হাসপাতালে না গিয়ে পুলিশমুখী হচ্ছে মানুষ

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ০০:২৫, এপ্রিল ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:২৫, এপ্রিল ০২, ২০২০

জরুরি সেবা ৯৯৯

জ্বর, সর্দি, কাশি ও গলা ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে না গিয়ে অসংখ্য মানুষ পুলিশমুখী হচ্ছে। হাসপাতালে গিয়ে হয়রানির শিকার হবেন—এই আশঙ্কায় অনেকেই পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন। এই সংক্রান্ত সহযোগিতা নেওয়ার জন্য থানা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশ নিয়ন্ত্রিত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ প্রতিদিন মানুষ ফোন দিচ্ছে। জাতীয় জরুরি সেবার কর্মীরাও মানুষকে সাধ্যমত সহযোগিতা করছেন।
জাতীয় জরুরি সেবার পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১৮ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত রাজধানীসহ সারাদেশ থেকে ৮১ হাজার ৭৫৯টি কল এসেছে। এর মধ্যে করোনা চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য নিয়েছেন ৭৬ হাজার ২৪২ জন কলার। ৫ হাজার ৫১৭ জন পুলিশের কাছ থেকে মাঠ পর্যায়ে সেবা নিয়েছেন।
গত ৩১ মার্চ টঙ্গী থেকে এক আইনজীবী ফোন করে ৯৯৯ এ জানান, মোহাম্মদপুরে তার মামী মারা গেছেন, তার শরীরে করোনার সব উপসর্গ ছিল। এ বিষয়ে তারা কোথায় যোগাযোগ করে নমুনা পরীক্ষা করাতে দিতে পারেন সে পরামর্শ চান তিনি। জাতীয় জরুরি সেবা থেকে তখন ওই ব্যক্তিকে মোহাম্মদপুর থানায় সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ আইইডিসিআর থেকে নমুনা সংগ্রাহকদের নিয়ে এসে ওই নারীর নমুনা সংগ্রহ করান। যার ফলাফল এখনও পাওয়া যায়নি। তবে পরিবারটি কোয়ারিন্টেনে থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।
জাতীয় জরুরি সেবা থেকে জানানো হয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার পর ৯৯৯ এ গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার কল বেড়েছে। বেশিরভাগ মানুষ করোনাভাইরাসের উপসর্গ, চিকিৎসা, নিকটস্থ হাসপাতালে কোথায় চিকিৎসা হয়, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, হোম কোয়ারেন্টিনে কতদিন থাকতে হবে এবং নিত্যপণ্য চেয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা এসব বিষয়ে মানুষকে তথ্য সরবরাহ করছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে যেসব পুলিশ সদস্যকে গিয়ে নাগরিকদের সেবা দিতে হবে সেখানে পুলিশ পাঠানো হচ্ছে।
৩০ মার্চ কুমিল্লা থেকে এক কলার জাতীয় জরুরি সেবায় ফোন দিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে এক ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সের সহযোগিতা চান। ৯৯৯ একটি অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে দেন। তবে এজন্য বেগ পেতে হয়েছে জাতীয় জরুরি সেবার কর্মীদের। কারণ সন্দেহভাজন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স তুলতে চান না চালকরা। অনেকে নিতে চাইলেও যথাযথ পিঁপিঁই না থাকায় সার্ভিস দিতে পারছেন না বলে জানান জাতীয় জরুরি সেবার পুলিশ কর্মকর্তারা।
জাতীয় জরুরি সেবার তথ্যানুযায়ী গত ১৮ মার্চ ৯৯৯ এ করোনা সংক্রান্ত কল এসেছে ৪ হাজার ২১টি। তাদের মধ্যে তথ্য নিয়েছেন ৩৭ শ’ কলার। পুলিশের কাছ থেকে সরাসরি সহযোগিতা নিয়েছেন ৩২১ জন। ১৯ মার্চ করোনাভাইরাস সংক্রান্ত ৪ হাজার ২৬৫টি কল এসেছে। এর মধ্যে তথ্য নিয়েছেন ৩ হাজার ৯৩৮ জন কলার এবং পুলিশের সহযোগিতায় চিকিৎসা সংক্রান্ত সহযোগিতা নিয়েছেন ৩২৭ জন। ২০ মার্চ সারাদেশ থেকে কল এসেছে ৫ হাজার ৩৯১টি। ৪ হাজার ৭৭৫ জন তথ্য নিয়েছেন এবং সহযোগিতা নিয়েছেন ৬৪৬ জন। ২১ মার্চ ৫ হাজার ৬৭৭ টি কল আসে। বিভিন্ন থানা পুলিশের সরাসরি সহযোগিতা নিয়েছেন ৭৪৫ জন। তথ্যসেবা নিয়েছেন ৪ হাজার ৯৩২ জন। ২২ মার্চ সেবা নিয়েছেন ৬ হাজার ৪ জন, ২৩ মার্চ সেবা নিয়েছেন ৬ হাজার ৩৮৬ জন, ২৪ মার্চ সেবা নিয়েছেন ৬ হাজার ৫৫৫ জন, ২৫ মার্চ ৬ হাজার ৮২১ জন, ২৬ মার্চ ৭ হাজার ৬৫৭ জন, ২৭ মার্চ ৬ হাজার ৫৬১ জন, ২৮ মার্চ সেবা নিয়েছেন ৬ হাজার ৭১৬ জন, ২৯ মার্চ ৬ হাজার ১০৬ জন, ৩০ মার্চ ৬ হাজার ১৯৯ জন এবং ৩১ মার্চ সারাদিন সারাদেশ থেকে ৭ হাজার ৪২১ জন কলার কল দিয়ে সেবা নিয়েছেন।
জ্বর-সর্দি নিয়ে মানুষ বর্তমানে আতঙ্কিত। অনেকেই ঘরে বসে সাধারণ প্যারাসিটামল খেয়ে নিচ্ছেন। আবার অনেকে আতঙ্কিত হয়ে বিষয়গুলো কারও সঙ্গে শেয়ার করছেন না। বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারও বন্ধ। মানুষের জ্বর সর্দি ও গলা ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ কম। বেসরকারি হাসপাতালে জ্বর, সর্দি নিয়ে কাউকে ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ জ্বর সর্দি ও কাশি নিয়ে একাধিক হাসপাতালে ঘুরছে এমন নজিরও রয়েছে। তাই মানুষ বাধ্য হয়ে ৯৯৯ এ ফোন দিয়ে পুলিশের সহযোগিতা নিচ্ছেন। অনেকে খাবারের কথা বলছেন। এক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দিচ্ছে পুলিশ।
জাতীয় জরুরি সেবা থেকে সেবা নিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন এক ব্যক্তি নাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা এবং অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে পেয়েছি। আমার রোগীর জ্বর থাকায় তাকে অ্যাম্বুলেন্সেই তুলতে চাইছিল না। পরে ৯৯৯ এর সহযোগিতায় অ্যাম্বুলেন্স পেয়েছি। রোগীকে হাসপাতালও ভর্তি করেছে। পুলিশের সহযোগিতায় সব সহজ হয়েছে।’
টিঅ্যান্ডআইএম বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ জানান, মানুষ করোনা সংক্রান্ত তথ্য নিচ্ছেন। কোথায় কিভাবে চিকিৎসা পাওয়া যাবে তা জানছেন। যে যা জানতে চাচ্ছে, যে সহযোগিতা চাচ্ছেন তা করা হচ্ছে।
করোনভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি চলছে। মানুষ প্রয়োজন ছাড়া বের হচ্ছে না। আইইডিসিআর’র তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত দেশে ৫৪ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ছয়জন এবং সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন ২৬ জন।

 

/এমআর/

লাইভ

টপ