লৌকিকতা ইবাদত ও সৎকর্ম ধ্বংস করে দেয়

বেলায়েত হুসাইন
১০ জুলাই ২০২৬, ১৩:২৫আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ১৩:২৫

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে তোমাদের দান-সদকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মতো, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার ওপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়লো, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেললো। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোনও কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, যে আমল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন সওয়াব লাভের আশায় না করে, বরং নাম-যশ, লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়, সে আমলের ওপর কোনও সওয়াব পাওয়া যায় না; বরং সেই আমল বিনষ্ট ও বরবাদ হয়ে যায়।

অনুরূপভাবে, সেই সদকা ও দান-খয়রাতও বাতিল ও অকার্যকর বলে গণ্য হয় এবং সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যার পর দানকারী অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় (খোঁটা দেয়) এবং অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে কষ্ট দেয়।

এ কারণেই সর্বশেষ নবী মোহাম্মদ (সা.) তার উম্মত সম্পর্কে এ বিষয়ে খুব আশঙ্কা করতেন, কোথাও এমন না হয় যে, আমার উম্মত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। তাই তিনি তার বাণীর মাধ্যমে এর অনিষ্ট ও ধ্বংসাত্মক পরিণতি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তি তাদের প্রতিপালকের দরবারে উপস্থিত হবে। তাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হবে এমন একজন, যে শহীদ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়ায় প্রদত্ত নিয়ামতগুলো স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে সেই নিয়ামতগুলোর স্বীকৃতি দেবে। এরপর আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘এসব নিয়ামতের বিনিময়ে দুনিয়ায় তুমি আমার জন্য কী করেছিলে?’ সে বলবে, ‘আমি আপনার পথে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছি।’

তখন প্রতিপালক বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি তো জীবন উৎসর্গ করেছিলে এ জন্য যে, মানুষ তোমাকে বীর ও শহীদ বলবে। সুতরাং তোমাকে তো শহীদ বলাই হয়েছে।’ এরপর আল্লাহ বলবেন, ‘হে ফেরেশতারা! একে নিয়ে যাও এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করো।’ তখন ফেরেশতারা তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।

এরপর দ্বিতীয় একজন ব্যক্তি তার প্রতিপালকের দরবারে উপস্থিত হবে, যে হবে একজন আলেম ও কারী। মহান প্রতিপালক তাকেও দুনিয়ায় দেওয়া নিয়ামতগুলো স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সেই নিয়ামতগুলোর স্বীকৃতি দেবে।

এরপর মহান প্রতিপালক তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘এসব নিয়ামতের বিনিময়ে দুনিয়ায় তুমি আমার জন্য কী করেছ?’ সে বলবে, ‘আমি ইলম অর্জন করেছি এবং মানুষকে শিক্ষা দিয়েছি। আমি পবিত্র কোরআন পড়েছি এবং অন্যদেরও পড়িয়েছি।’

তখন মহান প্রতিপালক বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি ইলম অর্জন করেছিলে এবং শিক্ষা দিয়েছিলে এ উদ্দেশ্যে যে, তোমাকে আলেম বলা হবে। আর কোরআন পড়েছিলে ও পড়িয়েছিলে এ উদ্দেশ্যে যে, তোমাকে কারী বলা হবে। সুতরাং দুনিয়ায় তো তোমাকে তা-ই বলা হয়েছে।’

এরপর আল্লাহ বলবেন, ‘হে ফেরেশতাগণ! একে নিয়ে যাও এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করো।’ তখন ফেরেশতারা তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।

এরপর সর্বশেষ একজন দানশীল ব্যক্তি তার প্রতিপালকের দরবারে উপস্থিত হবে। আল্লাহ তাআলা তাকেও দুনিয়ায় প্রদত্ত নিয়ামতগুলো স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে সেই নিয়ামতগুলোর স্বীকৃতি দেবে। এরপর প্রতিপালক বলবেন, ‘এসব নিয়ামতের বিনিময়ে দুনিয়ায় তুমি আমার জন্য কী করেছ?’

সে বলবে, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার সমস্ত সম্পদ আপনার সৃষ্টির জন্য ব্যয় করেছি।’ তখন মহান প্রতিপালক বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি সম্পদ ব্যয় করেছিলে এ জন্য যে, মানুষ তোমাকে দানশীল বলবে। সুতরাং দুনিয়ায় তো তোমাকে দানশীল বলাই হয়েছে।’

এরপর আল্লাহ বলবেন, ‘হে ফেরেশতাগণ! এই দানশীল ব্যক্তিকে নিয়ে যাও এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করো।’ তখন ফেরেশতারা তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, হাদিস: ১৯০৫)

এই দীর্ঘ হাদিস থেকে প্রমাণিত হলো যে, একমাত্র সেই ইবাদতই কবুলযোগ্য, যা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই করা হয়। পক্ষান্তরে, যে ইবাদত আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কাউকে দেখানোর জন্য করা হয়, তা যে-ই করুক না কেন, তা জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হবে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে, তিনি তাদের ধোঁকায় ফেলে শাস্তি দেন এবং তারা যখন সালাতের জন্য দাঁড়ায়, তখন শৈথিল্যভরে দাঁড়ায়, লোক দেখানোর জন্য, তারা আল্লাহকে সামান্যই স্মরণ করে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪২)

অনুরূপভাবে, অন্য এক স্থানে নামাজে অলসতা ও গাফলতির মাধ্যমে লৌকিকতাকারীদের জন্য ধ্বংসের সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘অতএব, ধ্বংস ও দুর্ভোগ সেই নামাজিদের জন্য, যারা নিজেদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন; যারা লোক দেখানোর জন্য (ইবাদত) করে।’ (সূরা মাউন, আয়াত: ৪-৬)

অর্থাৎ, তারা যথাযথভাবে নামাজের যত্ন নেয় না; নামাজ আদায়ে অবহেলা করে। যখন মানুষের মাঝে থাকে তখন লোকদেখানো ও মানুষের সামনে নিজেদের প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ে।

এভাবেই পবিত্র কোরআনের অন্য এক আয়াতে লৌকিকতা কাফেরদের স্বভাব বলে উল্লেখ করে মুমিনদের তা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা অহংকার করতে করতে এবং মানুষের কাছে নিজেদের প্রদর্শন (লোকদেখানো) করতে করতে নিজেদের ঘর থেকে বের হয়েছিল।’ (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৪৭)

আগেই বলা হয়েছে যে, লৌকিকতা মূলত কাফেরদের স্বভাব এবং মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য। সুতরাং এ থেকে বোঝা যায় যে, রিয়া বা লৌকিকতা এক ধরনের শিরক। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘অতএব, যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকেও শরিক না করে।’ (সূরা কাহফ, আয়াত: ১১০) এ আয়াতে মুফাসসিরগণ ‘শিরক’ দ্বারা লৌকিকতাকেই উদ্দেশ্য করেছেন। আর আয়াতটির শানে নুযুল (অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট) থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়।

লৌকিকতা এবং খ্যাতির মানসিকতা ‘শিরক’। আর শিরকের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এর দ্বারা আমল বাতিল হয়ে যায়। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির আশঙ্কা করি, তা হলো ‘‘শিরকে আসগার’’ (ক্ষুদ্র শিরক)।’ তখন সাহাবায়ে কেরাম (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! শিরকে আসগার কী?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘লৌকিকতা’। (মুসনাদে আহমাদ)

আরেক বর্ণনায় রাসুল (সা.) তাঁর উম্মত সম্পর্কে শিরকের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তখন জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আপনার পর কি আপনার উম্মত শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়বে?’ তিনি ইরশাদ করলেন, ‘হ্যাঁ’! এরপর তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘তারা চাঁদ, সূর্য, পাথর ও মূর্তির উপাসনা করবে না; বরং তারা লৌকিকতা করবে এবং মানুষকে দেখানোর জন্য নেক কাজ করবে।’ (তাফসিরে ইবন কাসির)

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয়ের কথা জানিয়ে দেবো না, যা আমার কাছে তোমাদের জন্য দাজ্জালের (অর্থাৎ দাজ্জালের ফিতনার) চেয়েও বেশি ভয়ংকর?’ বলা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! অবশ্যই জানাবেন।’ তিনি (সা.) ইরশাদ করলেন, ‘তা হলো গোপন শিরক (অর্থাৎ প্রচ্ছন্ন শিরক)। এর একটি রূপ হলো, কোনও ব্যক্তি নামাজে দাঁড়িয়ে আছে, তারপর এ কারণে সে তার নামাজকে আরও সুন্দর করে তোলে যে, একজন মানুষ তাকে দেখছে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)

আমলের মধ্যে যে গোপন শিরক লুকিয়ে থাকে, রাসুল (সা.) তা তার উম্মতের জন্য ‘দাজ্জালের ফিতনার চেয়েও অধিক ভয়ংকর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এক হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য নামাজ আদায় করলো, সে শিরক করলো। যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য রোজা রাখলো, সে শিরক করলো। আর যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য সদকা করলো, সেও শিরক করলো।’ (জামিউল উলুম ওয়াল-হিকাম)

উদ্দেশ্য হলো, ‘লৌকিকতা শিরক’। কোনও ব্যক্তি যদি নামাজ, রোজা বা যে কোনও নেক কাজ লোক দেখানোর জন্য করে, তবে সে যেন শিরকই করলো। আল্লাহ তাআলা শিরক থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। যে কোনও আমলে যদি বান্দা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে শরিক করে, তবে আল্লাহ তাআলা সে আমল কবুল করেন না।

লেখক, গণমাধ্যমকর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষক

/আরকে/
সম্পর্কিত
ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলে নির্যাতন প্রতিরোধ আইন প্রযোজ্য নয়: বোম্বে হাইকোর্ট
শহীদে কারবালা হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) এর মর্যাদা
উটের মাংস খেলে কি অজু ভেঙে যায়
সর্বশেষ খবর
বাংলাদেশি নাবিকদের ভিসা সহজ করতে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা চাইলেন মন্ত্রী
বাংলাদেশি নাবিকদের ভিসা সহজ করতে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা চাইলেন মন্ত্রী
ইরানে ফের হামলা চালাতে ট্রাম্পের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ইসরায়েল
ইরানে ফের হামলা চালাতে ট্রাম্পের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ইসরায়েল
মেসি, নেইমার ও রোনালদোকে নিয়ে আবেগঘন ইয়ামাল
মেসি, নেইমার ও রোনালদোকে নিয়ে আবেগঘন ইয়ামাল
ঘুরতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরলেন এক বন্ধু, আরেকজন হাসপাতালে
ঘুরতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরলেন এক বন্ধু, আরেকজন হাসপাতালে
সর্বাধিক পঠিত
খামেনির জানাজায় লাখো মানুষের ঢল, তবে আড়ালে অন্য চিত্র
খামেনির জানাজায় লাখো মানুষের ঢল, তবে আড়ালে অন্য চিত্র
সরোয়ার আলমগীরই হলেন চট্টগ্রাম-২ আসনের এমপি
সরোয়ার আলমগীরই হলেন চট্টগ্রাম-২ আসনের এমপি
‘মদ নিষিদ্ধের’ বিল কেন প্রত্যাহার করে নিলেন জামায়াত এমপি
‘মদ নিষিদ্ধের’ বিল কেন প্রত্যাহার করে নিলেন জামায়াত এমপি
সপ্তাহে একবার নেওয়ার ইনসুলিন চালু ভারতে, দাম কত
সপ্তাহে একবার নেওয়ার ইনসুলিন চালু ভারতে, দাম কত
সাত লাখের কথা বলে দুই লাখ গাছ লাগানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বললেন ‘দুঃখজনক’ 
সাত লাখের কথা বলে দুই লাখ গাছ লাগানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বললেন ‘দুঃখজনক’