বাংলাদেশের ৪৫তম বিজয় দিবসে স্বাধীনতা রক্ষার মিছিলে অংশ নেওয়া ইসলামী ছাত্রশিবিরই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠন ছাত্রসংঘ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ে বলা হয়েছে- বর্তমানে ছাত্রশিবির সংগঠনটি একাত্তরে ছাত্রসংঘ নামে পরিচিত ছিল এবং এই কর্মীরাই আল-বদরের কর্মী হিসেবে পাকিস্তানের সহযোগী সংগঠন ছিল। ৪৪ বছর পর স্বাধীনতাবিরোধীদের স্বাধীনতা রক্ষার ঘোষণাকে ইতিহাস অস্বীকারের অপচেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন স্বাধীনতার পক্ষের সংগঠনগুলো। একইসঙ্গে তারা অপরাধী সংগঠন হিসেবে প্রমাণিত হওয়ার পরও এমন প্রচারণায় নামাটাকে ধৃষ্টতা উল্লেখ করে তারা বলছেন- তারা পুনর্বাসিত হতে আবারও নীলনকশা করছে এবং দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী একাত্তরে যে ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল সেগুলো আবারও সামনে আনা প্রয়োজন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা আল-বদর নামে বুদ্ধিজীবীসহ বাঙালি নিধনে মেতেছিল গতকাল বুধবার সেই সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নামে রাজধানীর রাস্তায় প্রকাশ্যে বিজয় র্যালি করেছে। র্যালিতে ব্যবহৃত ব্যানারে লেখা ছিল ‘স্বাধীনতা এনেছি, স্বাধীনতা রাখবো’! তারা কোন স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলছেন সে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পরিচালনাকারী প্রসিকিউশন।
১৯৭১ এ শান্তিকমিটির মিছিল
১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল বায়তুল মোকাররমে জোহরের নামাজের পর একটি মিছিল বের করে শান্তি কমিটি। ‘পাক-চীন জিন্দাবাদ, দুষ্কৃতিকারীরা দূর হও, মুসলিম জাহান এক হও, ভারতকে খতম কর’ ইত্যাদি ফেস্টুন নিয়ে মিছিলটি ঢাকার প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে নিউমার্কেটে গিয়ে শেষ হয়। মিছিল শেষে খাজা খয়েরউদ্দিন বক্তৃতা করেন এবং মোনাজাত পরিচালনা করেন গোলাম আযম। সমাবেশ শেষে মিছিলকারীরা আজিমপুর কলোনিসহ বিভিন্ন স্থানে বাঙালিদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি অনেক হত্যাকাণ্ড চালায়।
যারা মিছিল করেছিল তাদের উত্তরসূরিদের স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরের মিছিলটিকে নিজেদের পুনর্বাসিত করার ‘নীলনকশা’ হিসেবেই দেখছেন ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন। তিনি বলেন, একদিকে মানবতাবিরোধীদের বিচার হচ্ছে আরেকদিকে তারা সংগঠনটিকে বাঁচানোর কৌশলপত্র তৈরি করছে। কিন্তু তাদের এই ‘নীলনকশা’ রুখে দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, জামায়াত বা তার অঙ্গসংগঠনকে নিষিদ্ধ বা তাদের বিরুদ্ধে বিচারের ব্যবস্থা না নিলে তারা এ ধরনের নানা কর্মকাণ্ডই করবে আর আমাদের সেটা দেখতে হবে।
বায়তুল মোকাররম থেকে বের হওয়া শান্তিবাহিনীর মিছিল
এই ছাত্রশিবিরই যে একাত্তরের ছাত্রসংঘ যারা মুক্তিযুদ্ধকালে আল-বদর হিসেবে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়েও উল্লেখ আছে। রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে বুদ্ধিজীবী নিধনে মূল ভূমিকা রাখা আল-বদর গঠিত হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়েই। ছাত্রসংঘের তৎকালীন সভাপতি মুজাহিদের বিরুদ্ধে রায়ে এ তথ্যই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে আল-বদর বাহিনী কীভাবে গঠিত হয়েছিল এবং এর সদস্য কারা ছিল এ প্রশ্ন তুলে ট্রাইব্যুনাল বলেছে- জামায়াত ইসলামীর ছাত্রশাখার কর্মীদের নিয়েই গঠিত হয় ছাত্রসংঘ এবং এটি সশস্ত্রবাহিনীর দখল কায়েমে সহযোগিতা দিয়েছিল।
আল-বদর বাহিনী গঠনে জামায়াত ইসলামের মুখ্য ভূমিকার প্রমাণ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে চলে যাওয়া শান্তি কমিটির এক চেয়ারম্যানের বই থেকেও রায়ে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়। নোয়াখালী জেলার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মহি উদ্দিন চৌধুরীর লেখা ‘সানসেট অ্যাট মিডডে’ বইটি ১৯৯৮ সালে করাচি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। বইতে তিনি বলেন, অবস্থা মোকাবিলা করতে পাকিস্তানপন্থীদের নিয়ে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানে এটা ছিল প্রথম পরীক্ষা-নিরীক্ষা যা সফল হয়েছিল। ইসলামী ছাত্রসংঘের কর্মীদের বলা হতো আল-বদর। আর দেশপ্রেমিক সাধারণ জনগণ যারা জামায়াতে ইসলামী, মুসলীম লীগ ও নিজাম-ই-ইসলামসহ বিভিন্ন দলের ছিল, তারা ছিল আল-শামস।
জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফ রাজাকার হিসেবে ছাত্রসংঘের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়
ছাত্রসংঘ নিয়ে যুদ্ধের শেষদিকে ব্যাপক নিধন চালাতে আল-বদর গঠিত হলেও যুদ্ধের শুরুতেই এই সংগঠনটিকে রাজাকার হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রমাণও মেলে। ১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনা শাহজাহান আলী রোডে অবস্থিত আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন জামায়াত কর্মীকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রাজাকার বাহিনীর সূচনা করে জামায়াত নেতা মওলানা একেএম ইউসুফ। এই আনসার ক্যাম্পই পরে অধ্যাদেশবলে রাজাকার সদর দফতর হিসেবে ঘোষিত হয়। শুরুতে এই বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট এলাকার ইসলামী ছাত্রসংঘের (জামায়াতের ছাত্রসংগঠন, যার নাম এখন ইসলামী ছাত্রশিবির) সভাপতিকে।
নিজামীর চিঠি: ছাত্রসংঘের সকল নেতাকর্মীকে আল-বদর বাহিনীতে যোগদানের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছে
ইসলামী ছাত্রসংঘের সাবেক সদস্য এবং ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের নেতা মিসবাহউর রহমান চৌধুরী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসে বলেন- ১৯৭১ সালে তার কাছে একটি নির্দেশনা পৌঁছায়, যেখানে লেখা ছিল ‘আগামী ১০ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাত্রসংঘের সকল নেতাকর্মীকে আল-বদর বাহিনীতে যোগদানের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছে। ১০ আগস্ট আপনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মৌলভীবাজার কমান্ডের অফিসে সকাল ১০টার মধ্যে মেজর ফখরুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাত করিয়া যোগদানপত্র গ্রহণ করিবেন।’
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শাহিদুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্রসংঘই যে ছাত্রশিবির সেটা নানা সময়ে প্রমাণিত এবং এই ছাত্রসংগঠনই যে একাত্তরে আল-বদরের ভূমিকা পালন করেছে তা ইতোমধ্যে বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। এখন এসে তারা স্বাধীনতা রক্ষার আওয়াজ তুললে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে যে তারা আসলে কোন স্বাধীনতা এনেছে এবং কোনটা রক্ষা করতে চায়। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হবে সেজন্যই তারা এখন অস্তিত্ব রক্ষায় পরিকল্পিতভাবে এসব বিভ্রান্তিকর কাজ করছে।
/এএইচ/







