তাজরীনের আগুন: ২৫ পরিবারের দাবি কে আমলে নেবে?

Send
হাসনাত নাঈম
প্রকাশিত : ২২:৫১, অক্টোবর ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৫, অক্টোবর ০২, ২০২০

তাজরিনের আহত শ্রমিকরাআশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের আট বছর পরে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫ পরিবার ক্ষতিপূরণের দাবিতে ১২ দিন ধরে প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে এখনও শ্রমিক ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসা পাননি দাবি নিয়ে বসলেও তাদের দাবি আমলে নিয়ে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। সর্বশেষ বুধবার এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তার সাক্ষাৎ মিললেও মিলেনি কোনও সমাধান। এ পরিস্থিতিতে শুক্রবার শ্রমিক পরিবারগুলো বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আহ্বানও জানিয়েছে।

অবস্থান নেওয়া তাজরীনের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে যারা এসেছে তারা সবাই গুরুতর আহত। কারও মেরুদণ্ডে সমস্যা, কারও হাড়ে সমস্যা। নতুন করে কাজে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করতে পারেননি তারা। যদি সঠিক ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা মিলতো তাহলে অন্তত না খেয়ে থাকতে হতো না। কেবল ২৫ পরিবার এখানে কেন, বাকিদের বিষয়ে জানতে চাইলে অবস্থানরত শ্রমিকরা বলেন, যারা আসেনি, তারা অনেকেই এখন সচ্ছলতার মুখ দেখেছেন। কাজ করছেন অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে।

অবস্থান কর্মসূচিতে থাকা তাজরীন ফ্যাশনের পাঁচতলার সুইং অপারেটর জরিনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমি আজকে পঙ্গু জীবনযাপন করছি। আমার দেশের বাড়িতে ঘর নাই। পরিবার নিয়ে যেন চলতে পারি সেই মোতাবেক আমাদের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন এটাই আমাদের মূল দাবি। এতগুলো দিন ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে বসে আছি, আমাদের কয়জন খোঁজ নিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ আট বছরে আমরা অনেকবার প্রেসক্লাবের সামনে এসেছি। সে সময় বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা আমাদের নিয়ে এসেছিল এবং আমাদের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু এই আট বছর পরে তারা আমাদের পাশে নাই।

আরেক শ্রমিক রোজিনা আক্তার বলেন, আমরা ২৪-২৫ জন শ্রমিক খুবই দরিদ্র এবং অসহায়। আমাদের চলার মতো কোনও পথ নাই। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আট বছর ধরে আমাদের এই অবস্থা। এখানে যারা এসেছে তাদের সবাই গুরুতর অসুস্থ। সাত দিন যাবৎ আমরা প্রেসক্লাবের সামনে বসি আছি, কেউ খোঁজ-খবর এখন পর্যন্ত নিলো না। আমরা তো এ দেশের নাগরিক নাকি, তাহলে আমাদের খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই কেন?

উল্লেখ্য, দাবি ও ক্ষোভের কথা জানাতে ডাকা শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুর্ঘটনার ৪ বছর পর কিছু আর্থিক অনুদান ছাড়া কোনও ক্ষতিপূরণ তারা পাননি। অন্যদিকে অভিযুক্ত মালিকের বিচারের তেমন কোনও অগ্রগতি হয়নি, সাক্ষ্যগ্রহণের নামে চলছে টালবাহানা। বাংলাদেশের শ্রম আইনের ক্ষতিপূরণের ধারাটি পরিবর্তন সাপেক্ষে অতিসত্বর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিতে ১৩ দিন তারা প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছে।

এদিকে প্রথম সপ্তাহে কর্তৃপক্ষের কেউ যোগাযোগ না করলেও বুধবার শ্রমিকদের একটি প্রতিনিধিদল শ্রম মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আখতারুল ইসলাম ও প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব সাহাবুদ্দিন আহমেদ সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। এ বিষয়ে আখতারুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তাদের দাবির বিষয়ে আলাপ শুনেছি। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি কলকারখানা পরিদর্শকের আওতাধীন হওয়ায় তাদের সেখানে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, রাজধানীর অদূরে সাভারের আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ অগ্নিকাণ্ডে ১১১ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যান। এছাড়াও অসংখ্য শ্রমিক গুরুতর আহত হয়। ওই ঘটনায় বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৫, ৪৩৬, ৪০৪-এর-ক ও ৩৪ ধারায় ২৫ নভেম্বর আশুলিয়া থানায় বাদী হয়ে মামলা করেন উপপরিদর্শক (এসআই) খায়রুল ইসলাম। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক এ কে এম মহসিনুজ্জামান খান ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে তাজরীন ফ্যাশনের এমডি দেলোয়ারসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটভুক্ত বাকি আসামিরা হলেন, তাজরীন ফ্যাশনের চেয়ারম্যান মাহমুদা আকতার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা দুলাল, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলাম, আনিসুর রহমান, সিকিউরিটি গার্ড রানা ওরফে আনারুল, সিকিউরিটি সুপারভাইজার আল-আমিন, স্টোর ইনচার্জ আল-আমিন ও লোডার শামীম মিয়া।

/এসআই/ইউআই/এফএএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ