অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬ বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে দাবি জানিযেছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। জোট নেতারা মনে করেন সরকারের এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বাড়াবে এবং ফার্মাসিউটিক্যাল মালিকদের মুনাফার স্বার্থ রক্ষা করবে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানায় তারা।
এতে উল্লেখ করা হয়, ৩ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি- ২০২৬ বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এতে আবারও দেশে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সেসব ওষুধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাই বহাল রাখে। অর্থাৎ বর্তমানে দেশে অত্যাবশকীয় ওষুধ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে ৩২ বছর আগে নির্ধারণ করা ১১৭টি ওষুধের তালিকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লউএইচও) বিবেচনায় ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ হলো সেই ওষুধগুলো—যা প্রতিটি দেশের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অগ্রাধিকারমূলক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণ করে। যেকোনও দেশের সরকার তার দেশের জনগণের স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি অনুযায়ী অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা নির্দিষ্ট সময় অন্তর হালনাগাদ ও সম্প্রসারণ করে। এই ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দেয় এবং ওষুধ কোম্পানিগুলো সরকার নির্ধারিত দামের বেশি নির্ধারণ করতে পারে না।
বিবৃতিতে বাম নেতারা জানান, ১৯৯৪ সালের তালিকায় ডায়াবেটিসের মতো রোগের ওষুধকেও অত্যাবশকীয় ওষুধ হিসেবে ধরা হয়নি। হাইপ্রেশারের মাত্র দুইটি ওষুধ (যা খুব কম ব্যবহৃত হয়), কয়েকটি অ্যান্টিবায়োটিক, প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড, কিছু জরুরি টিকা ও কিছু প্রয়োজনীয় অ্যানেস্থেসিয়ার ওষুধ এই তালিকায় আছে। ৩২ বছর আগে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকও এখন পুরনো, রেজিস্ট্যান্সের কারণে বর্তমানে এইসব অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সীমিত। ৩২ বছরে দেশের মানুষের রোগের ধরন পরিবর্তনসহ চিকিৎসার নানামুখী পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকার পরিবর্তন হয়নি।
তারা জানায়, ১৯৯৪ সালের পর বাংলাদেশে মোট ৩ বার (২০০৮, ২০১৬ ও সর্বশেষ ২০২৬ সাল) অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ বা নতুন করে প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে সরকারি আদেশের পরও আইনি জটিলতার কথা তুলে কিংবা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি করে কোনোটিই শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা হয়নি। ফার্মাসিউটিক্যাল কর্পোরেটদের চাপে সরকার ১৯৯৪ সালের তালিকা নিয়েই আছে এবং এর ফলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের দাম কোম্পানিগুলো যথেচ্ছাচারভাবে বাড়াচ্ছে। এমনকি বাজারে একই ওষুধের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওষুধের দামে দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্তও পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে বাজারে প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০টি জেনেরিক ওষুধ রয়েছে। কিন্তু ১৯৯৪ সালের আদেশের কারণে সরকার মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে এর সুযোগ নিয়ে বাকি ১২শ’র বেশি ওষুধের দাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করে আসছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি দুই বছর পরপর এই তালিকাটি হালনাগাদ করে থাকে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে প্রকাশিত ২৪তম মডেল তালিকায় মোট ৫২৩টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এর মধ্যে কোর লিস্টেই আছে ৪১৪টি ওষুধ। বাংলাদেশে ২০০৮ সালের সরকারি গেজেটে প্রকাশিত অত্যাবশকীয় ওষুধ তালিকায় ছিল ২০৯টি ওষুধ, ২০১৬ সালের ওষুধ নীতিতে সেই তালিকা সম্প্রসারিত করে ২৮৫টি ওষুধের তালিকা করা হয়েছিল এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের জানুয়ারির সরকারি আদেশে এই তালিকা ছিল ২৯৫টি ওষুধের। কেবল আইনসঙ্গত হয় নাই, এই যুক্তি দেখিয়ে সরকার ২০২৬ সালের এই সরকারি আদেশটি বাতিল করলেন এবং ১১৭টি মান্ধাতার আমলের ওষুধের তালিকা কার্যকর করলেন। জনগণের কাছে মুখরক্ষার জন্য তারা বললেন, আরও উন্নত একটি তালিকা তারা আইনসম্মতভাবে তৈরি করবেন।
তারা জানান, মাত্র দুইমাস আগে ‘বিআইডিএস তাদের রিপোর্টে প্রকাশ করেছে—বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই রোগীকে বহন করতে হয়; যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পায় না। দরিদ্র মানুষ তাদের আয়ের ৩৫ শতাংশ চিকিৎসার জন্য খরচ করেন।
এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে। চিকিৎসা ব্যয় অসহনীয় করে তুলবে। তারা অবিলম্বে গণবিরোধী এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান। একইসঙ্গে গত ২৯ জুন যে, জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি করা হয়েছে, সেখানে ওষুধ মালিকরা থাকলেও কোনও ভোক্তা প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা নেই। তারা উপদেষ্টা কমিটিতে ভোক্তা প্রতিনিধি রাখার বিধান যুক্ত করার দাবি জানান।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্কাফি রতন, বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, বাসদ (মাহবুব) সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশীদ ভূঁইয়া, সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী, জাতীয় গণফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক রজত হুদা ও সোনার বাংলা পার্টির সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদ।









