ভাঙন ঠেকাতে ঢাকা মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করলো হেফাজতে ইসলাম। যদিও দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দ্বন্দ্বের জেরে দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ঢাকার হেফাজত নেতারা। নূর হোসাইন কাসেমীকে সভাপতি ও মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনীকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রাথমিকভাবে ২৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার চট্টগ্রামে হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী এ কমিটি অনুমোদন দেন। হেফাজতের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ।
হেফাজত সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় সোমবার সকালে ঢাকার হেফাজত নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন দলের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী, মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, নূর হোসাইন কাসেমী, মুফতি ফয়জুল্লাহ, মুফতি ওয়াক্কাস, মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, মাওলানা আবদুল হামিদ, মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী, মাওলানা একে এম আশরাফুল হক, মাওলানা শেখ লোকমান হোসেন, মাওলানা ফজলুর রহমান, মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম, মাওলানা মঈন উদ্দীন রুহী, মাওলানা আনাস, মাওলানা যুবাইর আহমদ প্রমুখ।
বৈঠকে ঢাকার হেফাজত নেতাদের কেউ কেউ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ-দুইভাগে বিভক্ত করে নতুন কমিটি ঘোষণার দাবি জানান। তবে হেফাজত আমির ঐক্য ধরে রাখতে সমঝোতার ভিত্তিতে ঢাকা মহানগরের একক কমিটি গঠন করে দেন। ঢাকার বারিধারা ও লালবাগ, কামরাঙ্গিচর মাদ্রাসাকেন্দ্রীক হেফাজত নেতাদের বিরোধ মিটাতে দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদ। নতুন এ কমিটির সভাপতি বারিধারা মাদ্রাসা এবং সাধারণ সম্পাদক লালবাগ মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট।
জানা গেছে, ঢাকার হেফাজতের নবগঠিত কমিটিতে প্রাথমিকভাবে ২৯টি পদ বণ্টন করা হয়েছে। পরবর্তীতে আরও পদ বণ্টন করা হবে। নতুন এই কমিটির সভাপতি নূর হোসাইন কাসেমী, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী, সহ-সভাপতি মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মাহফুজুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম, দফতর সম্পাদক আলতাফ হোসেন, প্রচার সম্পাদক মুফতি ফখরুল।
জানা গেছে, অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে হেফাজতের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও সংগঠনটির বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় নেতা ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল নেতা। হেফাজতের ঢাকার নেতৃত্বে ছিলেন লালবাগ ও বারিধারার দুই মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা, যারা একই সঙ্গে দু’টি ইসলামি রাজনৈতিক দলের নেতাও। লালবাগের জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় হেফাজত নেতারা ইসলামী ঐক্য জোটেরও নেতা। অন্যদিকে বারিধারার জামি'আ মাদানিয়া মাদ্রাসার হেফাজত নেতারা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নেতা। হেফাজতে নিজ দলের প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে মতপার্থক্য শুরু হয়। দ্বন্দ্বের কারণে সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল না ঢাকা মহানগর হেফাজতের। চট্টগ্রাম থেকে সিদ্ধান্ত এলেও বাস্তবায়ন হয়নি ঢাকাতে। ঢাকার কেন্দ্রীয় নেতাদের কর্তৃত্বের লড়াইয়ের বিপর্যস্ত ছিল মহানগর হেফাজত।
সূত্র জানায়, নূর হোসাইন কাসেমী হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগর কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্যদের প্রাধান্য না দিয়ে নিজের মতামতকে চূড়ান্ত বলে চালিয়ে দিতেন। এ নিয়ে শুরু থেকেই বিভাজন তৈরি হয়। ৫ মে শাপলা চত্বরে লালবাগপন্থীদের বিতর্কিত ভূমিকার জন্য লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়া থেকে হেফাজতের ঢাকা অফিস বারিধারায় স্থানান্তর করা হয়। এই স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে লালবাগকেন্দ্রীক ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নূর হোসাইন কাসেমীর দূরত্ব বাড়ে। এই দূরত্বের কারণে মহানগর কমিটি এক সঙ্গে বসে কোনও সিদ্ধান্তও নিতে পারেনি। যে কারণে ঢাকার নেতারা সব সময় চট্টগ্রামের নেতৃত্ব মেনে নিতেন এবং আল্লামা শফীর নির্দেশনা গ্রহণ করতেন। লালবাগ মাদ্রাসার হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে ৫ মে’র সময় আহমদ শফীকে নিয়ন্ত্রণে রেখে হেফাজতের সব কর্মসূচিকে জামায়াতের সহযোগিতায় হিংসাত্মক ও জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে। বারিধারায় হেফাজতের কার্যালয় স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত রাজধানীতে হেফাজতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতো লালবাগপন্থীরা। গত দুই বছর ধরেই লালবাগ ও বারিধারা মাদ্রাসার নেতারা পৃথক পৃথকভাবে বৈঠক করাসহ বিবৃতি দিয়ে আসেছেন।
নতুন কমিটি গঠনের কথা নিশ্চিত করে হেফাজতের কেন্দ্রীয় মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দীর্ঘ দিন ধরেই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া ছিল। আজকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটিতে আরও অনেককে অর্ন্তভূক্ত করা হবে। এতে করে অতীতে মনোমালিন্য থাকলেও তা দূর হবে।
নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হেফাজতের আমির আহ্বায়ক কমিটি থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। নতুন এই কমিটি গঠন করায় সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল হবে।
আরও পড়তে পারেন: মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনককে নিয়ে কটূক্তি করলে যাবজ্জীবন
/সিএ/এমএসএম/








