কুকুরকে অন্য এলাকায় রেখে আসা ‘আপদকালীন’ পরিকল্পনা!

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১৮:৫১, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৪৮, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০

 

বেওয়রিশ কুকুর, ছবি: সংগৃহীতকুকুর রাখা যাবে কিনা, এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যখন তুমুল বিতর্ক, তখন একদিকে রাজধানীর রমনা ও ধানমন্ডি এলাকা থেকে অন্তত ১০০ কুকুরকে মাতুয়াইলে স্থানান্তর করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। আর অন্যদিকে কুকুর অপসারণ বন্ধে হাইকোর্টে রিট করেছেন অভিনেত্রী জয়া আহসান ও প্রাণি অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠন। বেওয়ারিশ প্রাণিদের নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলছেন, এই ধরনের অপসারণ কোনও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অংশ হতে পারে না। এটি অমানবিক সিদ্ধান্ত।  আর প্রাণ ও প্রকৃতি নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলছেন, ইকোসিস্টেমের পাশপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়বে।  দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলছে, দীর্ঘ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এটি আপাতত ‘আপদকালীন’ একটি পরিকল্পনা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,গত ৩০ জুলাই দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘ঢাকাবাসীর অভিপ্রায় অনুযায়ী, বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে আমরা চিন্তাভাবনা করছি।’ এরপর আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার করা হয় যে, ৩০ হাজার কুকুর শহরের বাইরের স্থানান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। এরপরই এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পক্ষে-বিপক্ষে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।

কুকুর অপসারণ নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা চলছে, তখন রাজধানীর রমনা পার্ক এবং ধানমন্ডি এলাকা থেকে অন্তত ১০০ কুকুর অপসারণ করে মাতুয়াইল ছেড়ে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।  ডিএসসিসি’র একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুকুর বন্ধ্যত্বকরণ কর্মসূচি চালানোর মতো পর্যাপ্ত লোকবল ও ব্যবস্থা সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। উপরন্তু, কুকুর নিয়ে বিস্তর অভিযোগ আসায় অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়। তবে এটা প্রাথমিক— দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না। দীর্ঘমেয়াদি কোনও পরিকল্পনা এখনও করা হয়নি। তারা আরও জানান, কুকুরগুলো ছেড়ে দেওয়ার পর আবারও আগের এলাকায় ফিরে আসে কিনা তা দেখার জন্য এই পরিকল্পনা। 

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, দেশে এক সময় পিটিয়ে কুকুর নিধন করা হতো। ২০১২ সালে উচ্চ আদালতে রিটের পর নির্বিচারে কুকুর নিধনকে অমানবিক উল্লেখ করে তা বন্ধের নির্দেশ দেন আদালত। আর ২০১৯ সালের প্রাণি কল্যাণ আইনের সপ্তম ধারায় বলা হয়েছে— ‘এই আইনে উল্লিখিত কোনও কারণ ব্যতীত, মালিকবিহীন কোনও প্রাণি নিধন বা অপসারণ করা যাবে না।’  দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—  ‘কোনও ব্যক্তিমালিকবিহীন কোনও প্রাণি হত্যা করলে তা এই আইনের অধীন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। মালিকবিহীন কোনও প্রাণিকে নিধন বা অপসারণ করা যাবে না।’

তবে এই আইন সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের আওতায় আসে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের।  কুকুর অপসারণের এই কার্যক্রম শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত চলবে বলে জানান তিনি

আবু নাসের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘কুকুর অপসারণের গণদাবি কিন্তু  প্রচুর। আমাদের কাছে কুকুর নিয়ে প্রচুর অভিযোগ আসে। অপসারণের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা আছে। কিন্তু দাবি বেশি অপসারণের পক্ষেই। প্রাণি কল্যাণ আইন অনুযায়ী, প্রাণি অপসারণ অপরাধ, কিন্তু সিটি করপোরেশন ব্যতিত। এটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে ব্যক্তি কিংবা সংস্থা পর্যায়ে। সিটি করপোরেশনের যে মৌলিক কার্যাবলী আছে, সেখানে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯ এর তৃতীয় তফসিলের ১৫.৩, ১৫.৪, ১৫.৫ ও ১৫.১০ এবং পঞ্চম তাফসিলের ৫১ ধারা ও সপ্তম তফসিলের ১৮ ধারা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন যদি মনে করে, তাহলে কোনও বেওয়ারিশ কুকুর অথবা কোনও বেওয়ারিশ প্রাণিকে অপসারণ করতে পারে। এমনকি নিধনও করতে পারে। তবে আমরা নিধন করছি না, আমরা অপসারণ করছি।’

শুধু সাময়িক অপসারণ কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অপসারণের সঙ্গে একটি খরচের বিষয় আছে। এটা আমাদের শুধু প্রাথমিক পরিকল্পনা।’ 

পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ারের চেয়ারম্যান রাকিবুল হক এমিল বলেন, ‘কুকুর অপসারণ নিয়ে সিটি করপোরেশনের কোনও পরিকল্পনা আমাদের চোখে পড়েনি। তারা দুদিন আগেও বলেছে তেমন কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। যখন রমনা পার্ক আর ধানমন্ডি থেকে কুকুর অপসারণের ঘটনা ফাঁস হয়ে গেলো, তখন তারা বলছে— এসব এলাকা থেকে পরীক্ষামূলকভাবে সাময়িক স্থানান্তর করছে। তারা যুক্তি দেখাচ্ছে যে, কুকুরগুলা ফেরত চলে আসবে। সুতরাং এগুলো সেভাবে অপসারণ না। তাদের প্ল্যানিং বলতে এইটুকুই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে অপসারণের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। যেটা করতে হবে সেটা হললো আগে সার্ভে করতে হবে। কোন এলাকায় সমস্যা বেশি কোন এলাকায় কম। সেখানে সমস্যার ধরন কী। একটা প্রাণি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে হলো নগর পরিকল্পনার একটি অংশ। তাহলে তো আমরা অন্তত বুঝতে পারবো যে কুকুর অন্য এলাকায় দিয়ে আসবো নাকি বন্ধ্যত্বকরণ করবো।’

প্রাণ ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করেন পাভেল পার্থ । তিনি বলেন, ‘প্রাণিরা একটি বিশেষ এলাকার বাস্তু সংস্থানে অভ্যস্ত হয়। সেটা তার আশেপাশের বাসাবাড়ির উচ্ছিষ্ট, আবর্জনা খেয়ে থাকে। এই শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তাদের একটি ভূমিকা আছে। বর্জ্য থেকে যে রোগ সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কুকুর ও বিড়াল সেগুলো খেয়ে ফেলে। তাছাড়া কুকুর একটি এলাকায় অলিখিত নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কাজ করে। প্রত্যেক প্রাণির নিজস্ব একটি বিচরণ এলাকা থাকে। তাকে যদি দূরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসা হয়, সে কিন্তু খুঁজে খুঁজে আবারও ওইখানে ফেরত যায়। তবে তাকে স্থানান্তর যদি জ্ঞান থাকা অবস্থায় করা হয়, তাহলেই তার ফিরে আগের জায়গায় আসা সম্ভব, যদি কোনও নদী পাড়ি দেওয়া না হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রাণির বিচরণ করা এলাকা থেকে সরিয়ে যদি অন্যত্র নেওয়া হয়, তাহলে কিন্তু ভারসম্যহীনতা তৈরি হয়। ইকো সিস্টেমে একটি রি-অ্যাকশন তৈরি হয়। অন্য এলাকায় স্থানান্তর করলে কিন্তু নতুন এলাকার মানুষের জন্য সমস্যা তৈরি করবে। আমাদের ইকো সিস্টেমের প্রভাব এক দিন-দুই দিনে বোঝা যাবে না। এটা বুঝতে সময় লাগবে। করোনার মতো মহামারির সময় এধরনের সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত হয়নি। কোনও রকম গবেষণা কিংবা সার্ভে ছাড়া এই কাজ করা উচিত হয়নি। ’   

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ
X