টিউশনি সংকটে ইমাম-মুয়াজ্জিন ও শিক্ষার্থীরা

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ১৯:৩৮, আগস্ট ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪২, আগস্ট ১২, ২০২০

করোনাভাইরাসকরোনাকালের ‘নিও নরমাল’ যুগে অন্যান্য পেশার লোকজন ধীরে ধীরে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরতে পারলেও বিভিন্ন কারণে রাজধানীতে টিউশনি সংকট বাড়ছে। এতে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বাড়তি আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসারে টানাটানি বাড়ছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীরা টিউশনি সংকটের কারণে খণ্ডকালীন চাকরিতে প্রবেশ করছে। যা অ্যাকাডেমিক ও চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে তাদের শিক্ষাজীবন এবং ভবিষ্যৎ চাকরি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইমাম-মুয়াজ্জিনরা বলছেন, রাজধানীতে অনেক ইমাম-মুয়াজ্জিন মসজিদে চাকরির পাশাপাশি বাসা-বাড়িতে গিয়ে ছেলেমেয়েদের কোরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এর বিনিময়ে তারা একটা হাদিয়া (অর্থ) পান। এই বাড়তি অর্থ তাদের সংসারের চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। করোনার কারণে গত এপ্রিল থেকে এই আয় বন্ধ হয়ে আছে। বর্তমান ‘নিও নরমাল’ সময়ে সবকিছু খুলে গেলেও অভিভাবকরা গৃহশিক্ষক রাখছেন না। আবার করোনার কারণে বাড়িতে অপরিচিত লোকদের প্রবেশ সংরক্ষিত থাকায় গৃহশিক্ষকও রাখতে পারছেন না অনেক অভিভাবক। এছাড়া আয় কমে যাওয়া রাজধানীর অনেক মানুষ পরিবারকে গ্রামে রেখে এসেছেন। সবকিছু মিলিয়ে রাজধানীতে টিউশনির সংকট বাড়ছে।

রাজধানীর সেগুনবাগিচার একটি মসজিদে মুয়াজ্জিনের চাকরি করেন আরিফুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। তিনি জানান, চাকরির পাশাপাশি এলাকার তিনটি বাসায় গিয়ে তিনটি বাচ্চাকে সহি-শুদ্ধভাবে কোরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। এজন্য প্রতিমাসে একটি হাদিয়া (অর্থ) পেতেন। মসজিদের চাকরির বেতন ও টিউশনি থেকে আসা অর্থে তার থাকা-খাওয়া এবং বাড়িতে পরিবারের জন্য টাকা পাঠানো দুটোই ভালোভাবে চলছিল। কিন্তু গত এপ্রিল থেকে বাচ্চাদের কোরআন শিক্ষা দেওয়ার কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে বাড়িতে যেমন কম টাকা পাঠাতে হচ্ছে, আবার নিজের খরচও সীমিত করে ফেলতে হয়েছে। এতে নিজের ও পরিবার দুই জায়গায় কষ্ট বাড়ছে।

সেগুনবাগিচার একটি সরকারি কোয়ার্টারে ভেতরের মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ান ইমাম সাইদুল হক (ছদ্মনাম)। তিনি জানান, ইমামতির পাশাপাশি দুইজন শিশুকে বাসায় গিয়ে কোরআন শিক্ষা দিতেন। এই দুই জায়গার আয় দিয়ে তাদের স্বামী-স্ত্রী এবং ছোট একটি বাচ্চার সংসার ভালো চলছিল। ৬-৭ বছরের একটি বাচ্চাকে তিনি কোরআন শিক্ষা দিতেন। ছেলেটি একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে পড়তো এবং সেখানে তার মাও চাকরি করতো। কিন্তু করোনার কারণে সেই কিন্ডার গার্টেনও বন্ধ। ফলে পুরুষ সদস্য ছাড়া বাকি সবাই গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। আর আরেকটি বাড়িতে করোনার ভয়ে অভিভাবকরা গৃহশিক্ষক রাখছেন না। তাই এপ্রিল থেকে তার কোরআন শিক্ষা দেওয়ার কাজটি বন্ধ আছে। এতে তাদের সংসারে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশ করতে না চাওয়ার যুক্তি হিসেবে এই দুই ইমাম-মুয়াজ্জিন বলেন, আসলে কোরআন শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ নিয়ে সমাজে অনেক বিতর্ক আছে। মূলত এই কারণে তারা কেউ নিজেদের আসল নাম এবং মসজিদের নাম না প্রকাশ করতে অনুরোধ জানান।

টিউশনির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের অনেক অসচ্ছল শিক্ষার্থী পড়ালেখার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতো। আবার অনেকে টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতো, পরিবারে অর্থ পাঠাতো। এর বাইরে পড়ালেখা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিতে থাকা শিক্ষার্থীরাও টিউশনি করে খরচ চালাতো। কিন্তু করোনার কারণে টিউশনি বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থী গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। কিন্তু আর্থিকভাবে একেবারে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা, যাদের টিউশনি টাকায় পরিবারের বড় একটা খরচ নির্বাহ হতো, তারা খণ্ডকালীন বিভিন্ন চাকরি সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে সারা দিন চাকরি পরিশ্রম শেষে অ্যাকাডেমিক পরীক্ষা এবং চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির লেখাপড়া করা সম্ভব হচ্ছে না।

অনলাইন শপের পণ্য ডেলিভারি কাজ করছেন রাজধানীর একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের অনার্সের শিক্ষার্থী জোবায়ের আহমেদ। রাজধানীর পুরানা পল্টন লেনের একটি বাড়ির নিচে পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার সময় তার সঙ্গে কথা হয়। জোবায়ের জানান, পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি আজিমপুর এলাকায় তিনটি টিউশনি করতেন। করোনার কারণে মার্চের ২০ তারিখ থেকে একে একে অভিভাবকরা টিউশনিতে যেতে নিষেধ করেন। তবে সব অভিভাবক বেতন দিয়েছেন। টিউশনি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে চলে যান। কিন্তু পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি ভালো না হওয়া রমজানের ঈদের পরে আবার ঢাকায় আসেন।

তিনি আরও বলেন, এক পরিচিত বড় ভাইয়ের মাধ্যমে একটি অনলাইন শপের এই কাজটি নিই। সারা দিন সাইকেল চালিয়ে কাজ করা অনেক পরিশ্রমের। এই কাজ করে রাতে ক্লান্ত শরীরে পড়ালেখা করা অনেক কঠিন। কিন্তু ৩টা টিউশনিতে আসা-যাওয়া এবং ছাত্রদের পড়াতে আমার সময় ব্যয় হতো চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা। সেখানে এখন ৮ ঘণ্টার ওপরে আমাকে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করতে হয়। আশা করছি অক্টোবর থেকে আবারও টিউশনি শুরু করতে পারবো।

রাজধানীর বিজয়নগরে একটি ফার্মেসিতে খণ্ডকালীন চাকরি করছেন নাহিদ হোসেন অমি। তিনি জানান, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করে ব্যাংক জবের প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতেন। মাঝে মাঝে বাড়িতে কম-বেশি টাকা পাঠাতে হতো। ৩ টিউশনিতে ৫ জন ছাত্রকে হিসাববিজ্ঞান পড়াতেন। সপ্তাহে ৪ দিন পড়াতেন। আয় ছিল ২০ হাজার টাকার মতো।

তিনি বলেন, এখন সপ্তাহে ৬ দিন ফার্মেসিতে বসতে হয় এবং টানা কাজ করা লাগে। কিন্তু আয়ও সমান। আসলে লেখাপড়া শেষে বাড়ি থেকে টাকা আনা সম্ভব হচ্ছে না। বরং পরিবার চায় মাসে মাসে আমি যেন কিছু টাকা পাঠাই। এখন বাড়িতে চলে গেলে পরিবার টাকা না দিলেও নিজের খরচ তো চালাতে হবে। এই কারণে চাকরি করা। তবে, এসব চাকরি করে আবার অন্য ব্যাংক বা সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব নয়।

/এমআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ