম করানোর পাশাপাশি প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল খেতে দেওয়া উচিত। মিষ্টি জাতীয় খাদ্য পরিহার করে ওজন ও উচ্চতার অনুপাত স্বাভাবিক রাখা উচিত।’

আরও পড়ুন:
চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা দূর করতে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ

/এসএনএইচ/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ