ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় ত্রাণ দিলেও সরকারিভাবে ত্রাণকাজে সমন্বয়ের অভাব দেখছেন বিএনপির সাত এমপি। তাদের অভিযোগ, সরকারিভাবে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারি ত্রাণ বিতরণ করা হলেও এ সম্পর্কে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের কিছুই জানানো হয় না। এমপিদের মাধ্যমে বিতরণের জন্য ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ না থাকলেও সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণে জেলা কমিটির উপদেষ্টা রয়েছেন স্থানীয় এমপিরা। তবে সরকারি ত্রাণ বিতরণে ক্ষমতাসীন দল ও দলটির জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা বা পরামর্শ করেই ত্রাণ বিতরণ চলছে। বিএনপির এমপিদের এ কাজে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না, এমনটাই অভিযোগ দলটির প্রতিনিধিদের।
সরকারি ত্রাণ সরাসরি জনপ্রতিনিধিদের জন্য বরাদ্দ নেই উল্লেখ করে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারি ত্রাণ সরাসরি ডিসি, ইউএনও, পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা বিতরণ করবেন। তবে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা করে ত্রাণ সমন্বয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা চাইলে এলাকার অসহায়-দুস্থদের তালিকা প্রস্তুতের সময় সহযোগিতা করতে পারেন।’
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের এমপি জাহিদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি সরকারি ত্রাণ বিতরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। সরকারি ত্রাণ নিয়ন্ত্রণ করছেন জেলা প্রশাসক। আমাকে কোনও দিন ডাকেও নাই এবং কোনও পরামর্শও নেননি। সরকার দলীয় এমপিদের গোপনে তারা কিছু দিচ্ছেন কিনা জানি না। সরকারি কী বরাদ্দ হচ্ছে না হচ্ছে এর কিছুই জানি না।’
তবে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি ত্রাণ ইউএনও সাহেবকে দিয়ে দিয়েছি। ওনার কোনও বক্তব্য থাকলে সেখানে বলতে পারেন। আর আমাদের এখানে ওইভাবে কোনও মিটিং করা হয় না। তবে গতকাল সচিব মহোদয়ের সঙ্গে মিটিংয়ে জাহিদ সাহেব উপস্থিত ছিলেন।
সরকারি কোনও ত্রাণ বিতরণে নিজের অংশগ্রহণ নেই উল্লেখ করে বগুড়া-৪ আসনের এমপি মোশাররফ হোসেন বলেন, আমার নিজের সংসদ সদস্য হিসেবে এক মাসের বেতন এক লাখ ৭৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে দুই উপজেলার প্রশাসনকে ৫০ হাজার টাকা করে নগদ এবং সঙ্গে সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্কও দিয়ে এসেছি। এলাকার অসহায় মানুষদের একশ’ মণ চাল এবং একশ’ মণ পেঁয়াজ, ডাল ও তেল দিয়ে এসেছি। এরপরও ব্যক্তিগতভাবে আমি যতটুকু পারছি, সেই সহযোগিতা তো করছিই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ত্রাণ বিতরণে সরকার থেকে আমি কোনও সহযোগিতা পাইনি। আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলার দুই হাজার পরিবারকে সহায়তা দিয়েছি। রমজানে এই সহায়তা কর্মসূচি আবারও শুরু হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোনও এমপিকে সরাসরি সরকারি ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে না। প্রত্যেক জেলায় এমপি, রাজনৈতিক দলের নেতা, মসজিদের ইমামসহ অন্যান্য ব্যক্তির সমন্বয়ে ত্রাণ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারাই এলাকার দুস্থ মানুষদের তালিকা তৈরি করছেন। সেখানে কারও দলীয় পরিচয় দেখা হচ্ছে না। এরপরও বিএনপির এমপিদের দুস্থদের কোনও তালিকা থাকলে তারা জেলা প্রশাসককে দিতে পারেন। সেটা যাচাই-বাছাই করে ত্রাণ দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, এর বাইরে বিএনপি দলীয়ভাবে কাউকে ত্রাণ দিতে চাইলে তারা তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসককে দিলে সহযোগিতা দেওয়া হবে। এ পরিস্থিতি কারও একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। আমরা সবাইকে নিয়ে সমন্বয় করে কাজ করছি।
এদিকে, জাতীয় সংসদে দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন বিএনপির সাত জন সংসদ সদস্য। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে নিজেদের এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করলেও অনেকেই এলাকায় যাননি। তবে, এসব এমপি বলছেন, ঢাকায় অবস্থান করলেও ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন তারা।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আমিনুল ইসলাম তার নিজ নির্বাচনি এলাকার ভোলাহাট, গোমস্তাপুর ও নাচোল উপজেলার দুস্থ মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করছেন। পাশাপাশি তিনি নিজ এলাকার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জাম মাস্ক ও পিপিই দিয়েছেন। তবে দলটির চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের অপর সংসদ সদস্য হারুন অর রশীদ শুরুর দিকে কিছুটা ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করলেও এখন নাকি তিনি সক্রিয় নেই।
এ বিষয়ে হারুন অর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন মানুষ তো ত্রাণের জন্য পাগল, তাদের তো এখন অন্য কোনও কাজ নেই। আমাদের তো ত্রাণ দেওয়ার দায়িত্ব নেই। প্রশাসনিকভাবে দায়িত্ব দিয়েছে, ইউনিয়ন মেম্বার-চেয়ারম্যানরা ত্রাণ দিচ্ছেন। আমরাও বিভিন্নভাবে প্রশাসনকে পরামর্শ দিচ্ছি। আর ত্রাণের পরিমাণ তো খুবই অপ্রতুল, মানুষের চাহিদা অনুযায়ী তা খুবই কম।
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি কিছু অসহায় মানুষকে সহায়তা করেছি। আমাদের দলের যার যা সামর্থ্য আছে সেই অনুযায়ী সাহায্য করছে। দেশের এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষ খুব সমস্যায় পড়বে। এখন বড় সমস্যা হয়ে গেছে খাদ্যের জোগান দেওয়া।
এখন নিজ নির্বাচনি এলাকায় না থাকলেও আগে এলাকায় গিয়েছিলেন বলেও জানান হারুন।
এদিকে নিজ এলাকায় না থাকলেও দলীয় নেতাকর্মী ও অসহায় মানুষদের নিয়মিত খোঁজ রাখছেন বলে দাবি করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি সব সময় মানুষের পাশে ছিলাম, এখনও আছি। এই দুর্যোগে আমার যা করণীয়, সবই নিয়মিত করে যাচ্ছি। এটা তো একা কারও পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব না, তাই সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম টিপু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের পরে দুই এমপির কেউ এলাকায় আসেননি। তারা মনে হয় ঢাকাতেই আছেন। তবে আমিনুল ইসলাম নিজ এলাকার তিনটি উপজেলায় মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। আরেক এমপি হারুন সাহেবও কিছুটা সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।’
তিনি আরও বলেন, ‘দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এলাকায় ত্রাণ ও জীবাণুনাশক স্প্রে করেছেন। আমরা বিএনপি থেকে দলীয়ভাবে রমজানে এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করবো।’
বিএনপি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বগুড়া জেলায় বিএনপির দুই জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। জানা গেছে, বগুড়া-৪ আসনের এমপি মোশাররফ হোসেন নিজ সংসদীয় এলাকা কাহালু ও নন্দীগ্রাম উপজেলায় নিজে গিয়ে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। আর বগুড়া-৬ আসনের এমপি জিএম সিরাজ দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলে আর এলাকায় যাননি। তবে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম নিয়মিত বিরতিতে অব্যাহত রেখেছেন।
মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৬-৭ দিন আগে আমি এলাকায় গিয়েছিলাম। এখন ঢাকায় আছি। যখন এলাকায় গিয়েছি তখন প্রত্যেক হাট-বাজারে গিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়েছি।’
বগুড়া জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বগুড়া-৬-এর এমপি জিএম সিরাজ এলাকায় আসেননি। তবে তিনি তার লোক ও আমাদের দিয়ে তার উপজেলা ও সদরে অসহায় মানুষদের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য উকিল আব্দুল সাত্তার ভুঁইয়া। দলটির সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার নির্বাচনি এলাকাও এটি। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে দলের মনোনয়নও চেয়েছেন। দেশের করোনা সংকটের সময়ে এই দুই জনের কেউ এলাকায় যাননি। তবে তারা এই আসনের অন্তর্ভুক্ত সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলায় কিছু ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
জেলা বিএনপির সভাপতি হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়লে দুই এমপির কেউ এলাকায় আসেননি। এরমধ্যে আবদুস সাত্তার সাহেব অসুস্থ এটা জানি। আর রুমিন ফারহানার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছেন দলীয় লোকদের দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলায় কিছু সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন।
ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের এমপি জাহিদুর রহমান। বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে তিনি কেবল নিজ নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান করছেন।
জাহিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি এলাকাতেই আছি। মানুষের চাহিদা প্রচুর। কারও একার পক্ষে এটা পূরণ করা সম্ভব নয়। সরকারের পক্ষেও সম্ভব নয়। আমি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে যতটুকু পারছি মানুষকে সাহায্য করছি। তবে এমন পরিস্থিতিতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।








