জীবাণুনাশক টানেলে ‘ফলস সিকিউরিটি’!

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১০:০০, মে ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩০, মে ১৫, ২০২০

জীবাণুনাশক টানেল
দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জীবাণুনাশক টানেল তৈরি করা হয়েছে। আর সেসব টানেল স্থাপনের সংবাদে গত ১৬ এপ্রিল শরীরে সরাসরি জীবাণুনাশক ছিটানো বন্ধের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। অথচ বুধবার ( ১৩ মে) সরকারি অফিসে জীবাণুনাশক টানেল স্থাপন করতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এক নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি অফিসগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জীবাণুমুক্তকরণ টানেল স্থাপনে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানেলের ভেতরে কয়েক সেকেন্ড সেন্সরটা কাজ করে, এটা কোনওভাবেই সুরক্ষা দেবে না। বরং চোখসহ সরাসরি শরীরের উন্মুক্ত স্থানে সেটা ক্ষতিকারক। একইসঙ্গে এটা একটা ফলস সিকিউরিটি সেন্স দেবে। টানেলের ভেতরে দিয়ে চলাচল করার পর মানুষ নিজেকে জীবাণুমুক্ত ভাববে, প্রকৃতপক্ষে সেটা হবে না। এতে করে ক্ষতির মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে যাবে, এজন্য টানেলের কনসেপ্ট বাংলাদেশে ফিজিবল না।নরসিংদীতে জীবাণুনাশক টানেল

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাণুনাশক হিসেবে ব্লিচিং ব্যবহার করা যাবেই না, নিরাপদ কেমিক্যাল হিসেবে যাই ব্যবহার করা হোক না কেন সেটাই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। একইসঙ্গে পাবলিক প্লেসে এই ধরনের টানেলের কোনও কার্যকারিতা নেই। বরং তাতে করে মানুষকে এটা ফলস সিকিউরিটি দেবে, মানুষ নিজেকে নিরাপদ ভাববে, যাতে করে বিপদ আরও দ্বিগুণ হবে। তাই টানেল স্থাপন করার আগে ভাইরোলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও  জীবাণুনাশক নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি করে এর কোনটাতে কতটা ক্ষতি, সেসব কিভাবে নিরূপণ করতে হবে এবং তার সমাধান কী হবে সে বিষয়ে মতামত নিতে হবে, নয়তো এটা হিতে বিপরীত হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টানেল বসানোর সিদ্ধান্তকে লোক দেখানো মন্তব্য করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এসব টানেল প্রকৃতপক্ষে কোনও কাজ করবে না, এগুলো ফলস সিকিউরিটি দেবে এবং সেটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। যেসব কেমিক্যাল ব্যবহার করা হবে সেগুলো চোখ, মুখ এবং শ্বাসনালীর ক্ষতি করবে—আর শ্বাসনালীর ক্ষতি হলে সেটা করোনাভাইরাস সংক্রমণের জন্য সহায়ক হবে।

জীবাণুনাশক হিসেবে সবচেয়ে কার্যকর ব্লিচিং, যেটা শরীরের উন্মুক্ত স্থানের জন্য ক্ষতিকর। এই ব্লিচিংকে যদি শরীরে ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা হয় সেটা তখন আবার কাজ করবে না জানিয়ে বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক শাখাওয়াৎ হোসেন ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জীবাণুনাশক হিসেবে খুব বেশি কিছু নেই। অনেককিছু থাকলে তার মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া যায়, কিন্তু সে অপশন এখানে নেই। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ নিয়ে কী পরিকল্পনা সেটা জানা খুব প্রয়োজন, একইসঙ্গে সেখানে কোন কেমিক্যাল ইউজ করা যাবে সেটা কারা অ্যাপ্রুভ করবে সেটাও জানা প্রয়োজন। কারণ, তা না হলে যার যার মতো করে জিনিসপত্র ব্যবহার করতে থাকবে সেটা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হবে।নরসিংদীতে জীবাণুনাশক টানেল

অধ্যাপক শাখাওয়াৎ হোসেন ফিরোজ বলেন, হাইড্রোজেন পার অক্সসাইড জীবাণুনাশক হিসেবে অনেকেই ব্যবহার করছে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির (সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) তথ্যে বলা নেই, ঠিক কত শতাংশ হাইড্রোজেন পার অক্সাসাইড ব্যবহার করলে, কত মিনিট টানেলে থাকলে ভাইরাস মারা যাবে।  এক থেকে দুই শতাংশ হাইড্রোজেন পার অক্সাসাইড ঠিক ‘ইফেক্টিভলি ভাইরাস কিল’ করতে পারে কিনা-এটা কোথাও নেই। তিনি বলেন, আবার ইউভিসি (আল্ট্রা ভায়োলেট রেডিয়েশন-সি অর্থাৎ অতিবেগুনি রশ্মির সি ক্যাটাগরি) পোশাক জীবাণুমুক্ত করতে করা হয়, আবার এটা শরীরের জন্য ভালো নয়। কিন্তু পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত করতে হলে এই লাইটের নিচে অনেকক্ষণ থাকতে হবে—এ রকম সমস্যা অনেক রয়েছে। ইউনিক কোনও সলিউশন নাই। বরং এসব টানেলের ভেতরে গিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত ভেবে মানুষ অন্য কোনও পন্থা নেবে না, তাতে করে করোনাতে আক্রান্তের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। এটা এককথায় মানুষকে ফলস সিকিউরিটি দেবে, যেটা হুমকিস্বরূপ।

স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জীবাণুনাশকের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এর আগে দেশের সব জেলাতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তাহলে মন্ত্রণালয় থেকে কীভাবে জীবাণুনাশক টানেল করা হচ্ছে—প্রশ্ন করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জীবাণুনাশক টানেল বসানো হচ্ছে, কিন্তু তাতে কোন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ক্ষতিকর দিকগুলো উপেক্ষা করা হচ্ছে। এই টানেল একটা ‘ফলস সিকিউরিটি’ দেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, টানেলের ভেতরে কয়েক সেকেন্ড সেন্সরটা কাজ করে, এটা কোনওভাবেই সুরক্ষা দেবে না। বরং চোখসহ সরাসরি শরীরের উন্মুক্ত স্থানে সেটা ক্ষতিকারক। একইসঙ্গে এটা একটা ফলস সিকিউরিটি সেন্স দেবে। টানেলের ভেতরে দিয়ে চলাচল করার পর মানুষ নিজেকে জীবাণুমুক্ত ভাববে, প্রকৃতপক্ষে সেটা হবে না। এতে করে ক্ষতির মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। টানেলের কনসেপ্ট বাংলাদেশে ফিজিবল না মন্তব্য করে তিনি বলেন, জনসমাগম রয়েছে এমন কোথাও এই টানেল কার্যকর নয়।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিত টানেলগুলো কেমন হবে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও করোনা বিষয়ক মিডিয়া সেলের প্রধান হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মানুষের শরীরের খুব বেশি ক্ষতি হয়তো করবে না, আর কীভাবে, কোন প্রক্রিয়াতে এটা স্থাপন হতে যাচ্ছে সেটা আমার জানা নেই।

 

/এমআর/

লাইভ

টপ