দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন বুধবার (১৫ নভেম্বর) এই ঘোষণা দেয়। পরদিন বৃহস্পতিবার (১৬ নভেম্বর) দেশের দুই প্রধান দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। তফসিলের পর উৎসবের আমেজ আওয়ামী লীগ অফিসে। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তবে ঠিক উল্টো চিত্র বিএনপিতে। তফসিল প্রত্যাখ্যান করে হরতাল ডাকলেও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঝুলছে তালা, নেতাকর্মীরা রয়েছেন আত্মগোপনে।
বৃহস্পতিবার (১৬ নভেম্বর) সকালে তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে তফসিল নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তফসিল প্রত্যাখ্যান ও ‘নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না’ বলে বিএনপির ঘোষণার বিষয়ে ওবায়দুল কাদের এসময় বলেছেন, সামনের কয়েকটা দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (ক্রুশিয়াল)। ৩০ নভেম্বর মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। এর মধ্যে কত ফুল ফুটবে।... অপেক্ষা করুন।
এদিন সকাল থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসতে থাকেন দলটির নেতাকর্মীরা। তাদের জন্য দুপুরে খিচুড়ি বিতরণ করা হয়। বিকালে নেতাকর্মীদের ভিড়ে আরও বাড়ে। দিনভরই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছিল নির্বাচনি আমেজ, পরিবেশ সরগরম ছিল নেতাকর্মীদের ভিড়ে।
নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খলভাবে খাবার নেওয়ার নির্দেশনা দিতে দেখা যায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের দফতর সম্পাদক আলিম বেপারীকে। তিনি বলছিলেন, পর্যাপ্ত খাবার আছে, কেউ হুড়োহুড়ি করবেন না। আপনারা সুশৃঙ্খলভাবে খাবার নিন।
এদিকে, আওয়ামী লীগের সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়েও সারা দিন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের আনাগোনা লক্ষ করা গেছে। সকালে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও বিকালে ভিড় তৈরি হয়। নিজ নিজ সমর্থকদের নিয়ে অনেককে কার্যালয় চত্বরে ও বাইরের সড়কে আড্ডা দিতে দেখা গেছে।
এদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়, দলটির সভাপতির ধানমন্ডির কার্যালয়ের সামনে ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি ছিল অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষ করার মতো।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শনিবার (১৮ নভেম্বর) শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। মঙ্গলবার (২১ নভেম্বর) নাগাদ এই ফরম বিক্রি চলবে। এই চার দিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ফরম বিতরণ করা হবে। ফলে আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর নেতাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আনাগোনা এরইমধ্যে শুরু হয়ে গেছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও দলের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে।
এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই রাজধানীসহ সারা দেশে আনন্দ মিছিল করেন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগ আগে থেকেই নির্বাচনি মুডে ছিল। এখন তফসিল ঘোষণা হওয়ায় নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। এই ধারা ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
এদিকে বিএনপির ডাকা পঞ্চম দফা অবরোধের শেষ দিন ছিল বৃহস্পতিবার। এদিন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অবরোধের প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। দুপুরে নেতাকর্মীদের নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমদ মন্নাফি, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরসহ নগরের শীর্ষ নেতারা।
নীরব বিএনপি কার্যালয়
বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপের প্রস্তাবের মধ্যেও তফসিল ঘোষণা করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। বুধবার তফসিল ঘোষণার পরপরই এক ব্রিফিংয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘তফসিল জারি হলেও নির্বাচন হবে না, হতে দেওয়া হবে না।’
তফসিল ঘোষণার পর থেকে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত বিএনপির প্রধান কার্যালয়ের সামনে কোনও নেতাকর্মীকে আসতে দেখা যায়নি। তবে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে তাৎক্ষণিক ঝটিকা বিক্ষোভ মিছিল করে দলের কর্মীরা। বৃহস্পতিবার পল্টন এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকারবিরোধী অবস্থান জানিয়ে সরব থাকলেও বিএনপির কার্যালয় ছিল নীরব।
গত ২৮ অক্টোবর দলীয় মহাসমাবেশে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর বিএনপির সমাবেশ পণ্ড হলে বিকাল থেকেই দলটির কার্যালয় নিয়ন্ত্রণে নেয় পুলিশ। ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তালা। পর দিন ২৯ অক্টোবর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট বিএনপি কার্যালয়ের তিন দিকে ‘ডু নট ক্রস—ক্রাইম সিন’ লেখা হলুদ টেপ দিয়ে ঘিরে আলামত সংগ্রহ করে। এরপর থেকে গত ১৯ দিন পুলিশ সেখানে সর্বক্ষণ অবস্থানে আছে।
যদিও ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেছেন, তালা পুলিশ লাগায়নি। বিএনপির নেতাকর্মীদের অফিস করতে বাধা নেই।
তবে বুধবার (১৫ নভেম্বর) সকালে বিএনপির ডাকা পঞ্চম দফায় ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচির প্রথম দিন বিএনপি কার্যালয়ের সামনে কয়েকজন কর্মী জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকলে পল্টন থানা পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে।
বৃহস্পতিবার বিকালে নয়াপল্টনে গিয়ে দেখা যায়, বিএনপি কার্যালয় তালাবদ্ধই আছে। কার্যালয়ের সামনে সড়কে সতর্ক অবস্থান নিয়ে আছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
নির্বাচন কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে দেওয়া চিঠি ফটকের ভেতরের অংশে একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে ধুলোমাখা অবস্থায় পড়ে আছে।
বিএনপি কার্যালয়ের পাশের রাস্তার চা বিক্রেতা হাসিবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অফিসে নেতাকর্মী কাউকে আসতে দেখি না। ২৮ তারিখের পর থেকে অবরোধের কারণে এই এলাকায় দোকানপাট বন্ধ থাকে। লোকজনও চলাচল কম। পুলিশই থাকে সারাক্ষণ।
বেচাবিক্রিতে ভাটা পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘লোকজন নাই, ব্যবসা হয় কী করে? পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে মানুষজন আসতো, বেচাবিক্রি হইতো।’
আরও পড়ুন-
তফসিল ঘোষণার পরও নীরব বিএনপি কার্যালয়, সতর্ক পুলিশ-বিজিবি
নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না: বিএনপি
তফসিলকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকায় আ.লীগের আনন্দ মিছিল
নির্বাচন কমিশন মিনিংফুল নির্বাচন করতে সক্ষম হবে: ওবায়দুল কাদের









