মুজিববর্ষে কোনও আয়োজন নেই কওমি মাদ্রাসায়

Send
সালমান তারেক শাকিল ও চৌধুরী আকবর হোসেন
প্রকাশিত : ২৩:০৯, মার্চ ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৪৯, মার্চ ০৮, ২০২০

কওমি মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘আল হাইআতুল উলয়া লি-জামিয়াতিল কওমিয়্যািহ এবং বেফাক

আগামী ১৭ মার্চ থেকে শুরু হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উৎসব। রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিববর্ষ ঘোষণা দিয়ে পুরো বছরটিকে উদযাপন করা হচ্ছে আড়ম্বরভাবে। সরকারি অন্যসব প্রতিষ্ঠানের মতো সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। তবে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতাকে কেন্দ্র করে এই উদযাপন নিয়ে কোনও পরিকল্পনা নেই কওমি মাদ্রাসাগুলোর। এমনকি কওমি মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরকারি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ‘আল-হাইআতুল উলয়া লি-জামিআতিল কওমিয়্যাহ’রও কোনও কর্মসূচি নেই। কওমি মাদ্রাসার শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন দায়িত্বশীল আলেমের সঙ্গে আলাপকালে এ বিষয়গুলো উঠে আসে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের যুগ্ম মহাসচিব ও রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহফুযূল হক বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে মুজিববর্ষ পালনে আমাদের কোনও নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আমাদেরও নিজস্ব কোনও কর্মসূচি নেই।

তবে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন আলেম বলছেন, ইসলামি ধর্মমতে কোনও ব্যক্তির জন্মদিন পালনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর এ কারণে দেওবন্দি আদর্শের আলেমরা নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)- এর জন্মদিন পালন থেকেও বিরত থাকেন। সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী উদযাপনের কোনও সুযোগ নেই কওমি মাদ্রাসায়।

অন্যদিকে, ঢাকার একাধিক প্রভাবশালী আলেম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে ‘বিব্রতবোধ’ করেছেন।ধর্মভিত্তিক একটি দলের অন্যতম নেতা ও ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসার ওই শিক্ষক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘এ ধরনের প্রশ্নে বিব্রতবোধ করছি।আমি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’

ঢাকার অন্যতম শীর্ষ আরেক আলেমের প্রেস সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জন্মশতবার্ষিকী তো জন্মদিবস সংশ্লিষ্ট, কওমি আলেমরা রাসুল (সা.)-এর জন্মবার্ষিকীও পালন করেন না।’ যদিও বিভিন্ন সময়ে প্রয়াত শীর্ষ আলেমদের স্মরণে দোয়া ও আলোচনা অনুষ্ঠান করেছে ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনগুলো।

তবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোনও-কোনও ইসলামী বিশেষজ্ঞ বলছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জন্য আলোচনা সভার আয়োজন ও তার আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া মাহফিল করার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে।

আল-হাইআতুল উলয়া লি-জামিআতিল কওমিয়্যাহ’র সদস্য ও শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আয়োজন থাকা জরুরি বলে মনে করি। যারা বাংলাদেশ স্বীকার করেন, তারা বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করবেন কীভাবে। ব্যক্তি হিসেবে নয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে তার জন্য দোয়া ও আলোচনা সভা করা যেতেই পারে। তিনি জানান, আল-হাইআতুল উলয়া লি-জামিআতিল কওমিয়্যাহ এখন পর্যন্ত মুজিববর্ষ নিয়ে কোনও আলোচনা করেনি।

আল-হাইআতুল উলয়া লি-জামিআতিল কওমিয়্যাহ’র আরেক সদস্য মাওলানা রুহুল আমীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উলয়ায় এটা নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, মুজিববর্ষে কোনও আয়োজন রাখা দরকার।’ এ বিষয়ে আল-হাইআতুল উলয়া লি-জামিআতিল কওমিয়্যাহ ‘র কো-চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুছের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

দেশের প্রবীণ এক আলেম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, মৌলিকভাবে বাংলাদেশের কওমি আলেমরা একাত্তরের আগে-পরে পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন ছিলেন। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হওয়া আলেমদের সংখ্যা খুবই কম। মুক্তিযুদ্ধের সময় সক্রিয় বিরোধিতা না করলেও ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাদের অনুরাগ ছিল কম। পাকিস্তান সৃষ্টির পর যখন বাংলায় আন্দোলন-কর্মসূচি চলছিল, তখনও যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে গিয়ে মুসলিম লীগের হয়ে কাজ করেছেন দেশের প্রভাবশালী আলেমরা। এ বিষয়ে অভিজ্ঞতার কথা বঙ্গবন্ধু নিজেও তার কারাগারের রোজনামচায় উল্লেখ করেছেন। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের হয়ে কাজ করেছেন কয়েকজন প্রভাবশালী আলেম।

শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ জানান,দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রাজ্ঞ আলেমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রয়াত মুফতি নূরুল্লাহ, মালিবাগ মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল মাওলানা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ, মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদীসহ অনেকে। এছাড়া মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ দেওবন্দে শিক্ষিত আলেম এবং ‘৫৬ সাল থেকে ’৬৭ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতিও ছিলেন।

শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আলেমদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কের বিষয়ে কিছু বিষয় তো প্রকাশ্যেই আছে। বিশেষ করে জাতির জনককে হত্যার পর জোরেশোরেই প্রতিবাদ করেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রয়াত মুফতি নূরুল্লাহ। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরদিন জুমার নামাজের খুতবায় এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেন মুফতি নূরুল্লাহ। ওই জুমায় তার ছেলে মুফতি কেফায়েত উল্লাহও ছিলেন।

শনিবার রাতে মুফতি কেফায়েত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মুফতি নূরুল্লাহ সাহেব জুমার খুতবার আগে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর কেউ তার ব্যাপারে কথা বলছে না, কিন্তু আমি এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, কোরআন-হাদিসের দলিল অনুযায়ী এই মানুষটি মুসলমান। তার জন্য কেউ দোয়া না করলেও আমি করবো।’

এ ঘটনা ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামে মসজিদে জুমার নামাজের সময়ের বলে জানান মুফতি কেফায়েত উল্লাহ। তিনি বলেন, আব্বা বলেছিলেন, ‘আমার ধারণামতে তিনি (বঙ্গবন্ধু) মজলুম এবং শহীদ।’ তিনি এটার দলিল দিয়েছিলেন তিনটি। ১৫ আগস্টে যখন বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন, সেটা ছিল জুমার রাত (বৃহস্পতিবার দিবাগত)।  জুমার রাতে মারা যাওয়ায় এটাও বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের একটা কারণ। দুই নম্বর ব্যাপার হলো, তিনি ঘুমন্ত ছিলেন। এটাও হুকমান শহীদ। তিন নম্বর বঙ্গবন্ধু আততায়ীর হাতে মারা গেছেন, সে হিসেবেও তিনি শহীদ। তার ঘরের ভেতরে আক্রমণ করে মারা হয়েছে। আমি সে জুমায় উপস্থিত ছিলাম। আমরাও এই কথার ওপর এখনও আছি। আমরা মরহুম শেখ মুজিব সাহেবকে শহীদ মনে করি।’

মুফতি নূরুল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইউনূছিয়ার প্রিন্সিপাল ও প্রধান মুফতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন।

মুজিববর্ষের কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে আল -হাইআতুল উলয়া লি-জামিআতিল কওমিয়্যাহ’র সদস্য ও বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সহ-সভাপতি মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু বলেন, ‘উলয়ার পক্ষ থেকে কোনও নির্দেশনা নেই। তবে সিলেটে আমার জানামতে  কিছু মাদ্রাসায় স্বাধীনতার স্থপতির জন্য দোয়া করা হচ্ছে, কোরআন খতম করা হচ্ছে। আমার কাছে কিছু মাদ্রাসায় এ ধরনের আয়োজনের খবর এসেছে।’

 

 আরও পড়ুন: কতটা বদলেছে কওমি মাদ্রাসা?

যেমন আছেন আলেম মুক্তিযোদ্ধারা

 

 

/এমআর/টিএন/

লাইভ

টপ