থোক বরাদ্দের ১৩ শতাংশ কমিশন দিতে হয় ঠিকাদারকে: টিআইবি

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৯:০৮, আগস্ট ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১০, আগস্ট ১২, ২০২০

টিআইবি

সংসদীয় আসনভিত্তিক থোক বরাদ্দের অর্থে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট বরাদ্দের ৮ দশমিক ২৫ থেকে ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয় ঠিকাদারকে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

বুধবার (১২ আগস্ট) ‘সংসদীয় আসনভিত্তিক থোক বরাদ্দ: অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় টিআইবি।

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেন্ডার পাওয়ার পর কার্যাদেশ প্রদানকারী (ওয়ার্ক অর্ডার ইস্যু) কমিটিকে এক শতাংশ, ছয় ধাপে পণ্য টেস্টের (যাচাই) প্রতিধাপে ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা, উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের পিয়নকে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা, ফিল্ড ওয়ার্ক অ্যাসিসট্যান্টকে (তদারকি) ১ থেকে ২ শতাংশ, উপজেলা এলজিইডি’র উপ-সহকারী প্রকৌশলী এক শতাংশ, উপজেলা এলজিইডি’র সহকারী প্রকৌশলী ১ থেকে ২ শতাংশ, জেলা এলজিইডি কার্যালয়ের প্রশাসনিক বিভাগ ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ, নির্বাহী প্রকৌশলী শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, ট্রেজারি (বিল ছাড় করাতে) শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ, ট্রেজারির পিয়ন ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, প্রকল্প পরিচালক শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে এক শতাংশ, এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালী কর্মীবাহিনী বা চাঁদাবাজদের ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, এলজিইডি’র নিরীক্ষার সময় ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা (ক্ষেত্র বিশেষে ঠিকাদার থেকে বছরে এককালীন) অর্থ দিতে হয়। সব মিলিয়ে নিরীক্ষাকালীন কমিশনের হার ছাড়া ঠিকাদারকে প্রতি স্কিমে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করতে হয়।

৫০টি সংসদী আসনের ৬২৮টি স্কিমের অডিট ও সংসদ সদস্যের জন্য কমিশনের হার ছাড়া সর্বনিম্ন ৪ লাখ ৩৩ হাজার ২৩৭ টাকা করে ২৭ কোটি ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৮০ টাকা এবং স্কিম প্রতি সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৬০৩ টাকা করে ৪১ কোটি ৭৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৩ টাকা কমিশন দিতে হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কিমের দরপত্র পাওয়া থেকে পুরো কাজ শেষ করে চূড়ান্ত বিল ও জামানতের টাকা উত্তোলন পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন অংশীজনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে নিয়ম-বহির্ভূত কমিশন বাণিজ্য বিদ্যমান রয়েছে। কখনও কখনও এই টাকা এককালীন পরিশোধ করতে হয়। দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য ই-টেন্ডার পদ্ধতিতে দরপত্র প্রক্রিয়া প্রবর্তন হলেও তদারকি প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার, সংসদ সদস্য ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অনিয়ম রয়েছে। আইনি প্রতিবন্ধকতা, মিথ্যা মামলার ভয় ও হয়রানির আশঙ্কায় অনিয়মের তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ ও আগ্রহের ঘাটতিসহ প্রতিবাদ এবং অভিযোগ না করার প্রবণতাও লক্স্য করা যায়।

অনিয়ম ও দুর্নীতির ধরন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের সুপারিশে এলজিইডি’র মূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের দরপত্র বাছাই করা হয়। সঠিক নিয়মে কাজপ্রাপ্ত ঠিকাদারকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ‘বিড মানি’ দিয়ে পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। ঠিকাদারের থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধির মাধ্যমে বা দলের তহবিলে গ্রহণ করা হয়। ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধিদের একাংশ এলাকার উন্নয়ন কাজের বাস্তবায়ন নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

রাস্তা তৈরির সামগ্রী ব্যবসার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একাংশ থেকে নির্মাণ সামগ্রী ক্রয়ে ঠিকাদারদের বাধ্য করা হয়। ক্রয় না করলে কাজে বাধা প্রয়োগসহ ভয়ভীতি দেখানো হয়। ফলে ঠিকাদাররা নিম্নমানের ও পরিমাণে কম উপকরণ নিয়ে বাধ্য হয়ে সমঝোতা করেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ঠিকাদার পূর্ণাঙ্গ কাজ ও মানসম্মত কাজ না করে বিল উত্তোলনের জন্য রাজনৈতিক প্রভাবশালী, জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে তদবির করে থাকেন। এক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে কাজ সম্পন্ন হওয়ার অনুমোদনসহ বিলের অর্থ ছাড় করাতে বাধ্য করা হয়।

এতে আরও  বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে কয়েকজন ঠিকাদার একত্র হয়ে অন্যান্য দরপত্রের মতো একই মূল্যের দরপত্র অনলাইনের মাধ্যমে পূরণ করেন। দরপত্র পাওয়ার পর পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে প্রাপ্ত কাজের বণ্টন করে নেন। অনেক ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ শতাংশ লভ্যাংশের ভিত্তিতে উক্ত এলাকার প্রভাবশালী ঠিকাদারদের কাছে প্রাপ্ত কাজ বিক্রি করা হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেও এই সমঝোতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে আরও  বলা হয়েছে, কাজ পাওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে নতুন এবং কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঠিকাদার তুলনামূলক বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঠিকাদারদের লাইসেন্স ব্যবহার করে টেন্ডার জমা দেন। এক্ষেত্রে সম্পর্ক ও মৌখিক চুক্তির ওপর নির্ভর করে পারস্পরিক লেনদেনের বিষয়টি নির্ধারিত হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

টিআইবির সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের কয়েকটি লক্ষ্য থাকলেও কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন স্কিম পরিকল্পনা ও বাস্তবায়িত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আসনের সংসদ সদস্য কাজের অগ্রগতি তদারকি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করলেও সদস্যদের একাংশ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তির জন্য বিভিন্ন অনিয়মকে প্রশ্রয় দেন। ফলে সার্বিকভাবে উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ। সুনির্দিষ্ট নীতিকাঠামো/ কৌশলের ঘাটতিসহ আসনভিত্তিক স্কিম সম্পর্কিত তথ্যসহ প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনুপস্থিত। সার্বিকভাবে তথ্যের উন্মুক্ততার ঘাটতি রয়েছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, এই প্রকল্প সংসদ সদস্যের একাংশের জন্য স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা, নির্বাচনে ভোট নিশ্চিত করার চেষ্টা ও অনৈতিকভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সর্বোপরি কার্যকর তদারকি, প্রকল্পের সার্বিক মূল্যায়ন, এবং সংসদ সদস্যের সততা ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট আচরণ বিধির অনুপস্থিতি অনিয়ম-দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে আরও  উৎসাহিত করছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হচ্ছে।

এ অবস্থায় বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছে টিআইবি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত সংসদীয় আসনে থোক বরাদ্দের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পৃথকভাবে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করে এগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ করতে হবে। প্রকল্পের আইনি কাঠামো বা নীতিমালা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। প্রকল্পের অধীনে স্কিম পরিকল্পনা ও তালিকাভুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট আসনের ভৌগোলিক অবস্থান এবং উপযোগিতা অনুযায়ী তার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। স্কিম তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে এলাকার জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামত নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সমন্বয় কমিটিতে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করতে হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস করতে হবে।

 

/এসএস/এপিএইচ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ