বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা, ঐক্য ও সংহতি এবং তাদের মধ্যে একতা ও মেলবন্ধন এমন একটি অপরিহার্য বিষয়, যার প্রতি ইসলাম বারবার আহ্বান জানায়। ঐক্যের অর্থ ও চাহিদা হলো, মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় থাকা এবং নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ও বিরোধ থেকে বিরত থাকা। ইসলাম জোর দিয়ে বলে, পবিত্র কোরআনে যেখানে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
উম্মাহর ঐক্যের ফজিলত, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার এর চেয়ে বড় দলিল আর কী হতে পারে, শরিয়ত মুসলিম উম্মাহকে দিনে পাঁচবার মসজিদে একত্র হয়ে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। এরপর সপ্তাহে একবার এর চেয়ে বড় সমাবেশের জন্য জুমার নামাজ ফরজ করা হয়েছে। তারপর ঈদের নামাজের মাধ্যমে বছরে একটি বৃহৎ সমাবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এ সমাবেশ জনপদ থেকে বের হয়ে খোলা ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে।
এর থেকেও বৃহৎ আয়োজন করা হয়েছে হজের ফরজ বিধানের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসকারী মুসলিম উম্মাহকে একটি কেন্দ্রে, একই ধরনের পোশাকে একত্রিত হওয়ার, একই কালেমা উচ্চারণ করার এবং একই ধরনের আমল সম্পাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ব্যক্তিগত ইবাদতের তুলনায় সম্মিলিত ইবাদতের যে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, তার মধ্যে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের দিকটিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বর্তমানে আমরা যদি মুসলিম উম্মাহর দুরবস্থা ও অসহায়তার দিকে দৃষ্টি দিই এবং এর কারণ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে চিন্তা করি, তাহলে দুঃখজনকভাবে বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, উম্মাহ তাদের প্রকৃত মঞ্জিল ও মূল লক্ষ্যপথ থেকে দূরে সরে গেছে। আর এর ফলেই আমরা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, যতদিন মুসলমানরা চিন্তাগত ও আদর্শিক ভিত্তির ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল, ততদিন পার্থিব উন্নতি ও সমৃদ্ধি তাদের ভাগ্যে নির্ধারিত ছিল। কিন্তু যখন ইসলামের আদর্শিক ভিত্তি, কোরআন ও হাদিস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হলো এবং মনগড়া চিন্তা ও মতবাদের ওপর ভিত্তি করে সাম্প্রদায়িক ভাবধারাকে লালন করা হলো, তখন উম্মাহর ঐক্য ধীরে ধীরে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো।
এর ফল হলো এই, ইসলাম ধর্ম, যা এক আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) এর নির্দেশনার ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ উম্মাহর ধারণা বহন করতো, ক্রমে বিভাজনের শিকার হতে থাকলো। এর সুযোগে ইসলামের বিরোধী বিভিন্ন শক্তি ক্রমাগত ষড়যন্ত্র ও অনুপ্রবেশের পথ খুঁজে পেলো, যার একটি দীর্ঘ ও অবিরাম ধারা আজ পর্যন্ত চলমান রয়েছে।
রাসুল (সা.) এর জীবদ্দশাতেই দ্বীন পূর্ণতা লাভ করেছে এবং হিদায়াত সম্পূর্ণ হয়েছে। আর এই দ্বীন অর্থাৎ কোরআন ও সুন্নাহকে আল্লাহ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মহান নিয়ামত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে। তবে যে তীব্র ক্ষুধায় বাধ্য হবে, কোনও পাপের প্রতি ঝুঁকে নয় (তাকে ক্ষমা করা হবে), নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩)
এই হিদায়াত ব্যবস্থা লাভের আগে আমরা গোমরাহির মধ্যে ছিলাম এবং বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতার শিকার ছিলাম। অতঃপর স্রষ্টা আমাদের ইসলামের নিয়ামত দান করেছেন এবং সব দিক থেকে পরিপূর্ণ ও সর্বাঙ্গসুন্দর এই দ্বীন দান করেছেন।
মনে রাখতে হবে, আজও ইসলাম ও মুসলমানরা সব কুফরি শক্তির প্রথম লক্ষ্যবস্তু। তারা সাম্প্রদায়িক বিভেদের ভিত্তিতে আমাদের ভাগ করে এক তীরে দুই পাখি শিকার করতে চায়। একদিকে তারা আমাদের দুর্বল করে দিতে চায়, যাতে আমাদের শক্তি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে; আর অন্যদিকে নিজেদের মনমতো নীতির মাধ্যমে আমাদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে পারে।
অন্যদিকে তারা ইসলামের ওপর সন্ত্রাসবাদ ও বর্বরতার তকমা লাগিয়ে শ্বাশত এ ধর্মের বদনাম করতে চায়। অথচ ক্রমেই ইসলাম বিশ্বব্যাপী দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। তাই এখন প্রয়োজন হলো, আমরা যেন সব ধরনের মতভেদকে পাশে রেখে খাঁটি কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে ঐক্য ও সংহতি গড়ে তুলি। মনে রাখতে হবে, মহানবী (সা.) একজন কালেমা পাঠকারী মুসলমানের সম্মান ও মর্যাদাকে বাইতুল্লাহর মর্যাদার চেয়েও অধিক বলে ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাবা ঘর তাওয়াফ করতে দেখলাম এবং তিনি বলছিলেন, কত উত্তম তুমি হে কাবা! আর্কষীয় তোমার খোশবু, কত উচ্চ মর্যাদা তোমার (হে কাবা)! কত মহান সম্মান তোমার। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! আল্লাহর কাছে মুমিন ব্যক্তির জান-মাল ও ইজ্জতের মর্যাদা তোমার চেয়ে অনেক বেশি। আমরা মুমিন ব্যক্তি সম্পর্কে সুধারণাই পোষণ করি। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
ইসলাম হলো প্রকৃতির ধারা ও সম্পূর্ণ জীবননির্দেশক বিধান, যার শিক্ষাগুলো এবং নিয়মসমূহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুসংহতভাবে প্রযোজ্য। এগুলো ব্যক্তিগত ও সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিটি স্তরে পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা দেয়।
ইসলাম বিশ্বাসীদের মানবতার সম্মান ও মর্যাদা শেখায়, বিশেষ করে মুসলমানের জীবন ও রক্তের পবিত্রতা বজায় রাখার গুরুত্বের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে। এটি অনুভূতি জাগায়, ধর্মের সর্বাপেক্ষা পবিত্র সম্পর্কের ভিত্তিতে মুসলিমরা একে অপরের ভাই।
আমরা সেই রাসুল (সা.) এর উম্মত, যিনি সমগ্র জগতের জন্য রহমত। যাঁর রহমত ও ভালোবাসা আমাদের নিজেদের ও অন্যদের সবার জন্য প্রযোজ্য। তিনি যে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন তার উদ্দেশ্য শুধু নিজেদের কল্যাণ বা মুসলিমদের মঙ্গলের জন্য নয়; বরং এটি মানবজাতির কল্যাণ ও উন্নতির জন্যও ছিল। আমরা যদি মহানবী (সা.) এর সীরাতকে অনুসরণ করে আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে পৃথিবীতে শান্তি, নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা প্রচার করি, তাহলে এই পৃথিবী শান্তি ও নিরাপত্তার কেন্দ্রে পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে লোক সৃষ্টির (মানুষ ও জীবজন্তু) ওপর দয়া করে, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করবেন। যারা পৃথিবীতে বাস করে, তোমরা তাদের প্রতি দয়া করো, যিনি আসমানে রয়েছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি)
নবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমরা বিশ্বাসীদের মধ্যে এমন দয়া, ভালোবাসা এবং একে অপরের কষ্ট অনুভব করবে, যেমন এক শরীরের কোনও অংশে কষ্ট হলে পুরো শরীরেই কষ্ট অনুভূত হয়।’ (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি)
তিনি বলেন, ‘সব মুমিন এক শরীরের মতো; যদি এক চোখে ব্যথা লাগে, তবে পুরো শরীরই ব্যথা অনুভব করে! আর যদি মাথা ব্যথা পায়, তবে পুরো শরীরই ব্যথা অনুভব করে।’ (সহিহ মুসলিম)
হজরত মোহাম্মদ (সা.) সব মুসলিমকে এক শরীরের মতো ঘোষণা করেছেন। মুসলিমদের বেঁচে থাকা ও মর্যাদা পারস্পরিক ঐক্য এবং বোঝাপড়ার কৌশলের মধ্যে নিহিত। মুসলিমদের মধ্যে বোঝাপড়া এমন একটি কাজ, যা ইবাদতের থেকেও উত্তম আখ্যা দেওয়া হয়েছে। একজন মুমিন মুসলমান অন্য মুমিনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না, অন্যায় করে না, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয় না, এবং তার কোনও বৈধ ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করতে পারে না।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘(সত্যিকারের) মুসলিম হলো ওই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত দ্বারা অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি ও মুসলিম) তিনি আরও বলেন, ‘মুসলিম, মুসলিমের আয়না। মুসলিম, মুসলিমের ভাই; সে তার থেকে সেই জিনিস প্রতিহত করে যা তার ধ্বংসের কারণ হতে পারে এবং তার অনুপস্থিতিতেও তাকে রক্ষা করে।’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)
ইসলামি শিক্ষাগুলো পাঠ করা সৌভাগ্যের কারণ, তা বোঝা হেদায়তের কারণ এবং তা অনুসরণ করা মুক্তির কারণ। তাই আসুন, সমাজে মহানবী (সা.) এর নামের আলো ছড়াই, অন্ধকার ও জাহিলিয়াতের ছায়া দূর করি এবং পৃথিবীকে ফুলের বাগান হিসেবে গড়ে তুলি। নিঃসন্দেহে আজ আমাদের প্রিয় দেশ এবং সমগ্র উম্মতে মুসলিমার জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন
লেখক: মাদ্রাসাশিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী









