একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে বড় বড় রাজনৈতিক দল ও জোটের পক্ষ থেকে। মূলত নির্বাচনে ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই ইশতেহারগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। এসব ইশতেহারের কিছু কিছু বিষয় ভোটারদের আশাবাদী, আবার পছন্দের দলের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রতিশ্রুতি না পেয়ে সমালোচনাও করছেন অনেকে। ইশতেহার প্রকাশের লক্ষণীয় দিক হচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বার্থে গড়ে ওঠা বৃহৎ তিন রাজনৈতিক জোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের পক্ষ থেকে ইশতেহার ঘোষণা না করা হলেও বাম দলগুলোর মোর্চা বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং বিএনপি ও গণফোরাম নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সুবিশাল ইশতেহার ঘোষণা। তবে জোটের বাইরে রাজনৈতিক দল হিসেবে মহাজোটের শরিক আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি এবং ঐক্যফ্রন্টের শরিক বিএনপি স্বতন্ত্রভাবে নিজ নিজ ইশতেহার প্রকাশ করেছে। এর বাইরে দেশের বেশিরভাগ আসনে এককভাবে প্রার্থী দেওয়া ইসলামী আন্দোলনেরও ইশতেহার ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাম গণতান্ত্রিক জোট
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবার আগে ইশতেহার প্রকাশ করে বাম গণতান্ত্রিক জোট। গত ১২ ডিসেম্বর পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে বাম গণতান্ত্রিক জোটের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন জোটের নতুন সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম। ৩২ দফার এই নির্বাচনি ইশতেহারে ক্ষমতায় এলে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও রাজনীতির সংস্কারের বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়, দুর্নীতি-লুটপাট-দলীয়করণ, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও জনদুর্ভোগ লাঘব, ধনী-গরিবের বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কথা বলা হয়েছে। (বাম গণতান্ত্রিক জোটের ইশতেহারে মূল অঙ্গীকার পড়ুন এখানে)
এ জোটের ইশতেহারে ঘোষিত ‘৩২ দফা’ প্রতিশ্রুতির উল্লেখযোগ্যগুলো হচ্ছে:
- মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সংবিধান, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও রাজনীতির সংস্কার সাধনে নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বিপদ পরিহার করার জন্য যৌথতা ও জবাবদিহির বিধান আরও স্পষ্ট করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।
- প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক অগণতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর সাংবিধানিক ভিত্তি পরিবর্তন করা।
- মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাসহ কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
- গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নে জাতীয় সংসদ সদস্যদের পরিবর্তে নির্বাচিত স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার হাতে স্ব-স্ব স্তরের প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্ব অর্পণ করা।
- নির্বাচনি ব্যবস্থার আমূল সংস্কারে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালুসহ জোটের ৫৪-দফা সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচনি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা।
- ‘না’ ভোট প্রদানের বিধান চালু করা। ভোট প্রদানে বাধা প্রদান আইন করে বন্ধ করা।
- বিকল্প অর্থনৈতিক নীতি ও ব্যবস্থাপনায় জাতীয় অর্থনীতি ও দেশীয় শিল্প বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে- এমন বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণ গ্রহণ বন্ধ করা।
- বহুজাতিক সংস্থা ও বিদেশি পুঁজির জাতীয় স্বার্থবিরোধী অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাসে কর্মক্ষম সব মানুষের জন্য ক্রমান্বয়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে নিয়মিতভাবে দেশের সর্বত্র সারা বছর ‘কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা স্কিম’ চালু করা।
- ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’নীতি গ্রহণ করা।
- দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ‘উৎপাদক সমবায়’ও ‘ক্রেতা সমবায়’ গঠন করে তাঁদের মধ্যে সরাসরি কেনা-বেচার ব্যবস্থা চালু করা।
জাতীয় পার্টি
এরপর ১৪ ডিসেম্বর ইশতেহার ঘোষণা করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বড় শরিক সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি। তবে ইশতেহার ঘোষণার কয়েক দিন আগেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে চলে যান জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বনানীতে দলটির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে তার পক্ষে দলের ইশতেহার ঘোষণা করেন চেয়ারম্যানের বিশেষ সহকারী ও সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। এ নির্বাচনি ইশতেহারে আগামী দিনে সরকার পরিচালনায় সুযোগ পেলে দেশের সবক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, সুষ্ঠু গণতন্ত্রের বিকাশ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারসহ ১৮টি কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দেয় জাতীয় পার্টি।
অপর দফাগুলোর মধ্যে প্রাদেশিক ব্যবস্থা প্রবর্তন, নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার, পূর্ণাঙ্গ উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, কৃষকের জন্য ভর্তুকি মূল্যে সার, ডিজেল, কীটনাশক সরবরাহ, কর-শুল্ক মওকুফ, সহজ শর্তে ঋণ, সন্ত্রাস দমনে কঠোর ব্যবস্থা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, ফসলি জমি নষ্ট না করা, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা পদ্ধতির সংশোধন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, শান্তি ও সহাবস্থানের রাজনীতি প্রবর্তন, সড়ক নিরাপত্তা, গুচ্ছগ্রাম পথকলি ট্রাস্ট পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পল্লি রেশনিং চালু, শিল্প ও অর্থনীতির অগ্রগতি সাধন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষিত রেখে সংসদে মোট ৩৮০টি আসনের কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে। (জাতীয় পার্টির ইশতেহারে ১৮ প্রতিশ্রুতি পড়ুন এখানে)
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট
এরপর গত ১৭ ডিসেম্বর ইশতেহার প্রকাশ করে বিএনপি ও গণফোরাম নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এদিন দুপুর রাজধানীর হোটেল পূর্বাণীতে সংবাদ সম্মেলন করে ইশতেহার প্রকাশ করেন ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রধান নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ ঐক্যফ্রন্টের অন্য কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত প্রায় প্রতিটি বিষয়ই এ ইশতেহারে এনে চমক সৃষ্টি করেছে ঐক্যফ্রন্ট। শিক্ষার্থীদের পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীদের মামলা প্রত্যাহার ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীর জন্য কোটা প্রথা পুরোপুরি তুলে দেওয়া, চাকরির বয়স নিয়ে আন্দোলনকারীদের জন্য পুলিশ ও সামরিক বাহিনী ছাড়া সরকারি চাকরিতে কোনও বয়সসীমা থাকবে না, সাংবাদিক ও অনলাইন ব্যবহারকারীদের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এ ইশতেহারে।
এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, সরকারের দুর্নীতি তদন্ত করে বিচার করা, নির্বাচনকালীন সরকারের বিধান তৈরি করাসহ অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে ঐক্যফ্রন্ট। এসব অঙ্গীকার পাঁচ বছরের মধ্যে পূরণ করা হবে বলে ইশতেহারে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, পর পর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকা যাবে না। জেলা পরিষদ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সর্বদলীয় সত্যানুসন্ধান ও বিভেদ নিরসন কমিশন গঠন, হত্যা ও গুম পুরোপুরি বন্ধ করা হবে, গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি হবে ১২ হাজার টাকা। প্রথম বছরে গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে। (জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পুরো ইশতেহার পড়ুন এখানে)
আওয়ামী লীগ
এর একদিন পর ১৮ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকালে দুটি ভিন্ন স্থানে দলীয় ইশতেহার প্রকাশ করে যথাক্রমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এদিন সকাল ১০টায় রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ইশতেহার ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ভূখণ্ডের যা কিছু মহৎ অর্জন ও প্রাপ্তি, সবকিছু অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত করা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধিকার এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা অর্জন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচার উৎখাত এবং ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার টানা ১০ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে বিপুলভাবে বিজয়ী করে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশত বার্ষিকীকে লক্ষ্য করে আমরা নির্বাচনি ইশতেহার রুপকল্প-২০২১ ঘোষণা করেছিলাম। যার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। ২০১৪ সালে দশম নির্বাচনের আগে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে রুপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করেছিলাম। আপনারা ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো সরকার পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়ে সেই রুপকল্প বাস্তবায়নের কর্মযজ্ঞকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। সাফল্যের সবটুকু আপনাদের অবদান।
তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশ আর্থিক দিক থেকে যেমন শক্তিশালী, তেমনি মানসিকতার দিক থেকে অনেক বলীয়ান। ছোটখাটো অভিঘাত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারবে না। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা দিয়েছে। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত করেছে। মাথাপিছু আয় ২০০৬ সালের ৫৪৩ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৭৫১ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ওপর। দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৪১.৫ শতাংশ থেকে ২১.৮ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে।
অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি আজ বাংলাদেশ। বিগত দশ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার প্রায় ৫ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৮২ হাজার কোটি থেকে প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের মধ্যে ৩১তম। এইচ.বি.এস.সি’র প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে।
টানা ১০ বছর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ইশতেহারের দিকে লক্ষ্য ছিল সব পক্ষের। তাদের উদ্দেশে দলীয় ইশতেহারে ২১টি অঙ্গীকার করেন শেখ হাসিনা। এগুলো হলো:
১. আমার গ্রাম, আমার শহর- প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ, ২. তারুণ্যের শক্তি-বাংলাদেশের সমৃদ্ধি: তরুণ যুব সমাজকে দক্ষ জনশক্তিকে রূপান্তরিত করা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, ৩. দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, ৪. নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতা ও শিশুকল্যাণ, ৫. পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা, ৬. সন্ত্রাস-সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূল, ৭. মেগা প্রজেক্টগুলোর দ্রুত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন, ৮. গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করা, ৯. দারিদ্র্য নির্মূল, ১০ সকল স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধি, ১১. সকলের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা, ১২. সার্বিক উন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার, ১৩. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, ১৪. আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা- লক্ষ্য যান্ত্রিকীকরণ, ১৫. দক্ষ ও সেবামুখী জনপ্রশাসন, ১৬. জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ১৭ ব্লু ইকোনোমি- সমুদ্র সম্পদ উন্নয়ন, ১৮. নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা, ১৯ . প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও অটিজম কল্যাণ, ২০. টেকসই উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ও ২১. সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
(আওয়ামী লীগের পুরো ইশতেহার পড়ুন এখানে)
বিএনপি
অন্যদিকে, একইদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর লেকশোর হোটেলে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ইশতেহারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে দেওয়া ইশতেহারের অনেক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মিল থাকলেও বেশ কিছু বিষয়ে স্বাতন্ত্র্যও পাওয়া গেছে। ১৯ দফার এই ইশতেহারে ইশতেহারে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, বিচার বিভাগ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, অর্থনীতি, মুক্তিযোদ্ধা, যুব নারী ও শিশু, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, জ্বালানি, তথ্য ও প্রযুক্তি, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, বৈদেশিক ও প্রবাসী কল্যাণ, কৃষি ও শিল্প, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, প্রতিরক্ষা ও পুলিশ, আবাসন, পেনশন ফান্ড ও রেশনিং ফান্ড প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ, পররাষ্ট্র এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এতে ক্ষমতায় গেলে প্রথম ৩ বছরে দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থায় মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দুই লাখ লোককে সরকারি চাকরি দেওয়ার এবং পুরো পাঁচ বছর মেয়াদকালে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও এক বছরব্যাপী অথবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত, যেটাই আগে হবে, শিক্ষিত বেকারদের বেকার ভাতা দেওয়া এবং এদের যৌক্তিক অর্থনৈতিক উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও তরুণ দম্পতি ও উদ্যোক্তাদের সাবলম্বী হওয়ার জন্য ২০ বছর মেয়াদি ঋণ চালু করার কথা বলা হয়েছে। দলটির ইশতেহারে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম বছরে বিদ্যুৎ ও আবাসিক গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হবে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যে সকল প্রকার অসঙ্গতি দূর করাসহ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করার প্রতিশ্রুতি এসেছে। এছাড়াও কোটা সংস্কার, ভ্যাট বাতিল, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে যেসব শিক্ষার্থী মামলায় পড়েছে সেসব মামলা পুরোপুরি প্রত্যাহার ও তাদের ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে শর্তসাপেক্ষে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য অতীতের সমস্যার আলোকে নিরূপণ ও এজন্য সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে স্বচ্ছ আলাপ-আলোচনা করা, পুলিশ ও সামরিক বাহিনী ছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময়সীমা তুলে দেওয়া, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ, সকল খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ইত্যাদি অঙ্গীকার করা হয়েছে।
তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে চলমান রাখার অঙ্গীকার থাকলেও বিএপির ইশতেহারে না থাকায় বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির একাধিক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বিএনপি বরাবরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে। তবে তা হতে হবে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। আর নিজেদের ইশতেহারে না থাকলেও তাদের জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে এ বিষয়টি থাকা প্রমাণ করে বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। (বিএনপির পুরো ইশতেহার পড়ুন এখানে)
এসব দল ও জোটের বাইরে ইশতেহার প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দেশের প্রায় প্রতিটি আসনে প্রার্থী দেওয়া এই ইসলামি দলটির ইশতেহার আগামী ২১ ডিসেম্বর ঘোষণার কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ১৮ বছর হলেই বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ: ইশতেহারে জাসদ








